২০২২-২৩ অর্থবছর

রফতানিতে নয় বিলিয়ন ডলারের তথ্য তারতম্য!

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে পণ্য রফতানি হয়েছে ৫ হাজার ৫৫৫ কোটি ডলারের। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ড্যাশবোর্ডের হিসাবে দেখা যায়, রফতানিকারকরা গত অর্থবছরে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানির ঘোষণা (ইএক্সপি) দিয়েছেন ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ডলারের। এ অনুযায়ী দুই সংস্থার গত অর্থবছরের

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে পণ্য রফতানি হয়েছে ৫ হাজার ৫৫৫ কোটি ডলারের। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ড্যাশবোর্ডের হিসাবে দেখা যায়, রফতানিকারকরা গত অর্থবছরে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানির ঘোষণা (ইএক্সপি) দিয়েছেন ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ডলারের। এ অনুযায়ী দুই সংস্থার গত অর্থবছরের রফতানি তথ্যে গরমিল রয়েছে ৯২৪ কোটি (৯ দশমিক ২৪ বিলিয়ন) ডলারের। ইপিবি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রফতানি তথ্যে বরাবরই গরমিল থাকলেও গত অর্থবছরেই তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

রফতানি তথ্যের এ বড় ব্যবধান এখন ভাবিয়ে তুলেছে খোদ নীতিনির্ধারকদেরও। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ১০ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষের সভাপতিত্বে ‘রফতানি পরিসংখ্যানে গরমিল দূরীকরণ’ সংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গত অর্থবছরসহ রফতানি তথ্যের ধারাবাহিক গরমিলের পর্যালোচনা নিয়ে আলোচনা হয়। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানের জন্য সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌পর্যালোচনায় দেখা গেছে ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি তথ্যে গরমিলের যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তবে গত অর্থবছরে ৯ বিলিয়ন ডলারের গরমিলটা অনেক বেশি। এ কারণেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা দ্রুতই বাস্তবায়ন হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ডলারের পণ্য রফতানির ঘোষণা দিয়েছেন রফতানিকারকরা। ঘোষিত এ পরিমাণের মধ্যে ৪ হাজার ৫৬৭ কোটি ডলারের পণ্য রফতানির তথ্য নিশ্চিত করতে পেরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে দেশে প্রত্যাবাসিত হয়েছে ৪ হাজার ৩৪৬ কোটি ডলার। প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় আছে প্রায় ২২১ কোটি ডলার। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের এজেন্সি কমিশন, ব্যাংক চার্জ কেটে সর্বোচ্চ ২ বিলিয়ন ডলার অর্থ দেশে প্রত্যাবাসনের সুযোগ রয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত সভার পর্যালোচনায় বলা হয়, স্বাভাবিকভাবেই ইপিবির পরিসংখ্যানে রফতানির অংক বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের চেয়ে বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু পার্থক্যও সীমাবদ্ধ থাকতে পারে সর্বোচ্চ ২-৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। কিন্তু গত অর্থবছরে তারতম্য দেখা যাচ্ছে ৯২৪ কোটি ডলারের, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের মধ্যে ২০১৮ সালে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ড্যাশবোর্ডের সঙ্গে এনবিআরের অ্যাসাইকুডা সিস্টেমের ইলেকট্রনিক যোগাযোগ স্থাপিত রয়েছে। ব্যাংকগুলো ড্যাশবোর্ডে যে রফতানির ঘোষণা দেবে, সেটিই পণ্য রফতানি হিসেবে গণ্য হবে। এর মধ্যে পুনঃরফতানি ও পণ্যের নমুনা বা স্যাম্পল রফতানির মতো নন-ব্যাংকিং চ্যানেলের তথ্য বাদ যাবে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪ হাজার ৬৩২ কোটি ডলারের রফতানির ঘোষণার চেয়ে বেশি অর্থমূল্যের পণ্য রফতানির সুযোগ তেমন একটা নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইপিবির তথ্যে কিছু গরমিল দেখা যেতে পারে। আমরা রফতানি ধরি প্রকৃত প্রত্যাবাসনের তথ্যের ভিত্তিতে। বর্তমানে আমরা গরমিল দূর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, যাতে করে ডাটা ডেফিনেশনগুলো এক জায়গায় থাকতে পারে। গরমিল থাকলেও পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা যেন থাকে সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি।’ 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের সঙ্গে ইপিবির রফতানির তথ্যের পার্থক্যের একাধিক কারণ থাকতে পারে। ইপিবি কাস্টম হাউজগুলোয় ইস্যুকৃত বিল অব এক্সপোর্টের ভিত্তিতে রফতানির তথ্য প্রস্তুত করে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তুত করে বিল অব লেডিংয়ের ভিত্তিতে। কাস্টমস থেকে কোনো বিল অব এক্সপোর্ট পরে বাতিল হলে সে তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে সমন্বয় করা হয়। কিন্তু এ তথ্য ইপিবির কাছে থাকে না। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক সিএমটির (কাটিং, মেকিং ও ট্রিমিং) ভিত্তিতে রফতানির ক্ষেত্রে কেবল মূল্য সংযোজনের পরিমাণকে রফতানি হিসেবে গণ্য করে। অন্যদিকে ইপিবি গণ্য করে সম্পূর্ণ অর্থমূল্যকে (ইনভয়েস ভ্যালু)। এর পরও রফতানি তথ্যের এত বড় ব্যবধানকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, সিএমটি রফতানির সম্পূর্ণ মূল্য হিসাব করলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রফতানির পরিমাণ ১১০ কোটি ডলার বাড়বে। এছাড়া বিল অব এক্সপোর্ট বাতিল হয়েছে ৩০ কোটি ডলারের। সাধারণত এর পরিমাণ ৫০ কোটি ডলারের আশপাশে থাকে। এছাড়া বিল অব এক্সপোর্ট ইস্যু হয়েছে অথচ ব্যাংকগুলো এখনো বিল অব লেডিংয়ের তথ্য দেয়নি এমন সম্ভাব্য রফতানির অর্থমূল্য সাড়ে ৭৪ কোটি ডলারের মতো। সামগ্রিক পর্যালোচনায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানির সুযোগ রয়েছে।

দেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত পোশাক পণ্যের রফতানিকারকরা বলছেন, তথ্যে গরমিলের বিষয়টি তাদের কাছে পরিষ্কার না। সরকারের পরিসংখ্যানের সঙ্গে ক্রয়াদেশ পরিস্থিতির তুলনামূলক বিশ্লেষণে হিসাব মিলছে না। সরকারের পক্ষ থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান নিয়ে খোদ রফতানিকারকদের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। কিন্তু চ্যালেঞ্জ করা যাচ্ছে না। কারণ রফতানিকারকদের নিজস্ব কোনো পরিসংখ্যান নেই। রফতানির প্রকৃত পরিমাণ যাচাইয়ের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থাও নেই। 

পোশাক রফতানিকারকদের ভাষ্যমতে, অসাধু বাণিজ্যিক চর্চার কারণেও পরিসংখ্যানে ভিন্নতা দেখা যেতে পারে। বিশ্বের অন্য অনেক স্থানের মতো বাংলাদেশেও অর্থ পাচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। পণ্য রফতানি করে অর্থ দেশে না আনার অভিযোগ রয়েছে অনেক। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ ব্যাংকের নজর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম। এর পরও নানা ফাঁকফোকর গলে এমন হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এজন্য ব্যাংকের নজরদারি ব্যবস্থা আরো শক্ত হওয়া প্রয়োজন। যে কারণই থাকুক না কেন, পরিসংখ্যানগত ভিন্নতার বিষয়টিকে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পোশাক পণ্য প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌গরমিলের বিষয়টি বলা হলেও আমরা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না যে আসলেই গরমিল রয়েছে কিনা। রফতানি বিভিন্নভাবে হচ্ছে। সমুদ্র ও আকাশপথে বিভিন্ন জায়গা থেকে হচ্ছে। গরমিলের কারণ হিসেবে অতিরিক্ত অর্থমূল্য দেখানোর কথা বলছেন অনেকে। কিন্তু বিষয়টি আমাদের কাছে পরিষ্কার না। গরমিল বলতে চাই না এ কারণে যে আমরা নিজস্ব কোনো তথ্য দিয়ে সরকারি তথ্যগুলোকে চ্যালেঞ্জও করতে পারছি না। আমি মনে করি আমাদের রফতানি তথ্য স্বচ্ছ, নির্ভুল হওয়া উচিত। ইপিবি, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্রগুলোর পরিসংখ্যানের পার্থক্য থেকে থাকলে দূর করা উচিত।’ 

বাংলাদেশ ব্যাংক ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পণ্যের রফতানি পরিমাণে কমলেও অর্থমূল্যে বেড়েছে। যদিও বড় রফতানিকারকদের প্রায় সবাই বলছেন, গত অর্থবছরে তাদের পণ্যের রফতানি কমেছে। আবার রফতানির বিপরীতে দেশে আসা প্রাপ্ত অর্থের মধ্যেও রয়েছে গরমিল। সব মিলিয়ে রফতানির তথ্য নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে খাতসংশ্লিষ্টদের।  

ইপিবি ২০২২-২৩ অর্থবছরের রফতানির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ৫ হাজার ৫৫৫ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য রফতানি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বন্দর দিয়ে পণ্য রফতানি হয়েছিল ১৯ লাখ ২৫ হাজার টন। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রফতানি হয়েছিল ১৯ লাখ ৩৩ হাজার টন পণ্য। এ অনুযায়ী, পরিমাণের দিক থেকে গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক বন্দর দিয়ে পণ্য রফতানি কমেছিল আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশের বেশি।

গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থমূল্য বিবেচনায় রফতানি হয় ১ হাজার ২৪৯ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য। ২০২১-২২ অর্থবছরের একই সময়ে পণ্য রফতানি হয়েছিল ১ হাজার ১০২ কোটি ২০ লাখ ডলারের। এ হিসাবে গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রফতানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

২০২২-২৩ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) পণ্য রফতানি হয়েছিল ১৮ লাখ ৫২ হাজার টন। এ সময় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি কমেছে ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ। যদিও অর্থমূল্যে পণ্য রফতানি ২০২২-২৩ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেড়েছে ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ।

গত অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) পরিমাণের দিক থেকে বিবেচনায় রফতানি হয় ১৭ লাখ ৪৫ হাজার টন, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৩২ শতাংশ কম। যদিও অর্থমূল্য বিবেচনায় এ সময় রফতানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ।

আরও