বিপন্ন ও বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। এসব প্রাণীর জন্য অভয়ারণ্য হওয়ার কথা ছিল উদ্যানটির। কিন্তু বিদ্যুতের খোলা তার উল্টো বিভিন্ন প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া রেল ও সড়কপথেও বন্যপ্রাণী মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। এসব ঝুঁকি দূর করতে পল্লীবিদ্যুৎ বিভাগকে খোলা তারের পরিবর্তে রাবারের আবরণযুক্ত তার ব্যবহারের আবেদন জানিয়েছে বন বিভাগ। পাশাপাশি উদ্যানের ভেতর দিয়ে যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে গতি নিয়ন্ত্রণ ও রাতে পথটি বন্ধ রাখার বিষয়ে কাজ চলছে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সূত্র জানায়, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটার এবং সংলগ্ন এলাকায় ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটারজুড়ে বিদ্যুতের খোলা তার রয়েছে। এ তারে স্পৃষ্ট হয়ে প্রায়ই মারা পড়ছে বন্যপ্রাণী। সবশেষে ৩ মার্চ দুপুরে জাতীয় উদ্যানের ভেতর বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবসের অনুষ্ঠান চলাকালে বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে মারা যায় একটি চশমা পরা মা হনুমান। মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে তিনদিন বয়সী শাবকটি। সেটিকে উদ্ধার করে জানকীছড়া রেসকিউ সেন্টারে নেয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত শাবকটিকে বাঁচানো যায়নি, চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ মার্চ মারা যায় হনুমানশাবকটি। একই দিনে সড়কে গাড়িচাপায় মারা যায় উল্টো লেজি আরেকটি বিরল প্রজাতির বানর। এছাড়া গত ২২ ফেব্রুয়ারি লাউয়াছড়া-সংলগ্ন ফুলবাড়ী চা-বাগান এলাকায় একটি এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর এলাকায় একটি চশমাপরা হনুমান বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়।
এছাড়া ২০২১ সালেও বেশকিছু বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৯ এপ্রিল গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট এলাকায় একটি লজ্জাবতী বানর, ১৮ জুন রামনগর এলাকায় একটি চশমাপরা হনুমান, ১৬ জুলাই কালাছড়া বিট অফিসের সামনে একটি মুখপোড়া হনুমান, ২৪ জুলাই ভিক্টোরিয়া স্কুলের সামনে একটি বানর ও ১৩ সেপ্টেম্বর আরেকটি বানরের মৃত্যু হয়। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, প্রতি বছর শতাধিক বন্যপ্রাণীর মৃত্যু হয়। কিন্তু এর বেশির ভাগই থেকে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে। আর সড়কেও প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো প্রাণীর মৃত্যু হয়।
বনবিভাগ জানায়, এ উদ্যানে বিশ্বের বিপন্ন ও বিরল অনেক প্রাণীর বাস। বানরসহ অনেক প্রাণী আছে, যারা কেবল গাছেই বাস করে। এরা এক গাছ থেকে আরেক গাছে বিচরণের সময় বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং উদ্যানের পার্শ্ববর্তী লোকালয়ে বিদ্যমান বৈদ্যুতিক লাইনের আবরণবিহীন তারের পরিবর্তে রাবারের বা অন্য বিদ্যুৎ অপরিবাহী মাধ্যমের আবরণযুক্ত তার প্রতিস্থাপন করতে মৌলভীবাজার পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক বরাবর চিঠি দিয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগ এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী নুরুল মোহাইমিন মিল্টন অভিযোগ করে বলেন, বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়ার ফলে এমনিতেই বন্যপ্রাণীর জীবন ও প্রজনন হুমকির মুখে। খাবার ও বাসস্থানের সংকটে প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসে এসব প্রাণী। যাদের মৃত্যু হয় মানুষের হাতে। তার ওপর লাউয়াছড়া বনের সড়ক, রেলপথ ও বৈদ্যুতিক তারগুলোও যদি মরণফাঁদ হয়ে ওঠে, তাহলে বিষয়টি দুশ্চিন্তার। এ ভয়াবহ অবস্থা থেকে বন্যপ্রাণী রক্ষায় এখনই ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি। না হলে এসব বিপন্ন প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখাই মুশকিল হয়ে যাবে।
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরওয়ার জানান, সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে আবারো কথা বলেছেন তারা। বিদ্যুৎ বিভাগ রাবার কোটেড তার প্রতিস্থাপন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর সড়কপথে বন্যপ্রাণীর মৃত্যু কমাতে এ সড়কে গাড়ির গতিসীমা ২০ কিলোমিটার রাখতে কাজ করছেন বলে জানান এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, চালকদের সচেতন করতে পারলে অনেক প্রাণীর জীবন বেঁচে যাবে।
প্রতি বছর লাউয়াছড়া ও সংলগ্ন এলাকায় কী পরিমাণ বন্যপ্রাণী মারা যায়, তার প্রকৃত তথ্য কারো কাছে নেই। কেবল যেগুলো বনবিভাগের নজরে আসে, সেগুলোরই হিসাব রাখে তারা। গহিন বনে বা রাতে সড়ক পারাপারের সময় গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যাওয়া প্রাণীর তথ্য বেশির ভাগ সময়ই পাওয়া যায় না।
বনবিভাগ, বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন ও পরিবেশকর্মীদের মতে, বনের ভেতর দিয়ে চলা সড়ক, রেলপথ ও বৈদ্যুতিক তারে স্পৃষ্ট হয়ে এবং লোকালয়ে এসে মানুষের হাতে প্রতি বছর শতাধিক প্রাণীর মৃত্যু হয়। আহত কিছু প্রাণীকে হয়তো উদ্ধার করে চিকিৎসা দিয়ে বনে ছেড়ে দেয়া হয়, কিন্তু সে সংখ্যা খুব বেশি নয়। আবার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর বন্যপ্রাণীদের জন্য একটি রেসকিউ সেন্টার নির্মাণ করা হলেও চিকিৎসক, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় সেটি খুব একটা উপকারে আসে না বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।
কয়েকজন পরিবেশকর্মী জানান, খাদ্য ও আবাস সংকটে লাউয়াছড়া বনে প্রাণীদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। দুই দশক আগে এ বনে কয়েক হাজার উল্লুক দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে সে সংখ্যা কমতে কমতে একশর নিচে চলে এসেছে। একই অবস্থা অন্য বন্যপ্রাণীদের ক্ষেত্রেও বলা যায়।
স্থানীয় লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মান্ত্রী (পুঞ্জিপ্রধান) ফিলা পতমী বলেন, একসময় আমরা পান জুমের আশপাশে অসংখ্য জীবজন্তু দেখতাম কিন্তু এখন তাদের দেখা যায় না। আমরা অনেক বন্যপ্রাণীর চেহারা প্রায় ভুলেই গেছি। কারণ এগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
লাউয়াছড়া বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক জলি পাল বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে রেল ও সড়কপথ বন্যপ্রাণীদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বনের মধ্য থেকে সড়ক ও রেলপথ স্থানান্তরের দাবি জানিয়ে আসছি। পথগুলো স্থানান্তর করা না গেলে কোনোভাবেই তাদের রক্ষা করা যাবে না। করোনাকালে গাড়ি চলাচল কম থাকায় সড়কপথে মৃত্যু কিছুটা কম ছিল, এখন আবার বেড়ে গেছে। এছাড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি যদি দ্রুত তারগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা না করে, তাহলে আন্দোলন শুরু করবেন বলেও জানান তিনি।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, অনেক বিপন্ন প্রাণী এখানে টিকে আছে। তাদের রক্ষার জন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বৈদ্যুতিক তার রাবারের আবরণযুক্ত করায় সেসব তারে এখন বানর প্রজাতি ঝুলে থাকে, মজা করে। লাউয়াছড়াতেও এ ব্যবস্থা করা গেলে বন্যপ্রাণীরা অনেকটাই আশঙ্কামুক্ত থাকবে। বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে তাদের সঙ্গে দেখা করব। তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেবে আশা করি। আর সড়কপথটিতে রাতে যান চলাচল বন্ধ রাখা যায় কিনা সেটি নিয়ে আমরা কাজ করছি।
মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক শাখাওয়াত হোসেন বণিক বার্তাকে জানান, তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন। পল্লী বিদ্যুতের কারণে কোনো বন্যপ্রাণীর যেন মৃত্যু না হয়, সেজন্য যথাসাধ্য ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
বনবিভাগ সূত্র জানায়, লাউয়াছড়ায় ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২২ প্রজাতির উভচর, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৯ প্রজাতির সরীসৃপ (৩৯ প্রজাতির সাপ, ১৮ প্রজাতির লিজার্ড ও দুই প্রজাতির কচ্ছপ) ২৪৬ প্রজাতির পাখিসহ অসংখ্য কীটপতঙ্গ রয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে এ উল্লুক বিলুপ্তির দ্বারপ্রাান্তে। উল্লুক ছাড়াও এখানে রয়েছে মুখপোড়া হনুমান, বানর, মেছোবিড়াল, বন্য কুকুর, ভালুক, মায়া হরিণ, বনছাগল, সোনালি কচ্ছপ, অজগরসহ নানা প্রজাতির জীবজন্তু। পাখির মধ্যে সবুজ ঘুঘু, বনমোরগ, মথুরা, তুর্কি বাজ, সাদা ভ্রু সাতভায়ালা, ঈগল, হরিয়াল, কালোমাথা টিয়া, কালো ফর্কটেইল. ধূসর সাতশৈলী, পেঁচা, ফিঙ্গে, লেজকাটা টিয়া, কালোবাজ, হীরামন, কালোমাথা বুলবুল, ধুমকল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সাধারণ দর্শনীয় পাখির মধ্যে টিয়া, ছোট হরিয়াল, সবুজ সুইচোরা, তোতা, ছোট ফিঙ্গে, সবুজ কোকিল, পাঙ্গা, কেশরাজ প্রভৃতির দেখা মেলে। আয়তনে ছোট হলেও এ বন দুর্লভ উদ্ভিদ এবং প্রাণীর এক জীবন্ত সংগ্রহশালা।