প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও ডিজিটাল হয়নি সিলেট সিটি

দুদফা বেড়েছে ডিজিটাল সিলেট সিটি প্রকল্পের মেয়াদ, তবে শেষ হয়নি কাজ। এমনকি প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি কম্পোনেন্ট সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালকে অটোমেশনের আওতায় আনার কাজ এখনো শুরুই হয়নি।

দুদফা বেড়েছে ডিজিটাল সিলেট সিটি প্রকল্পের মেয়াদ, তবে শেষ হয়নি কাজ। এমনকি প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি কম্পোনেন্ট সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালকে অটোমেশনের আওতায় আনার কাজ এখনো শুরুই হয়নি।

সিলেট নগরকে ডিজিটালাইজ করতে ২০১৮ সালে শুরু হয় প্রকল্পটির কাজ। এর মাধ্যমে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা ডিজিটালাইজ করা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সড়কে ফেস রিকগনিশন (চেহারা শনাক্তকরণ) ক্যামেরা স্থাপন ও নগরজুড়ে ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

কথা ছিল, ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। কিন্তু তা না হওয়ায় প্রথম দফায় ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে মেয়াদ বাড়িয়েও লাভ হয়নি। এ অবস্থায় গত মাসে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনার (ডিপিপি) মাধ্যমে এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রায় ৩০ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে আইসিটি বিভাগের তত্ত্বাবধানে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)।

প্রকল্পের শুরুতে ১০টি কাজের কথা বলা হয়েছিল। এগুলো হলো দেশে প্রথমবারের মতো নগরীর বিভিন্ন মোড়ে অপরাধীর চেহারা শনাক্তকরণ ক্যামেরা স্থাপন, নগরজুড়ে ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন তৈরি, কম্পিউটার লিটারেসি সেন্টার নির্মাণ, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল অটোমেশন, সিলেট সিটি করপোরেশনের ১০ সেবাকে অটোমেশন করা, নাগরিক সুবিধা উন্নত করা ছাড়াও পর্যটকদের জন্য ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ডিজিটাল টেলিফোন ডিরেক্টরি এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থা থেকে প্রবাসীদের বাড়তি সুবিধা দিতে তথ্য সংগ্রহ করে ডাটাবেজ তৈরি।

তবে পরবর্তী সময়ে প্রকল্প থেকে সাতটি কম্পোনেন্টই বাদ দেয়া হয়। এখন কেবল ফেস রিকগনিশন ক্যামেরা স্থাপন, ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন তৈরি ও ওসমানী হাসপাতালকে অটোমেশন করার কাজ চলছে।

ডিজিটাল সিলেট সিটি প্রকল্পের উপপরিচালক মধুসূদন চন্দ বলেন, ‘করোনা সংক্রমণের কারণে অনেক দিন প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। এছাড়া সিলেট নগরীতে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন প্রকল্পের কারণেও আমাদের কাজ কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। এসব কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা যায়নি।’

এ কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পের মূল যে দুটি কম্পোনেন্ট ছিল তার কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে নগরীর বিভিন্ন মোড়ে ফেস রিকগনিশন ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো এরই মধ্যে সিলেট মহানগর পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া নগরীর ১২৬টি পয়েন্টে ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন তৈরি করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ এসব জোন ব্যবহারও করছে। তবে ২১ মার্চ ওয়াই-ফাই জোনগুলো সিলেট সিটি করপোরেশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে। এর পর থেকে এগুলো তারাই দেখভাল করবে।

তবে ওসমানী হাসপাতালে ‘হেলথ ম্যানেজমেন্ট অটোমেশন সিস্টেম’-এর কাজ শুরু হয়নি জানিয়ে মধুসূদন চন্দ বলেন, এ কাজের জন্য এ মাসেই দরপত্র আহ্বান করা হবে। ২০২২ সালের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে বলেও আশা করেন তিনি।

প্রকল্পের শুরুতে অন্তর্ভুক্ত থাকা সাতটি কম্পোনেন্ট কেন বাদ দেয়া হলো তা জানতে চাইলে প্রকল্পের উপপরিচালক বলেন, সিটি করপোরেশন এরই মধ্যে তাদের কিছু সেবা ডিজিটালাইজ করে ফেলেছে। বাকিগুলোও অন্যরা করছে বা করার পরিকল্পনা আছে। তাই এ প্রকল্প থেকে সেগুলো বাদ দেয়া হয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ডিজিটাল সিলেট নগর গড়ে তোলার উদ্যোগে সবার আগে নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। এজন্য নগরের ভেতরে চেহারা শনাক্তকরণ ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ‘আইপি ক্যামেরা বেইসড সার্ভিল্যান্স সিস্টেম’ প্রকল্পের মাধ্যমে নগরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ইন্টারনেট প্রটোকল বা আইপি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে বিশেষ ধরনের ১০টি ফেস রিকগনিশন (এফআর) বা ব্যক্তি শনাক্তকরণ এবং ১০টি অটো নাম্বার প্লেট রিকগনিশন (এএনপিআর) তথা যানবাহনের নাম্বার প্লেট চিহ্নিতকরণ ক্যামেরা রয়েছে। বাংলাদেশে এটি প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ক্যামেরা স্থাপনের পর নগরের কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষও খোলা হয়েছে।

মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) বিএম আশরাফ উল্যাহ তাহের বলেন, নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পিলার স্থাপন করে ১১০টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ক্যামেরায় ৩৬০ ডিগ্রি জুমিং সুবিধা রয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তে সুবিধা পাচ্ছে পুলিশ। এরই মধ্যে এ রকম কয়েকটি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ সক্ষম হয়েছে। যানবাহনের ডাটা সংগ্রহ ও অপরাধী শনাক্ত করতে এসব ক্যামেরার সহায়তা নেয়া হচ্ছে বলেও জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।

প্রকল্পের আওতায় নগরের ৬২টি এলাকায় সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব জায়গায় ১২৬টি ওয়াই-ফাই অ্যাকসেস পয়েন্ট (এপি) রয়েছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু হয়। ফ্রি ওয়াই-ফাই জোনে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ আইডি এবং পাসওয়ার্ড ‘জয় বাংলা’ লিখে যে কেউ বিনা মূল্যে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, অনেক এলাকায়ই অ্যাকসেস পয়েন্ট কাজ করে না। আবার বেশির ভাগ এলাকায়ই ফ্রি ওয়াই-ফাইয়ের ইন্টারনেটের গতি খুবই ধীর।

নগরের জিন্দাবাজার এলাকার ব্যবসায়ী জাবের উদ্দিন জানান, তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশেই ফ্রি ওয়াই-ফাইয়ের একটি অ্যাকসেস পয়েন্ট। কিন্তু তার গতি এতই ধীর যে সেটি ব্যবহারই করা যায় না।

অবশ্য ধীরগতির ইন্টারনেট ও অনেক সময় সংযোগ না পাওয়ার অভিযোগ সত্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রকল্পের উপপরিচালক মধুসূদন চন্দ।

এদিকে বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রকল্পটি এখনো সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দেয়নি, তাই ইন্টারনেটের ধীরগতির বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমানও। তিনি বলেন, এ মাসেই প্রকল্পটি তাদের বুঝে পাওয়ার কথা। তারা দায়িত্ব পাওয়ার পর অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখবেন বলেও জানান তিনি।

সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালের অটোমেশন

হাসপাতালে সঠিকভাবে অটোমেশনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রোগীদের সেবা পাওয়া অনেক সহজ হবে বলে মনে করেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায়।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কোনো রোগীকে হাসপাতালে কী কারণে, কোন ওষুধ দেয়া হয়েছিল, তাকে কোন কোন মেডিকেল পরীক্ষা করাতে হয়েছিল; এসব তথ্য সংরক্ষণ করা হবে ডাটাবেজে। ওই রোগী যদি পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান, তবে ডাটাবেজ থেকে তার আগের রোগের সব তথ্য সহজেই পাওয়া যাবে। ফলে চিকিৎসকের পক্ষে সহজে সঠিক সেবা দেয়া সম্ভব হবে।’

আরও