ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র নাইমুল আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানসহ নয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ অভিযোগ গঠনের এ আদেশ দেন। আদেশে কিশোর আলো সম্পাদক আনিসুল হককে মামলা থেকে অব্যহতি দিয়েছেন আদালত।
আগামী ১৪ ডিসেম্বর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ঠিক করা হয়েছে।
অভিযোগ গঠনের সময় আদালতে উপস্থিত প্রথম আলো সম্পাদকসহ বিবাদীরা আদালতের কাছে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। আদালতে প্রথম আলো সম্পাদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী ও প্রশান্ত কুমার কর্মকার। বাদী পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ওমর ফারুক।
অভিযোগ গঠনের আদেশের ব্যাপারে প্রথম আলো সম্পাদকের আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা মতিউর রহমানসহ অপরাপর আসামিদের অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছিলাম। যেদিনকার ঘটনায় এই মামলা, সেদিন প্রথম আলো সম্পাদক ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তাই আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম তিনি অব্যাহতি পাবেন।’
তিনি বলেন, অভিযোগ গঠনের এই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হবে।
গত বছরের ১ নভেম্বর ঢাকা রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে কিশোর আলোর বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠান ছিল। সেদিন মাঠে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায় নাইমুল আবরার। এ ঘটনায় নাইমুলের বাবা মজিবুর রহমান গত বছরের ৬ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে নালিশি মামলা করেন। এরপর চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি প্রথম আলো, কিশোর আলো সম্পাদকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ।
১৩ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ হয়। ওই দিন প্রথম আলো সম্পাদক, কিশোর আলোর সম্পাদকসহ আটজনের অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করা হয়। ওইদিন আদালত ২৭ অক্টোবর আদেশের দিন ধার্য্য করেন। পরে ২৭ অক্টোবর আবার আদেশের দিন ধার্য করা হয় ১২ নভেম্বর।
২০১৯ সালের ৬ নভেম্বর সিএমএম আদালতে আবরারের বাবা মামলাটির আবেদন করেন। মামলার অভিযোগ বলা হয়, ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে কিশোরদের মাসিক সাময়িকী কিশোর আলোর বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন নাইমুল আবরার। অনুষ্ঠান চলাকালে সাড়ে ৩টার দিকে আবরার বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। অনুষ্ঠানের জন্য যে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করা হয় তা অরক্ষিত ছিল। অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার যে নিরাপত্তা ও সাবধানতার প্রয়োজন ছিল তা নেওয়া হয়নি।
মামলায় আরো অভিযোগ করা হয়, ঘটনাস্থলের অতি সন্নিকটে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল অবস্থিত হলেও আবরারকে মহাখালী ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। নাইমুল আবরার বিদ্যুৎস্পৃষ্ট পৃষ্ট হওয়ার পর বিকেল করে ৪ টা ৫১ মিনিটে চিকৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কর্তৃপক্ষ আবরারের মৃত্যুর বিষয়টি তার পরিবারকে জানায়নি। আবরারের পরিবার এক সহপাঠীর মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর পান। যা একটি পরিকল্পিত, গাফিলতি এবং অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড।
অভিযোগগঠনের আদেশের পর প্রথম আলো সম্পাদকের আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী সাংবাদিকদের বলেন, এই মামলা যে অসামঞ্জস্য পূর্ণ তা শুনানিতে তারা আদালতে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেন, নাইমুল আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে মোহাম্মদপুর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। ওই মামলা থাকা অবস্থায় ঘটনার পাঁচ দিন পর আদালতে আরেকটি নালিশি মামলা করা হয়। নালিশি মামলার আদেশে দেখা যায়, থানায় করা অপমৃত্যুর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন না নিয়েই নালিশি মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন আদালত, যা ফৌজদারি কার্যবিধি ২০৫-এর (ডি) ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিম্ন আদালতের উচিত ছিল, অপমৃত্যুর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নালিশি মামলাটি আমলে নেওয়ার। এ ক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নালিশি মামলা তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়।
আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, নাইমুল আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটি টর্ট আইনে বিচারযোগ্য। কোনোভাবেই ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পড়ে না। নালিশি মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষীর তালিকা একান্ত প্রয়োজন। অথচ এই মামলার আরজিতে কোনো সাক্ষীর তালিকা নেই। নালিশি মামলায় শুধু প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানকে আসামি করা হয়। অথচ সেদিন তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না।
এই মামলায় আরো যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে তারা হলেন, প্রথম আলোর হেড অব ইভেন্ট অ্যান্ড অ্যাকটিভেশন কবির বকুল, নির্বাহী শাহপরান তুষার, নির্বাহী শুভাশীষ প্রামাণিক, কিশোর আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মহিতুল আলম, ডেকোরেশন ও জেনারেটর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জসীম উদ্দিন, মোশাররফ হোসেন, সুজন ও কামরুল হাওলাদার।