ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে (ঢাবি) বলা হয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে রেখে আসছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ, শিক্ষকদের বিস্তর অনিয়ম-দুর্নীতি ও দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে ভারাক্রান্ত। শিক্ষকদের বড় অংশই একাডেমিক কার্যক্রমের চেয়ে রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য আর পদপদবি দখলেই বেশি ব্যস্ত। গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণার মানে হয়েছে অনেক বেশি অবনমিত। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন র্যাংকিংয়ে তাই পিছিয়ে পড়ে প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানটি। তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এ অবস্থার পরিবর্তন হবে—এমন আকাঙ্ক্ষা ছিল সবার। অথচ গত এক বছরে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে নেই দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি।
এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অভ্যুত্থানের পর আমরা আশা করেছিলাম প্রশাসন শিক্ষার মানোন্নয়নে আন্তরিক হবে। কার্যকর পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। কিন্তু এক বছরে তেমন কোনো উদ্যোগই দেখা যায়নি, যা অত্যন্ত হতাশার।’
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নতুন খোলা হয় ১৬টি বিভাগ ও পাঁচটি ইনস্টিটিউট। অভিযোগ রয়েছে, একচেটিয়া প্রভাব তৈরির জন্য আওয়ামী অনুগত শিক্ষক বাড়াতেই বিভাগগুলো খোলা হয়। এর মধ্যে প্রয়াত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ২০০৯-২০১৭ সাল পর্যন্ত নিয়োগ দেন ৯০৭ শিক্ষক। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দিতে তিনি বেশকিছু ক্ষেত্রে যোগ্যতা শিথিল করেন। আরেফিন সিদ্দিকের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ২০১৭-২০২৪ সাল পর্যন্ত আরো পাঁচ শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ দেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান ও অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামাল।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১ হাজার ৪০০-এর অধিক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষকের প্রায় ৬৪ শতাংশ। আওয়ামীপন্থী এ শিক্ষকদের অনেকে চব্বিশের অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদীদের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। তাদের মধ্যে অর্ধশত শিক্ষককে শিক্ষার্থীরা বয়কট করলেও অধিকাংশ রয়ে গেছেন জবাবদিহিতার বাইরে।
জানতে চাইলে ঢাবি সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিও আর কোনো প্রত্যাশা রাখতে পারছি না। গত এক বছরে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তেমন কোনো উদ্যোগ আমাদের নজরে আসেনি। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার’ শীর্ষক একটি প্রস্তাব দেয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমাজ’। এতে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে বেশকিছু প্রস্তাব দেয়া হয়। যার অধিকাংশই অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে—এমন আক্ষেপ করে শিক্ষক সমাজের অন্যতম সদস্য ড. শাহমান মৈশান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক বছরে সম্পূর্ণ সংস্কার করতে না পারাটা স্বাভাবিক। তবে সংস্কার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগই নেই। স্বল্পমেয়াদি কতিপয় সংস্কারে প্রশাসন হাত দিলেও মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়নে উদ্যোগ একদমই চোখে পড়ছে না।’
বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ে অবস্থানের জন্য গবেষণা কার্যক্রম একটি বড় নিয়ামক। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষাদান ও গবেষণায় উন্নীত করতে শিক্ষক সমাজ অনেকগুলো প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন ও পূর্ণ বেতনভুক্ত পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করা, দেশী-বিদেশী অধ্যাপকদের তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দেয়া ও সম্মানী বাড়ানো এবং যোগ্যতাসম্পন্ন পিএইচডি শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে আবাসিকসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়া। এছাড়া ডিগ্রি প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কারিকুলাম ও প্রক্রিয়ায় গুণগত পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়া হয় প্রস্তাবে। এসবের অধিকাংশই বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে জানিয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমফিল-পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তির নিয়মে প্রশাসন নিজেদের মতো করে কিছু পরিবর্তন করেছে। তবে নিয়মের কিছু পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, দরকার গুণগত পরিবর্তন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত অনুপাত ২০-এর বিপরীতে ১, যা ৪০-এর বিপরীতে ১-এর বেশি করা যাবে না। প্রয়োজনে একটি বিভাগে একটি কোর্সের একাধিক সেকশন বা ইউনিট করতে হবে। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনও বিভাগ রয়েছে যেখানে একজন মাত্র শিক্ষক পড়াচ্ছেন ১৫০ শিক্ষার্থীকে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের এক ছাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একসময় বিভাগে প্রতি সেশনে ২৫০-এর অধিক শিক্ষার্থী ভর্তি হতো। তবে আমাদের সেশনে ১৫০-এর অধিক ভর্তি হয়েছে। যতজন উপস্থিত থাকে সবাইকে একসঙ্গে ক্লাস করতে হয়। ক্লাস টিচার মাইক্রোফোন ছাড়া পড়াতে পারেন না। প্রথম বর্ষে দুটি সেকশন করার প্রস্তাব দেয়া হলেও শিক্ষক সংকটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। নতুন শিক্ষক নিয়োগ অতিজরুরি হলেও ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক কারণে তা সম্ভব হয়নি।’
দীর্ঘদিন ধরে অর্থাভাবে গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ারও অভিযোগ ছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। ধারণা করা হয়েছিল, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গবেষণা বরাদ্দ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। যদিও বিগত অর্থবছরের চেয়ে চলতি অর্থবছরে তা বেড়েছে যৎসামান্য। চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকার মোট বাজেটে গবেষণার জন্য রাখা হয়েছে কেবল ২১ কোটি ৫৭ লাখ, যা মোট বাজেটের ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। আগের অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২০ কোটি ৭ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। এমফিল-পিএইচডি শিক্ষার্থীদের গাইড করতে দেশী-বিদেশী খ্যাতনামা গবেষকদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে। হাই-ইম্প্যাক্ট জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশে শিক্ষকদের ইনসেনটিভ দেয়া যেতে পারে। গবেষণাকালে শিক্ষকদের পাঠদানের লোড কমানো ও বেশি বেশি আন্তর্জাতিক মানের কনফারেন্স করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বাজেটের আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী জিডিপির ৬ শতাংশ না হলেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের অনুসরণে ন্যূনতম ৪ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিতে হবে।’
শিক্ষার মানের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপের চেয়ে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পেই বেশি চোখ ছিল শেখ হাসিনা সরকারের। বর্তমানেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ হাজার ৮৪০ কোটি ৩৯ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন প্রকল্পে ছয়টি একাডেমিক ভবন, ছাত্রছাত্রীদের জন্য নয়টি আবাসিক হল, হাউজ টিউটরদের জন্য নয়টি ভবন, আবাসিক-প্রশাসনিকসহ আরো সাতটি ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এখন পর্যন্ত তা সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প।
এসব উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারসহ অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ আরো বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। এ ধরনের অবকাঠামোগত প্রকল্পের তুলনায় শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন ও পঠন-পাঠন পদ্ধতির উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বড় প্রকল্প শিক্ষার মানোন্নয়নে সে রকম কোনো ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয় না। কারণ শিক্ষার মানোন্নয়নে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও পঠন-পাঠন পদ্ধতির আধুনিকায়ন। এ প্রকল্পে এমন কোনো উদ্যোগ নেই, যা পঠন-পাঠন পদ্ধতিকে উন্নত করবে বা গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করবে, কিংবা শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করবে।’
আকাঙ্ক্ষা পূরণে ধারাবাহিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা। এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেসব ক্রমান্বয়ে পূরণ করা হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মৌলিক চাহিদা ছিল। যে প্রকল্পটি পেয়েছি সেটির অর্থ দিয়ে মৌলিক চাহিদা মোটামুটিভাবে পূরণ করা যাবে। এটা ছাড়াও শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নসহ অন্যান্য জায়গায়ও আমাদের বরাদ্দ দরকার আছে।’
একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের জন্য সুন্দর পরিবেশের দরকার হয় উল্লেখ করে ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘ভালো স্বাস্থ্য ও পরিবেশ তৈরি করতে পারলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ভালো হবে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়বে। অবকাঠামো উন্নয়নে একটি একাডেমিক সুবিধাও আছে। পড়াশোনায় মনোযোগী হতে সহায়তা করবে। সুন্দর পরিবেশ এখানে মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে। তবে আগামীতে শিক্ষা-গবেষণার জন্যও আমরা বরাদ্দ চাইব। বিভিন্ন আলোচনা, সংলাপের মাধ্যমে গবেষণায় কীভাবে বরাদ্দ বাড়ানো যায় সেটি দেখা যেতে পারে। ইউজিসি যদি শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ায় তাহলে সে জায়গায়ও আমরা আরো বেশি গুরুত্ব দিতে পারব।’