বন বিভাগের বেদখল হয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ ২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫২ একর। বেহাত হওয়া বিপুল এ সরকারি জমির মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত জবরদখলে থাকা ৭৯ হাজার ৯৪ একরের মূল্য নির্ধারণ করতে পেরেছে বন অধিদপ্তর। তাদের হিসাবে দখল হয়ে যাওয়া এ জমির মূল্য ১০ হাজার ১৯৭ কোটি ১৭ লাখ ৩২ হাজার ৪৯০ টাকা। সেই হিসাবে মাত্র ২১ হাজার ৩১০ টাকা ধরা হয়েছে প্রতি কাঠার মূল্য। পর্যায়ক্রমে অবশিষ্ট জমির মূল্যও নির্ধারণ করা হবে বলে সংসদীয় কমিটিতে দেয়া প্রতিবেদনে বন অধিদপ্তর জানিয়েছে।
দেশে গত চার দশকে কী পরিমাণ জমি দখল হয়েছে তা নির্ণয় করতে সারা দেশ থেকে তথ্য নিয়ে বন বিভাগ এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। বন বিভাগ বলছে, দেশে বনভূমি রয়েছে মোট ৩৫টি জেলায়। সেখানে বন অধিদপ্তরের আওতায় ভূমির পরিমাণ ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ একর, যার মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৯০৭ একর। রক্ষিত ও সংরক্ষিত দুই শ্রেণীর মধ্যে সংরক্ষিত বনই উজাড় হয়েছে বেশি। আবার দেশে সংরক্ষিত ৪০টি বনাঞ্চলের মধ্যে জাতীয় উদ্যান ১৭টি ও বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রম ২০টি। বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে বিলুপ্তির পথে এসব অভয়াশ্রমের ৪০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৪১ প্রজাতির পাখি, ৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও আট প্রজাতির উভচর প্রাণী। হুমকির মধ্যে পড়েছে অন্যান্য প্রাণিকুল। জীববৈচিত্র্যেও আসছে পরিবর্তন। সংরক্ষিত এ বনভূমি ৮৮ হাজার ২১৫ দখলদার ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সংরক্ষিত বাদে অন্যান্য বনেরও ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৫ একর জমি বেদখলে চলে গেছে, যার দখলদার চিহ্নিত হয়েছে ৭২ হাজার ৩৫১ জন। বনের এসব জমি দখল করে করা হয়েছে শিল্প-কারখানা, রিসোর্ট, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আবার অনেক জমি দখল করে কৃষিকাজেও ব্যবহার হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি জমি বেদখল হয়েছে, ৫০ হাজার একর। বন উজাড়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে বরিশাল বিভাগ। এ বিভাগ থেকে চার দশকে জবরদখল করা হয়েছে ১৫ হাজার একর জমি। ১৪ হাজার একর বনভূমি দখল করা হয়েছে বগুড়া অঞ্চলে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দখলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গাজীপুরের শালবন, টাঙ্গাইলের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান এবং কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলের বনভূমি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সরকারি অনেক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা তাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বনের জমি দখলে নিচ্ছে। বনভূমির মধ্য দিয়ে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ, বিশেষ করে সড়ক নির্মাণের ফলে দুই পাশের জমি জবরদখলের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। দেশের প্রায় সবখানেই বনভূমি দখল করে চাষাবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করেছেন প্রভাবশালীরা। অনেক জায়গায় জবরদখল করা বনভূমিতে শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। আবার অবৈধ দখল করা বনভূমি বন্ধক দিয়ে ব্যাংকঋণ নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বনের এসব জবরদখলকারীকে উচ্ছেদে বন বিভাগ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি।
বনভূমি দখলমুক্ত করতে বন বিভাগ কার্যত লোক দেখানো উদ্যোগ নিয়েছে বলে মনে করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। সে কারণেই বনের ভূমি দখলে কোনো সফলতা মেলেনি। আবার মামলা দায়েরের ফলে আদালতের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকায় দখলদারদের উচ্ছেদ করতে পারছে না বন বিভাগ। অবৈধ দখলে থাকা বনের জমি উদ্ধারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বিভিন্ন বৈঠকেই আলোচনা হয়েছে। সেসব বৈঠক থেকে জমি উদ্ধারে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন দিকনির্দেশনাও।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য জমি উদ্ধার। এই যে সংরক্ষিত বন দখল করে রাখা হয়েছে, এটা গেজেটভুক্ত। এখানে দখলদার আদালতে গিয়েও কিছু করতে পারবে না। বিভিন্ন ক্যাটাগরির বনের জমি দখল হয়ে আছে। আগে সংরক্ষিত বনের জমি উদ্ধারে মন্ত্রণালয়কে হাত দিতে বলা হয়েছে। এটা শুরু হলে অন্য দখলদাররা সতর্ক হয়ে যাবে।’
সাবের হোসেন চৌধুরী আরো বলেন, ‘বনের জমি দখল করে যেসব জায়গায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেসব জমি উদ্ধার করা হবে। শিল্পোদ্যোক্তাদের আমরা সম্মানের চোখে দেখি। তাদের কাছে অনুরোধ থাকবে, তারা যদি বনের জমি দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে থাকেন, তাহলে যেন তা ফেরত
দিয়ে দেন।’
বনের জমি উদ্ধারে তত্পরতা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বনভূমি দখলদারদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আমরা করেছি। সেই তালিকা অনুযায়ী বেদখলে থাকা বনভূমি উদ্ধারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব বনভূমি উদ্ধারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’