জাতীয় মৎস্য পক্ষ শুরু রোববার, স্বর্ণপদক পাচ্ছে ১৪ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান: কৃষিমন্ত্রী

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বলেন, মৎস্য উৎপাদনে দেশের ক্রমবর্ধমান সাফল্য, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, নিরাপদ ও মানসম্মত মাছ উৎপাদন, জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এবারের আয়োজন।

‘রূপালি মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আগামী রোববার শুরু হচ্ছে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬। এ উপলক্ষে ১৩টি ক্যাটাগরিতে ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মৎস্য পদক (স্বর্ণপদক) দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

আজ বৃহস্পতিবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী জানান, জাতীয় মৎস্য পক্ষের কেন্দ্রীয় উদ্বোধন হবে ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের জর্জ ইনস্টিটিউট মিনি স্টেডিয়াম মাঠে। এদিন জাতীয় মৎস্য পক্ষের উদ্বোধন ও পদক বিতরণ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বলেন, মৎস্য উৎপাদনে দেশের ক্রমবর্ধমান সাফল্য, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, নিরাপদ ও মানসম্মত মাছ উৎপাদন, জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এবারের আয়োজন।

মৎস্য খাতের বিভিন্ন সাফল্য তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) মৎস্য খাতের অবদান ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান ২২ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ মানুষ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মৎস্য খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি আরো বলেন, মৎস্যখাত দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। সরকারের দূরদর্শী নীতি, গবেষণা ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ খাতকে আরো আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই পর্যায়ে উন্নীত করার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

মন্ত্রী বলেন, দেশে মাছের প্রাপ্যতার ক্ষেত্রেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। বর্তমানে মাথাপিছু দৈনিক মাছের প্রাপ্যতা ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রাম, যেখানে জাতীয় পুষ্টিচাহিদা নির্ধারিত ৬০ গ্রাম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৫১ দশমিক ১১ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। মৎস্যজীবী, মৎস্যচাষী, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের মৎস্য খাতের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। ইলিশ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম, তেলাপিয়া উৎপাদনে অষ্টম, ক্রাস্টেশিয়ান আহরণে ষষ্ঠ এবং উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে। এসব অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মৎস্য খাতের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরে হয়েছে বলে জানান তিনি।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৮ লাখ ১১ হাজার ৫৫২ জন। এর মধ্যে ইলিশ আহরণকারী ৬ লাখ ৫০ হাজার ২৫১ জন, হাওরাঞ্চলের ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬৪৮ জন এবং সমুদ্রগামী জেলে ৩ লাখ ২৫ হাজার ২১১ জন।

তিনি বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব নয়। এ জন্য নিষেধাজ্ঞাকালে জেলেদের বিকল্প খাদ্য ও আয়ের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার আওতায় ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে নিষিদ্ধ মৌসুমে ৪০ হাজার ইলিশ জেলেকে খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালে ১৫ হাজার ৫০৩ দশমিক ৫০১ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল, জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় চার মাসে ৫৮ হাজার ৭২০ দশমিক ১৬১ মেট্রিক টন চাল, সমুদ্রে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালে ২৪ হাজার ১৬৫ দশমিক ৬২৫ মেট্রিক টন চাল এবং কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ থেকে বিরত থাকা জেলেদের ১ হাজার ৬১০ দশমিক ৭০১ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাছ ধরতে গিয়ে নিহত ২৬ জন জেলের পরিবারকে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা, নিখোঁজ ১৩ জন জেলের পরিবারকে একই পরিমাণ অর্থ এবং অক্ষম একজন জেলেকে ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ২৯৫ জন উপকারভোগীকে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, সবজি বাগান ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সহায়তা দেয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, বিএনপির নির্বাচনি ইশতাহারে মৎস্যখাত নিয়ে দেয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে জলমহাল, উপকূলীয় খাল ও হাওরের ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে ‘জাল যার, জলা তার’ নীতির ভিত্তিতে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, চিংড়ির একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশের সুপারশপগুলোতে মানসম্মত চিংড়ি সরবরাহের ব্যবস্থা সহজ করার মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত সচিব ইমাম উদ্দীন কবির, অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা নওয়ারা জাহান, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনকসহ মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

আরও