নিজের শ্রমের মূল্য হিসাবের খাতায় না তুললেও সেচ, সার, বীজ, শ্রমিক ও পরিবহন—প্রতিটিই যত্ন করে লিখে রেখেছিলেন। মৌসুম শেষে ধান বিক্রি করে দেখা যায়, সব খরচ বাদ দিয়ে তার হাতে উদ্বৃত্ত থাকে মাত্র ৬ হাজার টাকা। অথচ এতে নিজের কয়েক মাসের পরিশ্রমের কোনো মূল্যই ধরা হয়নি। এ অভিজ্ঞতা থেকেই চলতি মৌসুমে তিন বিঘায় ধান ও বাকি জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন আব্দুল হাকিম। আগামী মৌসুমে ধান আবাদ আরো কমানোর পরিকল্পনা।
আব্দুল হাকিম বললেন, ‘নিজের শ্রমের মূল্য যোগ করলে ধান চাষে আমার কোনো লাভই থাকে না, উল্টো লোকসান। এত পরিশ্রম করে শেষ পর্যন্ত যে আয় হয়, তা দিয়ে খরচই ঠিকমতো ওঠে না।’
কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোরো ধানে কৃষকের মুনাফা নেই। কখনো কখনো যে টাকা ব্যয় করেন ধান বিক্রি করে তাও ওঠে না। ফলে ধীরে ধীরে বোরো ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। অন্যদিকে বোরোর তুলনায় আমন চাষ বেশি হলেও উৎপাদনশীলতায় অনেক পিছিয়ে। ফলে বোরো চাষে কৃষকের আগ্রহ কমে গেলে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বোরোর উৎপাদন ব্যয় বেশি। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি ২০১৭-১৮ সালের দিকে এ নিয়ে তিন রাউন্ডের সার্ভে করেছিল। তারা দেখিয়েছিল, বোরো ধানের নিট রিটার্ন নেগেটিভ। এখন এগ্রিকালচার কমার্শিয়ালাইজ হচ্ছে। আগের মতো শুধু খাওয়ার জন্য চাষ করব, এমন অবস্থায় নেই। খাবার কিনে খাব?—এ ধরনের সোশ্যাল স্টিগমাও কমে গেছে। ফলে কৃষক তার মুনাফার হিসাব করেই চাষ করছেন। এটি খুব বৃহৎ আকারে এখনো পৌঁছেনি হয়তো, কিন্তু এ ধারা বাড়ছে। ফলে কৃষক যখন দেখবেন তার মুনাফা আসছে না, তখন সেই চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। এটা ঠিক যে রাতারাতি এখানে বড় পরিবর্তন হবে না। এমন হতে পারে যে কৃষক ১০ বিঘা চাষ করতেন তিনি আট বা নয় বিঘা আবাদ করছেন। এভাবেই ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে পারে।’
মোট ধান উৎপাদনের বৃহদংশ অর্থাৎ প্রায় ৫৫-৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে। আর উৎপাদনের প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ আসে আমন ও আউশ থেকে। যদিও আউশের অবদান একেবারেই কম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের ধান হওয়া জমির মধ্যে ৪১ দশমিক ৮২ শতাংশে বোরোর চাষ হয়। আমন চাষ হয়েছিল ৪৯ দশমিক ৩১ শতাংশে এবং আউশ আবাদ হয় ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ জমিতে। ওই অর্থবছরে ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে বোরোর ফলন ছিল ২ কোটি ১০ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬৮ টন ধান। আমন আবাদ ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ৭৫৫ হেক্টর জমিতে হলেও ফলন ছিল ১ কোটি ৬৬ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৩ টন। আউশ চাষ হয়েছিল ১০ লাখ ৩৪ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে। ফলন হয় ২৯ লাখ ৭২ হাজার ৮৫৮ টন ধান।
খাতসংশ্লিষ্ট ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে আমনের তুলনায় বোরো ধান চাষে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশ বেশি। এর অন্যতম কারণ আমন বৃষ্টিনির্ভর ধান, আর বোরো উচ্চ সেচনির্ভর। ফলে বোরোর জন্য ব্যাপক ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সেচ ব্যবস্থা রাখতে হয়। সার ও কীটনাশকও বেশি দিতে হয়। সারের পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টি উপাদানেরও প্রয়োজন হয় বোরো উৎপাদনে। শ্রমও বেশি দিতে হয়। অবশ্য আমনের চেয়ে বোরোর হেক্টরপ্রতি ফলন ২০-৩০ শতাংশ বেশি। খরচ বেশি হওয়ায় কৃষককে বেশির ভাগ সময় লোকসান গুনতে হয়।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষি ইনপুট ব্যয় বেড়েছে। সারে সরকার ভর্তুকি দিলেও সেচ, শ্রমিক, কীটনাশক, পরিবহন ও মাড়াইয়ে বেড়েছে কৃষকের ব্যয়। বিপরীতে তারা ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে তারা বোরো চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ভৌগোলিক কারণে কিছু জমিতে কৃষক এ ধানের আবাদ ছাড়তে পারছেন না। কেননা সেখানে বিকল্প চাষের সুযোগ নেই। কিন্তু সমতলে এ চাষ কমে আসছে। আবার আমন ও আউশে তুলনামূলক ব্যয় কম হলেও ফলন বেশি হয় না। সেজন্য কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে লাভজনক অবস্থানে নিতে সরকারকে নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় ঝুঁকিতে পড়বে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় ছিল ২৯ টাকা ৫৩ পয়সা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩১ টাকা ৬০ পয়সা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি একর রোপা বোরো হাইব্রিড ধান উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় হয় ৮১ হাজার ৯২১ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য বাবদ আরো ব্যয় যোগ হয় ২ হাজার ২৫০ টাকা (মোট ৮৪ হাজার ১৭১ টাকা)। প্রতি একরে তিন হাজার কেজি ধান উৎপাদন হলে পরিবহনসহ সব মিলিয়ে কৃষকের প্রতি কেজিতে ব্যয় দাঁড়ায় ২৮ টাকা ৫ পয়সা। তবে ধান থেকে পাওয়া খড়ের দাম ৯ হাজার টাকা হিসাব করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে কৃষকের কেজিপ্রতি নিট ব্যয় ছিল ২৪ টাকা ৩১ পয়সা। যেখানে প্রতি কেজি ধান কৃষক বিক্রি করেছেন গড়ে ২৭ টাকা ৪৯ পয়সা বা ২ টাকা ৪৩ পয়সা মুনাফায়। এ হিসাবে এক একর বোরো ধান চাষ করে কৃষকের মুনাফা হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ২৯২ টাকা। তবে অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, সরকারি হিসাবের তুলনায় কৃষকের ব্যয় আরো বেশি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়েনি। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। এখানে প্রচুর গবেষণা দরকার। সেটি হচ্ছে না। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। নানা মধ্যস্বত্বভোগী এখানে বসে আছে। ফলে তারা যখন মুনাফা কম পাবেন তখন অন্য চাষে ঝুঁকবেন, এটিই স্বাভাবিক। সেজন্য বাজার ব্যবস্থাপনা জরুরি। ন্যায্যমূল্য পেলে ও উৎপাদনশীলতা বাড়লে কৃষক লাভবান হবেন। তারা লাভবান হলে কৃষি বাঁচবে। কৃষি বাঁচলে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকারি নীতিগুলো জ্বর এলে নাপা খাওয়ানোর মতো। তাৎক্ষণিক সমস্যা মেটানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদের বিষয়টি চিন্তা করা হয় না। এখানে গবেষণা বাড়ানোর বিকল্প নেই।’
কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেশি এবং ন্যায্যমূল্য পান না, এটি মিথ্যা না। এর অন্যতম কারণ দেশে কী পরিমাণ চাহিদা রয়েছে তা কৃষক জানেন না। ফলে অধিক উৎপাদনের কারণেও অনেক সময় দাম পান না। আমরা কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের সেসব ডেটাবেজ করছি। এর মাধ্যমে কৃষক চাহিদা জানতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী উৎপাদন করবেন। এটি করলে তাদের ফসল অবিক্রীত বা কম দামে বিক্রি হবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে আমরা কাজ করছি। তাদের অন্যতম বড় ব্যয়ের জায়গা সার প্রয়োগ। আমরা সম্প্রতি গবেষণা করে দেখেছি, জমিতে ক্ষার বেড়ে যাওয়ায় সার বেশি লাগছে। গবেষণা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সারের ব্যবহার ২৩ শতাংশ কমে আসবে। আরেকটি বড় ব্যয়ের জায়গা সেচ। কৃষকের সেচ ব্যয় কমাতে সৌরবিদ্যুতের দিকে যাচ্ছি। এতে তাদের অনেক ব্যয় কমে আসবে। সরকার মাত্র চার মাস দায়িত্ব নিয়েছে। আর কিছুদিন কাজ করলে আশা করছি এসব সমস্যা খুব একটা থাকবে না।’