সম্প্রতি ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপ বেড়েছে। বাংলাদেশেও নতুন ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের চিকিৎসায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পুনরায় চালু হয়েছে করোনা ইউনিট। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ৩০ শয্যার একটি ওয়ার্ড চালু করেছে কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসার সব সুযোগ-সুবিধাসহ অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিও রয়েছে ওয়ার্ডটিতে। তবে জীবন রক্ষাকারী যেসব চিকিৎসা যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে, তার অধিকাংশই অচল ও পুরনো। এর মধ্যে হাই ফ্লো ন্যাসাল ক্যানোলার ৯৫ শতাংশই অচল। ২৮টি আইসিইউ বেডের বেহাল দশা, দুটি পিসিআর মেশিনও অচল, কার্ডিয়াক মনিটারের অধিকাংশই নষ্ট।
বরিশাল বিভাগের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ। আগে ৫০০ থাকলেও এখন তা ১০০০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। উন্নত স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিভাগের ছয়টি জেলার মানুষ এ হাসপাতালের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। তবে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ৩০ শয্যার করোনা ওয়ার্ড চালু হলেও রয়েছে কিট সংকট। কভিড পরীক্ষার অধিকাংশ যন্ত্রও অচল। এ অবস্থায় পরীক্ষাও করতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে অ্যান্টিজেন পরীক্ষায় বিভাগটিতে এখন পর্যন্ত তিনজনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। গত সপ্তাহের শেষ দিকে তারা সবাই সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরে গেছেন বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
অবশ্য অচল চিকিৎসা যন্ত্রগুলো দ্রুতই সচল করার কথা জানিয়েছেন হাসপাতালের উপপরিচালক ও ফোকাল পার্সন ডা. এসএম মনিরুজ্জামান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে কভিড রোগী কমে যাওয়ায় ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে ওইসব সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়নি। দীর্ঘদিন সেগুলো স্টোরে থাকায় অধিকাংশই অচল হয়ে পড়েছে। তবে রোগীদের প্রাথমিকভাবে সামাল দেয়ার মতো ব্যবস্থা আমাদের রয়েছে। সব যন্ত্রই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছি। অচল যন্ত্রাংশগুলো মেরামত করে সচল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও জানানো হয়েছে।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১২ মার্চ বরিশালে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। আক্রান্তদের সুচিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন দপ্তরের অনুদান এবং সরকারি বরাদ্দ দিয়ে পিসিআর ল্যাব, ৭২টি আইসিইউ বেড, ৬৮টি হাই ফ্লো ন্যাসাল ক্যানোলা, ৮০০টি অক্সিজেন পয়েন্ট, দুই শতাধিক অক্সিজেন সিলিন্ডার, ৬১টি ভেন্টিলেটর, ৪১টি কার্ডিয়াক মনিটার ও চারটি অক্সিজেন প্লান্টসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়।
তবে চিকিৎসক ও নার্সরা বলছেন, করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে স্থাপন করা অধিকাংশ যন্ত্রপাতিই অচল হয়ে পড়ে আছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ন্যাসাল ক্যানোলার ৯৫ শতাংশই অচল। ২৮টি আইসিইউ বেডের বেহাল দশা, দুটি পিসিআর মেশিনও অচল, কার্ডিয়াক মনিটারের অধিকাংশই নষ্ট। এগুলো ঠিক করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বারবার চিঠি দিয়েও কাজ হয়নি।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, হাই ফ্লো ন্যাসাল ক্যানোলার ভেতরে একটি বিশেষ ডিভাইস থাকে, যার কার্যকারিতা তিন মাস। প্রতি তিন মাস পর সেটি পরিবর্তন করতে হয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর ওই ডিভাইস আর পরিবর্তন করা হয়নি। ফলে হাই ফ্লো নজেল ক্যানোলাগুলো অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
করোনা ওয়ার্ডের দায়িত্ব থাকা এক নার্স বলেন, ‘মেশিনগুলো যখন চালু ছিল, তখন মুমূর্ষু রোগীকে ৮০ শতাংশ ফ্লোতে অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া গেছে। অনেক রোগীর প্রাণ রক্ষা হয়েছে। কিন্তু করোনা সংক্রমণ কমে যাওয়ার পর কোনো নির্দেশনা না থাকায় মেশিনগুলো হাসপাতালের স্টোরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এখন এ মেশিনগুলো কীভাবে কাজ করবে তা আমরা বলতে পারছি না।
একই অবস্থা শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে স্থাপিত পিসিআর মেশিন দুটির। দুই বছর ধরে কার্যক্রম না থাকায় পিসিআর ল্যাবের যন্ত্র দুটি অচল হয়ে পড়ে আছে।
এ প্রসঙ্গে মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শফিকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ল্যাবে সর্বশেষ কভিড পরীক্ষা করা হয়েছে। কিটের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় আর পরীক্ষা করা হয়নি। প্রতি দুই বছর পর মেশিনগুলো ক্যালিব্রেশন করতে হয় এবং প্রতি বছর বায়ো সেফটি কেবিনেট ক্যালিব্রেশন করতে হয়। এগুলো কিছুই করা হয়নি। এসব করার পর বলা যাবে, মেশিন দিয়ে কতটা কাজ করা যাবে। পিসিআর ল্যাব থেকে করোনার প্রথম ধাপে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ৫৪ হাজার ২৬৯ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ৬৯৩ জন মারা যান।’