পাকিস্তানের প্রথম পাঁচ প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে তিনজনই ছিলেন পূর্ব বাংলার। তাদের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত আর কোনো বাঙালি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। পাকিস্তান আমলের এ তিন বাঙালি প্রধানমন্ত্রী হলেন খাজা নাজিমুদ্দিন, মোহাম্মদ আলি বগুড়া ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
খাজা নাজিমুদ্দিন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন নিজ নিজ সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের অন্যতম। ব্রিটিশ আমল থেকেই রাজনীতিতে বাংলার নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। দুজনেই ব্রিটিশ আমলেও অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। তাদের সমসাময়িক রাজনীতিবিদদের অনেককেই এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে স্মরণ করা হয়। কিন্তু বর্তমান আমলের রাজনৈতিক আলোচনায় একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন খাজা নাজিমুদ্দিন।
পাকিস্তান আমলের তিন বাঙালি প্রধানমন্ত্রীর আরেকজন মোহাম্মদ আলি বগুড়া ছিলেন মূলত আমলা। গভর্নর মালিক গুলাম মুহাম্মদ অনেকটা আকস্মিকভাবেই তাকে যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানি দূতাবাস থেকে ডেকে এনে প্রধানমন্ত্রিত্বে বসিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিকরা বলছেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিন। এ কারণে পূর্ববঙ্গেই সবচেয়ে বেশি অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। অন্যদিকে মোহাম্মদ আলি বগুড়া ছিলেন মূলত আমলা। রাজনীতিতে তার তেমন কোনো অবদানও নেই। অন্যদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এখন আলোচনায় আসেন শুধু বঙ্গবন্ধুর ‘রাজনৈতিক গুরু’ হিসেবেই। তার চিন্তাধারা নিয়ে মূলধারার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আলোচনা হয় তুলনামূলক কম।
সাতচল্লিশে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়ে বিদায় নেয় ব্রিটিশরা। শাসনভার পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে থাকলেও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের কারণেই তত্কালীন জাতীয় রাজনীতিতে পূর্ব বাংলা থেকে আগত নেতাদের প্রভাব ছিল তুলনামূলক বেশি। ঐতিহাসিকরা বলছেন, সামরিক শাসনামলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও পশ্চিমা আমলাদের প্রভাব বাঙালিদের ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ছিটকে ফেলে দেয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মধ্যে বৈষম্যও বাড়তে থাকে।
খাজা নাজিমুদ্দিন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ধরা হয় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম হিসেবে। ১৯৫১ সালের অক্টোবরে লিয়াকত আলি খানের হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন তিনি। ক্ষমতায় এসেই পাকিস্তানকে ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের অধীন ডমিনিয়ন থেকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের জন্য নতুন সংবিধান তৈরির কাজে হাত দেন তিনি। সম্পন্ন করেন পাকিস্তানের ইতিহাসের প্রথম আদমশুমারির কাজও।
ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নাজিমুদ্দিনের সময়ে পূর্ববঙ্গে ভাষা আন্দোলন তীব্রতা পায়। ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক জনসভায় নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন: জিন্নাই ঠিক। পাকিস্তানের ঐক্যের জন্য উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।
তার এ বক্তব্যের পর পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন আরো তীব্রতা পায়। ভাষা আন্দোলনকারীদের দমনে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় খাজা নাজিমুদ্দিনের সরকার। পুলিশ একুশে ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে গুলি চালালে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। এর ধারাবাহিকতায় গোটা পূর্ববঙ্গ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের অন্যান্য অংশেও সে সময় নানা ইস্যুতে দাঙ্গা-ফ্যাসাদ ছড়িয়ে পড়ে। সব জায়গায়ই দ্রুত জনপ্রিয়তা হারান খাজা নাজিমুদ্দিন। ১৯৫৩ সালের শুরুর দিকে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন গভর্নর জেনারেল মালিক গুলাম মুহাম্মদ। খাজা নাজিমুদ্দিন অস্বীকৃতি জানালে তাকে গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট ১৯৩৫-এ দেয়া ক্ষমতাবলে পদচ্যুত করেন গভর্নর জেনারেল।
খাজা নাজিমুদ্দিনকে বরখাস্ত করার পর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আলি বগুড়াকে ওয়াশিংটন থেকে ডেকে পাঠান মালিক গুলাম মুহাম্মদ। অনেকটা আকস্মিকভাবেই তাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম লিগ প্রধানের দায়িত্বে বসান তিনি। পাকিস্তানের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন মোহাম্মদ আলি বগুড়া।
বগুড়ার নবাব পরিবারের ছেলে হওয়ায় তার নামের শেষে ‘বগুড়া’ যুক্ত ছিল। পূর্বসূরির মতো তিনিও পূর্ববঙ্গের চেয়ে পাকিস্তানের আমলাতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোযোগী ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৯৫৪ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকারকে বরখাস্ত করেন তিনি। শেরেবাংলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগও আনেন। অন্যদিকে আইয়ুব খান, ইস্কান্দার মির্জাদের মতো সামরিক জেনারেলদের পাকিস্তানের রাজনীতিতে তিনিই প্রথম টেনে নিয়ে আসেন। তার ‘ওয়ান ইউনিট’ ফর্মুলাও সে সময় বাঙালিদের কাছে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। ১৯৫৫ সালে ভারপ্রাপ্ত গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা তাকে প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করেন।
খাজা নাজিমুদ্দিন ও মোহাম্মদ আলি বগুড়ার পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার কারণ হিসেবে রাজনীতিবিদরা বলছেন, তাদের দুজনের কেউই পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। পাকিস্তানি আমলাতন্ত্রই তাদের প্রধানমন্ত্রিত্বের পদে বসিয়েছিল। রাজনীতিবিদ হিসেবে খাজা নাজিমুদ্দিনের অতীতে জনপ্রিয়তা থাকলেও তা তিনি হারিয়েছিলেন ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করতে গিয়ে। পরবর্তী সময়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, পাকিস্তানের রাজনীতিতেও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিলেন দেশটির সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি বণিক বার্তাকে বলেন, রাজনীতিতে তাদের প্রাসঙ্গিক থাকার কথাও না। খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। মোহাম্মদ আলি বগুড়া ছিলেন মূলত আমলা। সে সময় তারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে ক্ষমতায় আসেননি।
খাজা নাজিমুদ্দিন ও মোহাম্মদ আলি বগুড়া বাঙালিদের কাছে যতটা অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, তার চেয়েও অনেক বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশনের ভিত্তিতে ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। পাকিস্তানের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পূর্ববঙ্গের জনসাধারণের ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছেন তিনি। এক বছরেরও কম সময় প্রধানমন্ত্রিত্বে থাকলেও এ সময় বাঙালিদের কাছে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। ১৯৫৭ সালে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা তাকেও পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন।
পূর্ব বাংলার জনসাধারণের প্রতি দরদের কারণেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সে সময় জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন বলে মনে করছেন রাজনীতিবিদরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তার বিভিন্ন রচনায় সোহরাওয়ার্দীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ব্যক্ত করে গিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান এমপি এ প্রসঙ্গে বলেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে স্মরণ করা হয় না, এ কথা ঠিক না। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তাকে নিয়ে এখনো আলোচনা হয়। তাকে স্মরণ করে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করা হয়।
বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকাই তাদের প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণ করে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিনির্মাণে তারা প্রাসঙ্গিক নন। ইতিহাসে তাদের প্রাসঙ্গিকতা থাকতে পারে। কিন্তু বর্তমানের রাজনীতিতে এ মুহূর্তে তারা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক নন।
পাকিস্তান আমলের নানা কর্মকাণ্ড ও বাংলাদেশের জন্মই ওই সময়কার বাঙালি প্রধানমন্ত্রীদের প্রাসঙ্গিকতার মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, তাদের নাম স্বাভাবিকভাবেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। কারণ যদিও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অখণ্ড স্বাধীন বাংলা চেয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ঐক্যের চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। খুব স্বাভাবিকভাবেই তিনিও কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেলেন। তবে আমাদের এটাও মনে রাখা দরকার সাতচল্লিশ-পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার প্রতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সবসময় একটা দরদ ছিল। তিনি পাকিস্তান কাঠামোর মধ্যে থেকে পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। আর খাজা নাজিমুদ্দিন বা মোহাম্মদ আলি কখনো স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষেই ছিলেন না। তারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে কাজ করেছেন। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই তারা রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক।