বৈশ্বিক কোম্পানি ও প্রধান নির্বাহীদের চোখে নেই বাংলাদেশী গ্র্যাজুয়েটরা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মানসম্মততা নিয়ে প্রতি বছর ‘কান্ট্রিজ উইথ বেস্ট পারফর্মিং এডুকেশন সিস্টেম’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন। এর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষামানের

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মানসম্মততা নিয়ে প্রতি বছর ‘কান্ট্রিজ উইথ বেস্ট পারফর্মিং এডুকেশন সিস্টেম’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন। এর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষামানের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে ভবিষ্যতের প্রভাবশালী শীর্ষ নির্বাহী ও কোম্পানি লিডারদের উৎস দেশগুলোর সম্ভাবনাকে তালিকাভুক্ত করা। বৈশ্বিক জায়ান্ট, বহুজাতিকসহ বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহীদের জন্য প্রস্তুতকৃত এ প্রতিবেদনের ২০২৪ সংস্করণে শিক্ষামানের ভিত্তিতে ৯৩টি দেশের র‍্যাংকিং করা হয়েছে। এ তালিকায় নাম নেই বাংলাদেশের।

এর কারণ বিশ্লেষণে দেশের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না দেশের অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রম ও এর মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিস্তর। অভিযোগ আছে শিক্ষা ও পাঠক্রম নিয়েও। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারে। বাংলাদেশী গ্র্যাজুয়েটদের শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে সংশয়ে ভুগছেন দেশী-বিদেশী শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিতদের গুণগত কর্মসংস্থানে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশের অল্প কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এখন আন্তর্জাতিক বাজারে কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের জরিপভিত্তিক প্রতিবেদনে।

১৬টি ডাটা পয়েন্টে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩০০ ব্যক্তির ওপর পরিচালিত এক জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাংকিংটি প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ), ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, ওইসিডি, মার্কিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, ইউনেস্কো, টাইমস হায়ার এডুকেশনের ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং, কিউএস র‍্যাংকিং, সাংহাই র‍্যাংকিং কনসালট্যান্সি, বিশ্বব্যাংকসহ বৈশ্বিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য সমন্বয় করা হয়। এর ভিত্তিতে করা চূড়ান্ত তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ থাকলেও বাংলাদেশের নাম নেই।

প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কোয়ালিটি ইনডেক্স ও অপরচুনিটি ইনডেক্স—এ দুই শ্রেণীতে স্কোরিং করা হয়। এর মধ্যে কোয়ালিটি ইনডেক্স বা মান সূচকে স্কোরিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষাগ্রহণের আগ্রহ, গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট, বিশেষায়িত বিষয়ে দক্ষতা, শিল্প সম্পৃক্ততা, একাডেমিক শিক্ষার প্রভাব, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষণার আউটপুট ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থানকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

অপরচুনিটি ইনডেক্সে সাক্ষরতার হার, গ্র্যাজুয়েশনের হার, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার, মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ও শিক্ষার বাজেটকে বিবেচনায় নেয়া হয়।

যেসব বিষয় বিবেচনায় এ স্কোরিং করা হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক পর্যায়ে বেশ পিছিয়ে বাংলাদেশ। দেশে বর্তমানে ১৬৩টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান আছে। এর মধ্যে অন্তত ১৩০টি ভুগছে শিক্ষক সংকট, গবেষণাগারের অপ্রতুলতাসহ বিভিন্ন সমস্যায়। এসব সংকটের প্রভাব ফুটে উঠেছে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়েও।

বাংলাদেশের স্থানীয় পর্যায়ের নিয়োগদাতারাও এখন বাংলাদেশী গ্র্যাজুয়েটদের কর্মদক্ষতায় ভরসা রাখতে পারছেন না। দেশের বেসরকারি খাতে প্রচুর দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন থাকলেও উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৯ লাখ ৬ হাজার, যা ২০২২ সালে ছিল ৭ লাখ ৯৯ হাজার। শিক্ষিত বেকারের হার ২০২২ সালের ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে হয়েছে ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মানসম্পন্ন জনবল তৈরি করতে পারছে না বলে দেশে-বিদেশে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের দুর্বলতাই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে বলে মনে করছেন বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম মাশরুর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোই বিদেশ থেকে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট পর্যায়ের লোকবল নিয়ে আসছে। এখানে ওই পর্যায়ের লোকবলের সংকট রয়েছে। বিদেশে কাজ করছে আমাদের দেশে এমন লোকজন কম। যেমন ভারতীয়রা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছে। তাদের একটা ব্র্যান্ড তৈরি হয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা তৈরি হয়নি। এজন্য বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশী সিনিয়র প্রফেশনালদের চাহিদা কম। আমাদের সেই পর্যায়ের পরিচিতি তৈরি হয়নি। ভারতীয়দের পাশাপাশি শ্রীলংকানদের সেই পর্যায়ের পরিচিতি তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে স্নাতক শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা ব্যবস্থা দুটিই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। শিক্ষা ব্যবস্থা সেই পর্যায়ের মানসম্পন্ন লোকবল তৈরি করতে পারছে না বলেই শিক্ষার্থীর দুর্বলতার বিষয়টি রয়ে যাচ্ছে।’

এছাড়া পর্যাপ্ত বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে না পারার কারণেও বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক পর্যায়ে তাদের দক্ষতা মেলে ধরতে পারছে না বলে মনে করছেন তিনি। ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘আমাদের এখানে যদি অনেক বহুজাতিক কোম্পানি থাকত, তাহলে আমাদের দেশের পেশাজীবীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজের সুযোগ পেতেন। প্রতিবেশী ভারতে দেখা যাবে, কয়েক হাজার বহুজাতিক কোম্পানি রয়েছে। ওরা স্থানীয় স্নাতক হায়ার করে। যারা ধীরে ধীরে মধ্যম পর্যায়ে যাওয়ার পর তারা ভিন্ন দেশে ওই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে কাজের সুযোগ পায়। আমাদের এখানে ওই ধরনের বহুজাতিকদের বিনিয়োগ তেমন একটা আসেনি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সমস্যা রয়েছে। যারা স্নাতক হয়ে বের হচ্ছে, তাদের মধ্যে যারা ভালোমানের, তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে। কিন্তু সেখানেও সে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশকে প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র পর্যায়ে যেতে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। দেখা যায়, সারা জীবন তাকে মধ্যম পর্যায়ের কাজ করে যেতে হয়।’

চলতি বছর প্রকাশিত টাইমস হায়ার এডুকেশন র‌্যাংকিংয়ে দুই হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের মোট ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি সরাসরি র‍্যাংকিংয়ে এবং বাকি সাতটি রিপোর্টার হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে বিশ্বের সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান স্থান পায়নি। শিক্ষার মান, শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাত, গবেষণার মান, সাইটেশন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীসহ কয়েকটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের ১১৫টি দেশের মধ্যে এ মূল্যায়ন করা হয়।

বেসরকারি খাতের নিয়োগদাতারা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে ভালো করার মতো যে প্রারম্ভিক দক্ষতা প্রয়োজন, বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সেভাবে দক্ষ করে তুলতে পারে না। শিক্ষার্থীদের প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে গবেষণার অপ্রতুলতা এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগের ঘাটতি। এ কারণে দেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোয় দক্ষ ও যোগ্য কর্মীর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি হলেও উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উচ্চ শিক্ষার সঙ্গে আমাদের দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষতার বড় ঘাটতি রয়েছে। এখানে একাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে ইন্টার্নশিপের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। বিদেশে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশে নানা প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ নেন। সেখানে তারা পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই বড় ধরনের দক্ষতা অর্জন করে ফেলেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের সুযোগ সীমিত। যে কারণে দেশের করপোরেট হাউজগুলো উচ্চ শিক্ষিতদের বেশির ভাগের মধ্যে দক্ষ ও যোগ্য কর্মী খুঁজে পান না। এ পরিবেশ এখন বড় আকারে গড়ে ওঠেনি। আরেকটি বড় ঘাটতি হলো এখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সুযোগ সীমিত। যেখানে বিদেশে একজন শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষায় যেকোনো ক্ষেত্রে গবেষণা করে বড় কিছু আবিষ্কার করে ফেলতে পারেন, সেটা ব্যবসায়িক, প্রশাসনিক বা অন্য যেকোনো খাতেই হতে পারে।’

একই চিত্র দেখা যায় চলতি বছরের কিউএস সাসটেইনেবিলিটি বিশ্ব র‌্যাংকিংয়েও। এ র‌্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বৈশ্বিক পর্যায়ে ৬৩৪তম ও এশিয়ায় অবস্থান ১১২তম। তালিকায় এশিয়ার ৯৮৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দেশের ২৯টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। এর মধ্য ১৩টি পাবলিক ও ১৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আর আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় একটি।

দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাবেক ও বর্তমান প্রধানদের মতে, বাংলাদেশে শিক্ষাক্রম ও সিলেবাসে বৈশ্বিক চাহিদার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়। আবার প্রয়োজনীয় অনেক দক্ষতা তৈরির বিষয়ও তেমন একটা গুরুত্ব পায় না। এর সঙ্গে গুণগত ও ভৌত অনেক সংকট যুক্ত হয়ে দেশের শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উন্নত বিশ্বে সময় ও বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিলেবাস ঠিক করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তা হয় না। এছাড়া আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের সফট স্কিল তৈরি, যোগাযোগ দক্ষতা গড়ে তোলা এসব ততটা গুরুত্বও পায় না, যা বিশ্বের প্রায় সব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই বিশেষ গুরুত্ব পায়। এর পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষকের অভাব, পর্যাপ্ত বাজেট না থাকাসহ নানা সংকট তো রয়েছেই। মূলত এসব কারণেই আমাদের শিক্ষার্থীরা শুরুর দিকে কিছুটা পিছিয়ে থাকে।’

বিশ্বের অনেক দেশেই এখন বাংলাদেশী ডিগ্রি অবমূল্যায়িত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষার ডিগ্রি অর্জনের পরও বিদেশে আরো উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার আগে অতিরিক্ত কোর্স করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এমনই এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী শামস জেবিন (ছদ্মনাম) দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে পিএইচডির উদ্দেশ্যে গত জুলাইয়ে পাড়ি জমিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে পিএইচডি শুরুর আগে বাড়তি এক বছরের একটি কোর্স করতে হচ্ছে তাকে।

বণিক বার্তাকে এ ভুক্তভোগী জানালেন, তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন, সেটি ‘বি’ গ্রেডভুক্ত হওয়ার কারণেই তাকে অতিরিক্ত এক বছরের কোর্স করতে হচ্ছে। দেশের অধিকাংশ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডগুলো পূর্ণ করতে না পারায় একই অবস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে আরো অনেককে।

দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান আহমেদ শাহরিয়ার। দেশটিতে উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি নিজ বিষয়সংশ্লিষ্ট পেশায় যোগদানের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানই তাকে নিয়োগ দেয়নি। আহমেদ শাহরিয়ার বলেন, ‘এখানে আমাদের দেশের ডিগ্রিকে স্থানীয় ডিগ্রির সমমানের ধরা হয় না। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের নিয়োগ দিতে চায় না। এছাড়া আমরা দেশ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করে এলেও এ দেশে শুধু স্নাতক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’

আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারার কারণেই দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই এভাবে বিদেশে অবমূল্যায়িত হচ্ছে বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে শুধু হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিকে উন্নত দেশগুলো তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিগ্রির সমমানের মনে করে। এছাড়া অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিই তাদের মূল্যায়নে পিছিয়ে থাকে। এর একটি বড় কারণ আমরা প্রতিষ্ঠানগুলোয় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারিনি। আমাদের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ল্যাব নেই, অভিজ্ঞ শিক্ষক নেই, পর্যাপ্ত বাজেট নেই। এছাড়া আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগেও পিছিয়ে আছি। এসব কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। আমরা যদি এ জায়গাগুলোয় উন্নতি করতে পারি, তবে আমি মনে করি আমাদের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো অবস্থানে পৌঁছতে পারবে।’

সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের র‍্যাংকিংয়ে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে যুক্তরাজ্য। প্রতিটি সূচকে ১০০ পয়েন্ট বিবেচনায় কোয়ালিটি ইনডেক্সে দেশটি ৭৮ দশমিক ২ এবং অপরচুনিটি ইনডেক্সে ৬৯ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট অর্জন করে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে দেশটি। অপরদিকে তালিকায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে বতসোয়ানা। দেশটি কোয়ালিটি ইনডেক্সে ২৭ এবং অপরচুনিটি ইনডেক্সে ৪০ দশমিক ১৬ পয়েন্ট নিয়ে ৯৩তম অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত কোয়ালিটি ইনডেক্সে ৫৯ দশমিক ১ এবং অপরচুনিটি ইনডেক্সে ৪৮ দশমিক ২১ পয়েন্ট নিয়ে ৩৩তম অবস্থানে রয়েছে। কোয়ালিটি ইনডেক্সে ৩৯ দশমিক ৩ এবং অপরচুনিটি ইনডেক্সে ৪১ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট নিয়ে ৭৭তম অবস্থানে আছে শ্রীলংকা। ৮৩তম অবস্থানে থাকা পাকিস্তান কোয়ালিটি ইনডেক্সে ৩৪ দশমিক ৭ এবং অপরচুনিটি ইনডেক্সে ৪০ দশমিক ৮২ পয়েন্ট অর্জন করেছে। কোয়ালিটি ইনডেক্সে ২৮ দশমিক ৫ এবং অপরচুনিটি ইনডেক্সে ৪০ দশমিক ৬২ পয়েন্ট নিয়ে মালদ্বীপ আছে ৮৭তম স্থানে। গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত মিয়ানমার কোয়ালিটি ইনডেক্সে ২৭ দশমিক ২ এবং অপরচুনিটি ইনডেক্সে ৪০ দশমিক ২২ পয়েন্ট নিয়ে ৯২তম স্থান অর্জন করেছে।

বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষা বিদেশে এভাবে অবমূল্যায়িত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) পূর্ণকালীন সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের মূল ঝামেলা হচ্ছে একাডেমিক সেশন, যা নিয়ে ওদের একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। কোনো সার্টিফিকেটই একাডেমিক সেশন অনুযায়ী হয় না। এক্ষেত্রে সেশনজট একটি বিষয়। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রে যে ধরনের দক্ষতা তৈরি করতে পারা উচিত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা তৈরি করতে পারার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। শিক্ষার্থী তার চার-পাঁচ বছরের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকালে যেসব দক্ষতা অর্জন করে, সেগুলোর মান যাচাইয়ের জন্য যে ধরনের আয়োজন থাকা উচিত, সে আয়োজনই তো নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কারিকুলামে প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থারও ঘাটতি আছে। আবার বিদেশে এখানকার প্রতিষ্ঠানভেদে গ্রহণযোগ্যতাও ভিন্ন ধরনের। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় খুব পরিচিত নয় বা যাদের ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি হয়নি, তাদের একটি সংকটের জায়গা রয়েছে। আর বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে যেভাবে আমরা একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছি, যেভাবে মানসম্পন্নের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছি, এগুলোর খবর তো তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দ্রুতই ছড়িয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়কেন্দ্রিক কিছু স্বীকৃতি থাকলেও এর বাইরে যারা, তাদের জন্য সংকট থাকে।’

আরও