এমটিএফইর অর্থ আত্মসাতের পথ ত্বরান্বিত হয়েছে ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধায়

বাংলাদেশে প্রথম মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি হিসেবে জিজিএন বা গ্লোবাল গার্ডিয়ান নেটওয়ার্কের আবির্ভাব হয় ১৯৯৮ সালে। এরপর পর্যায়ক্রমে টংচং, ডেসটিনি, ইউনিপে, নিউওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানও প্রায় একই মডেলে ব্যবসা জুড়ে বসে। তারও আগে যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক) নামে বহুল আলোচিত কোম্পানি প্রায় একই পদ্ধতিতে দেশব্যাপী কার্যক্রম শুরু করে। তবে সে সময় লেনদেনের

বাংলাদেশে প্রথম মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি হিসেবে জিজিএন বা গ্লোবাল গার্ডিয়ান নেটওয়ার্কের আবির্ভাব হয় ১৯৯৮ সালে। এরপর পর্যায়ক্রমে টংচং, ডেসটিনি, ইউনিপে, নিউওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানও প্রায় একই মডেলে ব্যবসা জুড়ে বসে। তারও আগে যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক) নামে বহুল আলোচিত কোম্পানি প্রায় একই পদ্ধতিতে দেশব্যাপী কার্যক্রম শুরু করে। তবে সে সময় লেনদেনের আধুনিক কোনো উপায় না থাকায় অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া ছিল ধীর। বর্তমানে লেনদেন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হয়েছে। এসেছে ডিজিটাল পেমেন্ট পদ্ধতি। এতে ঘরে বসেই লেনদেন করা যাচ্ছে নিমিষে। এ সুযোগই কাজে লাগিয়েছে দুবাইভিত্তিক এমএলএম প্রতিষ্ঠান অ্যাপ মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ বা এমটিএফই। প্রতারণার ফাঁদে ফেলে লক্ষাধিক মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। অবৈধ অনলাইন গ্যাম্বলিং ক্রিপ্টো ট্রেডিং করা এ প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের পথ মূলত ডিজিটাল পেমেন্টেই ত্বরান্বিত হয়েছে বলে মনে করেন আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি আগাম আর্থিক অপরাধ শনাক্তে দেশে মজবুত ভিত্তি গড়ে না ওঠাকেও দায়ী করছেন তারা।  

এমটিএফইর প্রতারণায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা জানান, দুই সপ্তাহ আগে তথাকথিত সিস্টেম আপগ্রেডের মাধ্যমে সমস্যার শুরু। এর পর থেকে ব্যবহারকারীরা অ্যাপটি থেকে কোনো টাকা তুলতে পারছিলেন না। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে অ্যাপটি প্রায় সব ব্যবহারকারীর ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট ঋণাত্মক দেখানো শুরু করে। গ্রাহকদের পক্ষে স্বয়ংক্রিয় লেনদেনের পর বিপুল লোকসান হয়েছে বলে দাবি করে অনিয়ন্ত্রিত এ সংস্থা।

এমটিএফই কানাডায় নিবন্ধিত সংস্থা বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। এর কার্যক্রম শ্রীলংকা, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও ভারতেও ছড়িয়েছিল। এসব দেশের ব্যবহারকারীদেরও একই পরিণতি হয়েছে। ক্রিপ্টো, বৈদেশিক মুদ্রা, পণ্য, এমনকি বিদেশী স্টক পর্যন্ত নিজের ছায়া প্লাটফর্মে ট্রেড করার সুযোগ দিয়ে এ অ্যাপ সম্প্রতি অবিশ্বাস্য রকমের জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ট্রেডিং থেকে উপার্জন ও অর্থ পরিশোধের কথা বলে এমটিএফই তাদের অ্যাপ ব্যবহারকারীদের সহজ পথে অর্থ আয়ের আমন্ত্রণ জানায়। 

বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা এবং ক্রিপ্টো কারেন্সিতে লেনদেন অবৈধ ও নিষিদ্ধ। এর পরও কমপক্ষে ৫০০ ডলার বিনিয়োগ করলে দিন শেষে ৫ হাজার টাকা লাভ হবে এমন চটকদার প্রলোভনে গ্রাহকরা বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। অনেকে গহনা ও মূল্যবান সামগ্রী বন্ধক রেখেও বিনিয়োগ করেছিলেন। অ্যাপের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং বা বাইন্যান্সের মাধ্যমে টাকা নিত এমটিএফই। পরে স্থানীয় এজেন্টরা সেই অর্থ বাইরে পাচার করত।

বেশ কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অ্যাপটিতে কেউ ৫০০ ডলার বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন যদিও তাকে লাভ দেয়া হতো প্রায় ১৩ ডলার। তখন বলা হতো, এত অল্প বিনিয়োগ হলে তো আর বড় লাভ আসবে না। বিনিয়োগ যত বেশি, লাভের পরিমাণও তত বেশি দিত অ্যাপটি। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য মাঝে মধ্যে লোকসানও দেখানো হতো। এজন্য ৫ হাজার, ১০ হাজার, এমনকি ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন অনেক গ্রাহক।

গ্রাহকরা জানান, বিনিয়োগের ওপর সব মিলিয়ে মাসে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত লাভ পাওয়া যেত। কেউ ৫০১ ডলার বা ৫৮ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১১৬ টাকা ধরে) বিনিয়োগ করলে তার প্রতিদিন লাভ আসত প্রায় ১৩ ডলার বা ১ হাজার ৫০০ টাকা। বিনিয়োগ ৯০১ ডলার বা ১ লাখ ৫ হাজার টাকা হলে প্রতিদিন লাভ পাওয়া যেত প্রায় ৩ হাজার টাকা। কেউ ৫ হাজার ডলার অর্থাৎ ৬ লাখ টাকার মতো বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন লাভ আসত প্রায় ৩২ হাজার টাকার সমপরিমাণ। এ লাভ আবার মাঝে মধ্যে দ্বিগুণও দেয়া হতো। 

শুধু বিনিয়োগের ওপর লাভই নয়, কাউকে দিয়ে বিনিয়োগ করাতে পারলে তাদের লাভের ওপর পাওয়া যেত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন। এমন করে কারো মাধ্যমে ১০০ গ্রাহক বিনিয়োগ করলে ওই ব্যক্তির পদবি হতো সিইও। কমিশন আর নিজের বিনিয়োগের অর্থ মিলিয়ে কথিত সিইওকে মাসে ১৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করার প্রলোভন দেখানো হতো। রাশেদ নামে এক বিনিয়োগকারী জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কয়েকশ সিইও পদবিধারী ব্যক্তি ছিলেন কোম্পানিটিতে। তাদের প্রত্যেকের অধীনে ছিলেন কয়েকশ বিনিয়োগকারী। এ পদে এলে আবার তাদের জন্য অফিস নেয়ার বাধ্যবাধকতাও ছিল। অর্থাৎ মূল হোতাদের কোনো অফিস না থাকলেও পদবিধারী সিইওদের দিয়ে তারা অফিস নেয়ার কাজটি করাত। রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে এমন কয়েকশ অফিস রয়েছে বলেও জানা গেছে।

ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা নিয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অ্যাপের মাধ্যমে এমটিএফই দেশে অবৈধ এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করে এলেও লাপাত্তা হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ততক্ষণে প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয় বলে দাবি করেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এসব লেনদেনের পুরোটাই হয়েছে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে। এমটিএফই গ্রাহকরাও পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করেছেন। আর ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে বাইন্যান্স ব্যবহার করেছে এমটিএফই। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো কারেন্সি এক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে বাইন্যান্স অন্যতম। ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ডিজিটাল প্লাটফর্ম কিমান আইল্যান্ডে অবস্থিত। 

আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমএলএমের মাধ্যমে ডেসটিনি-ইউনিপেসহ আরো অনেকেই প্রতারণা করেছে। তবে সে সময় ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা না থাকায় সরাসরি গিয়ে টাকা জমা দিতে হতো। এক জেলা থেকে অন্য জেলা বা এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে এ ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে বেশ সময়ের ব্যাপার ছিল। কিন্তু ডিজিটাল পেমেন্টের যুগে টাকা বহন করে নেয়া বা অতিরিক্ত সময় কোনোটিরই প্রয়োজন হচ্ছে না। এ সুযোগই এমটিএফইর অর্থ আত্মসাতের পথ ত্বরান্বিত করেছে। পাশাপাশি এ ধরনের আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রে আগাম শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠাকেও এ ধরনের অপরাধ বিস্তারের কারণ হিসেবে মনে করছেন তারা।

এমটিএফইর মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে বলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিরও সন্দেহ। সংস্থাটির মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজাদ রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমটিএফই দেশে যে ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে সেটি পুরোপুরিই অবৈধ। এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে তারা আত্মসাতের অর্থ পাচার করে থাকতে পারে। এরই মধ্যে গ্রাহকরা দাবি করেছেন, ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। এ ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদের ধরতে কাজ শুরু করেছে সিআইডি। সংস্থাটির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বিএফআইইউ কাজ শুরু করেছে। অবৈধ হুন্ডি রুখতে এরই মধ্যে তারা ১৮ হাজার ৭২৫টি এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্লক করেছে। ব্যবস্থা নিয়েছে ৫ হাজার ৮৮৪ এজেন্ট ও ২৩ ডিস্ট্রিবিউটরের বিরুদ্ধে। এর বাইরে অনলাইনে জুয়া পরিচালনার কারণে ৬৬৮টি ওয়েবসাইট, ১৪৮টি অ্যাপ ও ৪০১টি সোশ্যাল মিডিয়া পেজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সংস্থাটি।’ 

বিএফআইইউর প্রধান মো. মাসুদ বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমটিএফই মূলত বাইন্যান্স ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নামে কোনো লেনদেন ছিল না। এ ধরনের এমএলএম বা বেটিং কার্যক্রম পরিচালনাকারী সাইটগুলো নিয়মিত তালিকা করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে দেয়া হচ্ছে। বিটিআরসির সহযোগিতায় এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেও নেয়া হয়েছে। এর পরও সাধারণ মানুষ লোভে পড়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’ 

অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে গত পাঁচ বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ইভ্যালি, ধামাকা, দালাল, আলেশামার্টের মতো অন্তত ১৭টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে চারটি ই-কমার্সের ৩৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। এর মধ্যে ধামাকা শপিং ডটকমের বিরুদ্ধে ১১৬ কোটি, ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে ২৩২ কোটি, এসপিসি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে দেড় কোটি ও টোয়েন্টিফোর টিকেটি ডটকমের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে।

অনলাইনে অ্যাপভিত্তিক প্রতারণার কার্যক্রম রোধে গৃহীত পদক্ষেপ জানতে যোগাযোগ করা হয় বিটিআরসির সিস্টেম অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাসিম পারভেজের সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বিটিআরসি টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি। আমাদের সরাসরি মনিটরিংয়ের সুযোগ নেই। ক্ষতিকর অ্যাপস সম্পর্কে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চিহ্নিত করে জানালে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। এর বাইরে আর্থিক লেনদেন বা অপরাধের বিষয়টি মনিটরিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। টাকা অবৈধভাবে পাঠানোর ব্যবস্থা বন্ধ করা গেলেই এ ধরনের অপরাধ রোধ করা সম্ভব।’

আরও