দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে একের পর এক নীতি ছাড় দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে নামমাত্র ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ করে হলেও এককালীন পরিশোধের মতো সুবিধা রয়েছে। তবে বিশেষ এসব নীতি ছাড়ও বড় ঋণখেলাপিদের আকৃষ্ট করতে পারছে না। বরং বড় ও মাঝারি আকারের ঋণখেলাপিদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছেই। তবে খেলাপিমুক্ত হচ্ছেন ছোট গ্রাহকরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের ব্যাংক খাতে গত বছরের জুন শেষে ঋণখেলাপির সংখ্যা ছিল ৪৪ লাখ ৮৬ হাজার ২৮৬। এক বছর পর চলতি বছরের জুনে এ সংখ্যা ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯১৪-তে নেমে এসেছে। সে হিসাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণগ্রহীতার সংখ্যা কমেছে ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭২ জন। তবে তাদের কেউই বড় গ্রাহক নয়। উল্টো এ সময়ে ১ কোটি টাকা বা তার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া গ্রাহকের সংখ্যা ৫৩০ জন বেড়েছে। বিপরীতে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন এমন গ্রাহকের সংখ্যা কমেছে ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯০২ জন। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঋণের আকারের ভিত্তিতে খেলাপি গ্রাহকের এ চিত্র তুলে ধরা হয়।
দেশের বড় উদ্যোক্তারা কীভাবে ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছেন, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত ঋণের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। যদিও ছোট ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার গড় এ হারের অর্ধেকেরও কম ছিল। ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার ছিল ১৫ শতাংশ। ১ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে খেলাপির হার ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল। ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ক্ষেত্রে ৪৪ দশমিক ৬ শতাংশই খেলাপির খাতায় উঠেছে। আর ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির এ হার ছিল ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে খেলাপির এ হার ছিল ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশের বেশি।
খেলাপির হারে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা ঋণ নেয়া গ্রাহকরা। এ শ্রেণীর গ্রাহকদের নেয়া ঋণের ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশই এখন খেলাপি বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেয়া গ্রাহকরাও এক্ষেত্রে খুব বেশি পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বড় ঋণগ্রহীতা হিসেবে পরিচিত তথা ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন এমন গ্রাহকদের ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ ব্যাংকগুলো আদায় করতে পারছে না। এ শ্রেণীর গ্রাহকরা ব্যাংকের আহ্বানে তেমন সাড়াও দিচ্ছেন না।
ব্যাংক নির্বাহীসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ ফেরত দেন। কিন্তু বড় উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার সংস্কৃতি তৈরি করেছেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের দেড় দশকে দেশের অর্ধেকের বেশি ব্যাংক থেকে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে ঋণের নামে অর্থ লোপাট করা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ব্যাংক লুটেরা হিসেবে স্বীকৃত অনেক ব্যবসায়ী দেশ থেকে পালিয়েছেন। আবার কেউ কেউ গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। এসব কারণে বড় ঋণ আদায়ের হার ক্রমেই কমছে। বিপরীতে ছোট উদ্যোক্তারা অর্থনীতির স্থবির পরিস্থিতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাড়তি সুদহার মোকাবেলা করেও ব্যাংক ঋণ ফেরত দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের প্রকৃত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা সবসময়ই ব্যাংকের ঋণ ফেরত দেন। এক্ষেত্রে সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তারাই এগিয়ে থাকেন। গত কয়েক বছর থেকে আমরা ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আসছি। এতদিন সেটি খুব বেশি কার্যকর না হলেও গত বছর থেকে এ খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে। আশা করছি, আগামী বছরগুলোয় দেশের সিএমএসএমই খাত অর্থনীতিতে আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।’
দেশের ব্যাংক ঋণের ৭০ শতাংশেরও বেশি বড় ও মাঝারি শিল্পে কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে এ খাতে বিতরণকৃত ঋণেরও প্রায় ৪০ শতাংশ এখন খেলাপি। চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিপুল এ খেলাপি ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশই সৃষ্টির পেছনে বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বেশি ভূমিকা রেখেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর ৬০ শতাংশই গেছে বৃহৎ শিল্পে। আর এ শিল্পের বিতরণকৃত ঋণের ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশই এখন খেলাপি।
মাঝারি শিল্পে গেছে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এসব ঋণেরও ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ এখন খেলাপির খাতায়। আর গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রাণ হিসেবে পরিচিত ছোট ও ক্ষুদ্র শিল্পে বিতরণ হয়েছে মোট ব্যাংক ঋণের মাত্র ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে গেছে ব্যাংক ঋণের মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ।
দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) সবচেয়ে বেশি ঋণ দেয় ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি। বেসরকারি এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ২ শতাংশেরও কম। এর মধ্যে আবার ছোট ঋণে খেলাপির হার ১ শতাংশের ঘরে বলে জানান ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তারেক রেফাত উল্লাহ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর ৫০ শতাংশই সিএমএসএমই খাতের। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ক্ষুদ্র ব্যবসায় দেয়া হয়েছে। এ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আমাদের আদায়ের হার সবচেয়ে ভালো। ছোট ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে যদি সঠিক ব্যক্তিকে বাছাই করা যায়, তাহলে কোনো ঋণই খেলাপি হওয়ার কথা নয়। আমরা দেখেছি, এ শ্রেণীর উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জন্য উদগ্রীব থাকেন।’
তবে ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ পৌঁছানো সহজ কাজ নয় বলে মন্তব্য করেন এ শীর্ষ নির্বাহী। তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে সফল হতে হলে দেশজুড়ে নেটওয়ার্ক ও সশরীরে উপস্থিতি প্রয়োজন। এ ব্যবসায় ঋণ তত্ত্বাবধান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকৃত টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা ঘনিষ্ঠভাবে দেখতে হয়। এসবের জন্য আমাদের প্রায় ১০ হাজার ২০০ স্থায়ী কর্মী আছে। এর বাইরে আরো সাড়ে তিন হাজারের বেশি ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে কাজ করেন। এ কর্মী বাহিনীর বড় অংশই এসএমই খাতে নিয়োজিত। এতে আয়-ব্যয় অনুপাত তুলনামূলক বেশি হলেও এটাই ব্র্যাক ব্যাংকের সাফল্যের মূল ভিত্তি। শুরুতে এ খাতে বিনিয়োগে অনেকে ভয় পেলেও সময়ের সঙ্গে দক্ষতা বাড়লে খরচ কমে আসবে। তখনই মডেলটা লাভজনক হবে।’