দেশের ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা আর্থিক হিসাবের ঘাটতি আবারো বাড়তে শুরু করেছে। ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে এ ঘাটতি ২১১ কোটি বা ২ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। জানুয়ারি পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এ হিসাবে ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। দেশের ইতিহাসে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে এ পরিমাণ ঘাটতি এর আগে কখনই দেখা যায়নি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের ঘাটতি ছিল মাত্র ৮১ কোটি ডলার।
দেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের (ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা বিওপি) সর্বশেষ তথ্য গতকাল প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে দেখা যায়, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম সাত মাস শেষে (জুলাই-জানুয়ারি) দেশের বিওপির ঘাটতি আরো স্ফীত হয়েছে। ডিসেম্বর শেষে বিওপির ঘাটতি ছিল ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু জানুয়ারি শেষে বিওপির ঘাটতি বেড়ে ৪ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আমদানি কমিয়ে আনা ও রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও সামগ্রিক ঘাটতি বেড়ে যাওয়াকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মূলত ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের উপাদান নিট ট্রেড ক্রেডিট প্রবাহ অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়ার বিরূপ প্রভাব পড়েছে বিওপির ওপর। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে নিট ট্রেড ক্রেডিট ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে নিট ট্রেড ক্রেডিট প্রবাহ ঋণাত্মক ৯ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ট্রেড ক্রেডিটের অস্বাভাবিক এ নেতিবাচক ধারাই ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে রেকর্ড ঘাটতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে বিওপির তথ্য প্রকাশ করা হয়। বিভাগটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশ থেকে রফতানি করা পণ্যের অর্থ যথাসময়ে প্রত্যাবাসিত হচ্ছে না। অপ্রত্যাবাসিত এ অর্থের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। নিট ট্রেড ক্রেডিটের ঋণাত্মক ধারা বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তবে ইউপাস এলসি, বিলম্বিত বা ডেফারড এলসি, বিদেশী বিনিয়োগ না আসা, দেশের বেসরকারি খাত থেকে স্বল্পমেয়াদি বিদেশী ঋণ চলে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমদানি ব্যয় কমিয়ে আনার কারণে দেশের চলতি হিসাব এখন উদ্বৃত্তের ধারায় ফিরেছে। গত কয়েক মাসে রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধিও বেশ ভালো। তবে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের ঘাটতি কমানো সম্ভব হয়নি। এ ঘাটতি কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ডলারের বাজার স্থিতিশীল হয়ে এসেছে। আশা করছি, পরিস্থিতির দ্রুতই উন্নতি হবে।’
গত অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আমদানি ১৮ শতাংশের বেশি কমিয়ে আনা হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরেও আমদানি কমেছে ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। টানা দুই অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ আমদানি ব্যয় কমিয়ে আনার প্রভাবে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমে এসেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি ৪ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এ সময়ে দেশের রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ। জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থবছরের সাত মাসে রেমিট্যান্সে ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আমদানি কমিয়ে আনা এবং রফতানি ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি কারণে চলতি হিসাবের ভারসাম্য ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। জানুয়ারি শেষে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চলতি হিসাবে ৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল।
ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের রেকর্ড ঘাটতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে এর আগে গভর্নরসহ নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বক্তব্য এসেছে। ঘাটতি কমানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বলা হয়েছিল, জাতীয় নির্বাচনের পর ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যের ঘাটতি কমে আসবে। কিন্তু জানুয়ারির পরিসংখ্যান বিপরীত তথ্যই দিচ্ছে।
ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের ঘাটতির অর্থ হলো দেশে যে পরিমাণ ডলার ঢুকছে, বেরিয়ে যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি। গুরুত্বপূর্ণ এ হিসাবে ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষয় থামানো যাচ্ছে না। আর্থিক হিসাবের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই), পোর্টফোলিও বিনিয়োগ, অন্যান্য বিনিয়োগ ও রিজার্ভ অ্যাসেট বিবেচনা করা হয়। অন্যান্য বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক সহায়তা, সরকারের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, ঋণের কিস্তি পরিশোধ, বাণিজ্যিক স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, ট্রেড ক্রেডিট বা রফতানির বিপরীতে অপ্রত্যাবাসিত অর্থ এবং অন্যান্য সম্পদ ও দায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের এখন পর্যন্ত দেশে ডলারপ্রবাহের প্রায় সবক’টি খাতই সংকুচিত হয়েছে।
কোনো দেশে আন্তর্জাতিক সম্পদের মালিকানা বাড়া বা কমার বিষয়টি পরিমাপ করা হয় ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে। এ হিসাবে ঘাটতি তৈরি হলে দেশের রিজার্ভ ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর চাপ বাড়ে। চলতি শতকের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বেশির ভাগ সময়ই বাংলাদেশের আর্থিক হিসাব উদ্বৃত্ত ছিল। বিশেষ করে ২০১০ সাল-পরবর্তী এক যুগে কখনই ঘাটতি দেখা যায়নি। কিন্তু ডলার সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। গত অর্থবছর শেষে এ ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২১৪ কোটি ২০ লাখ ডলারে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৪৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরেও আর্থিক হিসাবে ১ হাজার ৪০৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আর্থিক হিসাবে ৮৬৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫১৩ কোটি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯০১ কোটি ১০ লাখ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪২৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল।