বাংলা কিউআরে লেনদেনে ব্যাংক খাতকে নেতৃত্ব দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক

চলতি জুলাই থেকে সর্বজনীন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপের মাধ্যমে একই কিউআর কোড স্ক্যান করে অর্থ পরিশোধ করা যায়। ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি এরই মধ্যে নিজস্ব ‘আস্থা’ অ্যাপ, বিকাশের বৃহৎ মার্চেন্ট নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন প্রণোদনার মাধ্যমে বাংলা কিউআর ব্যবহারের প্রসারে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তারেক রেফাত উল্লাহ খান এসব বিষয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলা কিউআরের বড় সুবিধাগুলো কী কী?

বাংলা কিউআর ব্যবহার করে পেমেন্ট গ্রহণ করলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। এ প্রক্রিয়ায় জাল কিংবা ছেঁড়া-ফাটা নোটের কারণে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। অনেক সময় খুচরা টাকা না থাকার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাধ্য হয়ে ছাড় দিতে হয়। বাংলা কিউআর এ সমস্যার সমাধান করেছে। একই সঙ্গে নিজেদের কাছে সার্বক্ষণিক ক্যাশ টাকা রাখার ও ক্যাশ বহন করার ঝুঁকিও থাকবে না। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রথাগত ব্যাংক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণসুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন। কারণ এ ব্যবসায় প্রায় শতভাগ লেনদেন নগদে হওয়ার কারণে ব্যাংকের পক্ষে তাদের প্রকৃত আয় বা ঝুঁকি নিরূপণ করা সম্ভব হয় না। ফলে তাদের ঋণ দেয়াও ব্যাংকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে পেমেন্ট নেয়া হলে ব্যাংকের সিস্টেমে তাদের একটি নির্ভরযোগ্য লেনদেনের রেকর্ড থাকবে, যা পর্যালোচনা করে ব্যাংক খুব সহজেই ঋণসহায়তা দিতে পারবে।

বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এসএমই উদ্যোক্তা এবং সাধারণ গ্রাহকদের ডিজিটাল লেনদেনে আরো বেশি সম্পৃক্ত করতে ব্র্যাক ব্যাংক কী উদ্যোগ নিয়েছে?

আমরা সবসময়ই ডিজিটাল লেনদেনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এসএমই উদ্যোক্তা এবং সাধারণ গ্রাহকদের উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করি। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন বৃদ্ধি করার পূর্বশর্ত হলো একটি শক্তিশালী ইন্টারঅপারেবল অ্যাপ থাকা, যা ব্যবসায়ী ও গ্রাহকদের সহজে ও স্বল্প সময়ে লেনদেনের সুবিধা দিতে পারে। সেই লক্ষ্যেই ব্র্যাক ব্যাংক ‘আস্থা’ অ্যাপ চালু করেছিল এবং প্রতিনিয়ত এর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে অ্যাপটি ব্যবহার করে প্রতি মাসে ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হচ্ছে। অনেক আগে থেকেই ‘আস্থা’ অ্যাপের মাধ্যমে কিউআর কোড পেমেন্ট চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে আমরা অ্যাপটিকে বাংলা কিউআর-বান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছি।

এরই মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি ‘বিকাশ’ একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মার্চেন্টদের সবচেয়ে বড় বাংলা কিউআর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের নির্ধারিত ‘বাংলা কিউআর’ দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছি। আমরা রিটেইল, এসএমই এবং করপোরেট—এ তিন বিভাগকেই বাংলা কিউআর সম্প্রসারণের কাজে যুক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছি। এছাড়া নতুন এসএমই গ্রাহকদের ব্র্যাক ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও আমরা যুক্ত হয়েছি। এর ফলে এখন থেকে ওই কোম্পানি থেকে ওষুধ কেনা ফার্মেসিগুলোকে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে পেমেন্ট করতে হচ্ছে। এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি আমরা সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদেরও নানা ধরনের আকর্ষণীয় সুবিধা ও প্রণোদনা দিচ্ছি। সব মিলিয়ে অদূর ভবিষ্যতে বাংলা কিউআরে লেনদেনে দেশের ব্যাংক খাতকে নেতৃত্ব দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ব্র্যাক ব্যাংক।

খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে? এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্র্যাক ব্যাংক কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ খুচরা ব্যবসায়ীদের এ ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে অভ্যস্ত করা। এখনো অনেক ব্যবসায়ীর কোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট নেই। ফলে সবার আগে এ ব্যবসায়ীদের প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলে নিয়ে আসতে হবে এবং ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি তাদের উৎসাহিত করতে হবে। সাধারণত খুচরা ব্যবসায়ীদের এ ধরনের ডিজিটাল লেনদেনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিতে হয়। অনেকে এ খরচ এড়াতে এখনো নগদে লেনদেন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এ সমস্যা নিরসনে সরকারকে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেয়ার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকেও কিছুটা দায়িত্ব নিতে হবে। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই ব্র্যাক ব্যাংকের বাংলা কিউআর ব্যবহার করে পেমেন্ট গ্রহণ করার ক্ষেত্রে আমরা ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছি। এছাড়া বাংলা কিউআর ব্যবহার করা গ্রাহকের পেমেন্ট তাৎক্ষণিক ব্যবসায়ীদের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করার সুবিধাও যুক্ত করেছি আমরা। পাশাপাশি ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের বাংলা কিউআর পেমেন্টের বিপরীতে রিওয়ার্ড পয়েন্ট দিচ্ছি, যা দিয়ে তারা কার্ডের বার্ষিক ফি মওকুফসহ নানা সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের পাশাপাশি ব্র্যাক ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকদের জন্যও আস্থা অ্যাপ ব্যবহার করে বাংলা কিউআর পেমেন্ট করার সুবিধা চালু করেছি। এছাড়া সারা দেশে আমাদের ব্র্যাঞ্চ, সাব-ব্রাঞ্চ, এসএমই ইউনিট অফিস এবং এজেন্ট ব্যাংকিং চ্যানেলে কর্মরত ১০ হাজারের বেশি সহকর্মীরা বাংলা কিউআর ব্যবহার করে লেনদেনে জনগণকে উৎসাহিত করে যাচ্ছেন।

বাংলা কিউআর প্লাটফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

গ্রাহকদের এখন দোকানে গিয়ে কেনাকাটার পর নিজের নির্দিষ্ট ব্যাংকের কিউআর কোড খোঁজার কোনো প্রয়োজন নেই। বাংলা কিউআর একটি সম্পূর্ণ সর্বজনীন ব্যবস্থা। ফলে আপনার ফোনে ব্র্যাক ব্যাংক বা যেকোনো ব্যাংক কিংবা এমএফএস অ্যাপ থাকলেই একটিমাত্র কোড স্ক্যান করে মুহূর্তেই পেমেন্ট করা সম্ভব। তবে সুরক্ষার স্বার্থে, কিউআর স্ক্যান করার পর পিন বা ওটিপি দেয়ার আগে স্ক্রিনে প্রদর্শিত মার্চেন্টের নাম এবং টাকার পরিমাণটি অবশ্যই ভালো করে মিলিয়ে নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই নিজের পিন বা পাসওয়ার্ড অন্য কারো সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে প্রতিটি ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ডিজিটাল ওয়ালেটে সুরক্ষিত থাকে। এটি যেমন গ্রাহকের প্রতি মাসের খরচের হিসাব রাখতে সাহায্য করবে, ঠিক তেমনি নিয়মিত ডিজিটাল লেনদেনের এ নির্ভরযোগ্য রেকর্ড ভবিষ্যতে ব্যাংক থেকে সহজেই ঋণ পেতে বড় ভূমিকা রাখবে।

বাংলা কিউআর দেশব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সরকারের কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আপনার মনে হয়?

বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বা বাংলা কিউআর ব্যবহারের পরিচালন ব্যয় ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। তবে এ ডিজিটাল পেমেন্ট সেবা কীভাবে আরো কম খরচে সর্বস্তরে পৌঁছে দেয়া যায়, তা নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। আমরা যদি ভারত কিংবা থাইল্যান্ডের দিকে তাকাই, তবে দেখব যে দেশগুলো কিউআর পেমেন্ট দ্রুত বিস্তারের লক্ষ্যে এ সেবা প্রায় বিনামূল্যে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল। এর মানে কিন্তু এই নয় যে এ পেমেন্ট প্রক্রিয়াকরণের খরচ শূন্য হয়ে গিয়েছিল। বরং এ ব্যয় মার্চেন্ট বা বিক্রেতাদের ওপর না চাপিয়ে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, পেমেন্ট নেটওয়ার্ক এবং অংশীদার ব্যাংকগুলো যৌথভাবে ভাগ করে নিয়েছিল। কারণ দেশগুলো শুরু থেকেই কিউআর পেমেন্ট ব্যবস্থাকে একটি জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করেছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে প্রথাগত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তারা এ দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছিল, যার সুফল তারা আজ ভোগ করছে। বাংলাদেশ এখন কোন পথে হাঁটবে, সেটিই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। বাংলা কিউআর ব্যবহার করে পেমেন্ট সেবাটি কম খরচে দিতে আমাদের এখন একটি দৃঢ় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। এমডিআর ও অবকাঠামো নির্মাণের এ খরচ আসলে কে বহন করবে—সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নাকি মার্চেন্টরা? এ নীতিগত প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে বাংলা কিউআর ব্যবহারে কত দ্রুত সাধারণ মানুষ অভ্যস্ত হবে।

আরও