দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটে ডুবোচর

নদী পারাপারে ফেরির জ্বালানি খরচ বেড়েছে

দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-রুট রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া।

দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌ-রুট রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া। পানির গভীরতা কমে ডুবোচর জেগে ওঠায় সরাসরি ফেরি চলাচল বন্ধ। বড় ফেরিগুলো নির্দিষ্ট চ্যানেল ছেড়ে গোয়ালন্দ উপজেলার আংকের শেখেরপাড়া ঘুরে চলাচল করছে। মাত্র তিন কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিতে ঘুরতে হচ্ছে অতিরিক্ত ছয় কিলোমিটার। এতে অতিরিক্ত ২০ মিনিটের মতো সময় বেশি লাগছে, জ্বালানি খরচও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ঘাটসংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সূত্রে জানা গেছে, এ নৌ-রুট দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার কয়েক হাজার ছোট-বড় যানবাহন ও যাত্রী পারাপার হয়। বর্ষা মৌসুমে প্রচণ্ড স্রোতে সাড়ে তিন কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিতে ৩০-৩৫ মিনিট লাগে। এখন পানি কমে যাওয়ায় তারও কম সময় লাগার কথা থাকলেও লাগছে দ্বিগুণ সময়।

সরজমিন রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট ঘুরে দেখা যায়, দৌলতদিয়া পাঁচ নম্বর ফেরিঘাটের বিপরীতে মাঝ পদ্মায় ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটে বিপরীতে মাঝপদ্মায় বিআইডব্লিউটিএর দুটি ড্রেজার রেখে দেয়া হয়েছে। ড্রেজার দুটি বন্ধ। ড্রেজার দিয়ে বালি অপসারণ করতে দেখা যায়নি। ডুবোচরের ফলে ফেরি ভাটি দিয়ে চলাচল করার কারণে একদিকে যাত্রীদের সময় অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে ফেরির জ্বালানি তেলও বেশি খরচ হচ্ছে।

ঢাকা থেকে আসা রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির যাত্রী শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘ফেরিতে বসে থাকা অস্বস্তিকর বিষয়। আগে এ নৌ-রুট পাড়ি দিতে সময় লাগত আধা ঘণ্টা। এখন ১ ঘণ্টায়ও পার হতে পারছি না। বিষয়টা দুঃখজনক।’

ফরিদপুরের যাত্রী আবুল বাশার মিয়া বলেন, ‘নৌপথের যাত্রীদের কথা কেউ ভাবে না। ফরিদপুরের মানুষ পদ্মা সেতু দিয়েই ঢাকায় যাওয়া-আসা করে। সাভারে কাজ ছিল তাই দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট দিয়ে এসেছি। এসে মনে হয় বিপদে পড়েছি। ঘাটটির দিকে কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া উচিত।’

ফেরি খানজাহান আলীর মাস্টার (চালক) শাহিন ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফেরি চলাচল করতে পানির পভীরতা ১৫ ফুট থাকতে হয়। পদ্মা নদীর মাঝে অসংখ্য ডুবোচরের কারণে ফেরি চলাচল করতে পারে না। এ কারণে অনেক পথ ঘুরে যেতে হয়। ফলে আগে ৩০ মিনিট সময় লাগলেও এখন ৪৫ মিনিটে আমদের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ৪৫ মিনিটে যেতে বলা হলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ নদীর মাঝে দুর্ঘটনাকবলিত স্থান চিহ্নিত করে বাতি দেয়া হয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে ধীরে ফেরি চালাতে হচ্ছে।’

বিআইডব্লিউটিসি আরিচা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নদীতে পানি কমে বিভিন্ন পয়েন্টে নাব্য সংকট দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন নদীপথ ড্রেজিং না করায় ডুবোচরের সংখ্যাও বেড়েছে বলে মনে করেন ফেরি চালকরা।

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ব্যবসায়ী চাঁন্দু মোল্লা বলেন, ‘প্রায় দুই মাস ড্রেজার মেশিন ফেলে রাখতে দেখছি। কিন্তু কখনো ড্রেজিং করতে দেখি না। যে ড্রেজার দুটি এনে রাখা হয়েছে সে দুটি নিয়ম মেনে চালালে এক সপ্তাহে পুরো নদী খনন করা যায়। কেউ নজরদারি করছে না। দ্রুত ঢাকায় পণ্য পাঠাতেও বেগ পেতে হচ্ছে।’

এদিকে দৌলতদিয়ার সাত নম্বর ফেরিঘাটের পাশে আটকে  থাকতে দেখা যায় বড় আকৃতির দুটি জাহাজ। জাহাজ থেকে পাথর ও সার অন্য দুটি জাহাজে নামানো হচ্ছে।

জাহাজ এমভি মানিকের চালক বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘পদ্মা নদীতে জাহাজগুলো চলতে ২০ ফুট গভীরতা প্রয়োজন। এখানে এসে জাহাজ আটকে যাওয়ায় অন্য ছোট জাহাজে করে মালামাল সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী ঘাটে নেয়া হচ্ছে। এখানে এক সপ্তাহ বসে থাকতে হয়েছে। অন্তত ৪০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ পড়েছে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিসির বেশ কয়েকটি শাখা আছে। আমরা শুধু পানির ওপরের অংশ দেখি। ঘাটের পন্টুন মেরামত, ঘাট ঠিক রাখা আমাদের কাজ। ডুবোচর, নাব্য সংকট এগুলো ড্রেজিং বিভাগ দেখে।’

বিআইডব্লিউটিএ আরিচা সেক্টরের সহকারী প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মাসুদ রানা বলেন, ‘পদ্মা নদীর পানি কমে যাওয়ায় ২ নভেম্বর থেকে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটে ড্রেজিং কাজ চলমান। এতে বিআইডব্লিউটিএর দুটি নিজস্ব ড্রেজার মেশিন কাজ করছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে খনন কাজ শেষ হবে।’

গত এক মাসে কত ঘনফুট বালি কাটা হয়েছে, খননকাজে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, আরো কত ঘনফুট বালি অপসারণ করা হবে, ড্রেজার মেশিন থাকলেও খননকাজ বন্ধ কেন—এসব প্রশ্ন জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি তিনি।

এ প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে ফেরি চালাতে তেমন বেগ পেতে হয় না। তবে এখন বেগ পেতে হচ্ছে। সময় লাগছে বেশি। এক মাস ধরে এ সমস্যা হচ্ছে। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুটে ১৮টি ফেরি থাকায় ঘাটে যানজট কমে গেছে। তাছাড়া বেশির ভাগ ব্যক্তিগত গাড়ি পদ্মা সেতু দিয়েই ঢাকায় যাচ্ছে।’

আরও