এতে কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তারাও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ছয় মাসে এ বন্দরে ১৩০টি জালিয়াতি ও চুরির মামলা হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের নাম ব্যবহার করে কাস্টমসের গুদাম থেকে পণ্য পাচারের ঘটনা ঘটেছে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা পণ্য নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন। ফলে গতি হারাচ্ছে দেশের বৃহত্তম এ স্থলবন্দরের আমদানি ও রফতানি বাণিজ্য।
বেনাপোল কাস্টম হাউজের নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত ছয় মাসে বেনাপোল বন্দরে ১৩০টি পণ্য চুরি ও জালিয়াতির মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বেনাপোল বন্দর থানায় পাঁচটি ফৌজদারি মামলা ও কাস্টমস আইনে অভ্যন্তরীণ ১২৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। জালিয়াতি ও চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টের লাইসেন্স বাতিল করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
বেনাপোল বন্দর থানায় দায়ের করা পাঁচটি ফৌজদারি মামলার এজাহার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব চুরি ও পণ্য পাচারের সঙ্গে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টম হাউজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ জড়িত রয়েছে। দুটি মামলায় কাস্টমসের পাঁচজন কর্মকর্তা কারাগারে আটক আছেন। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ মেলায় দুজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিনজন সিপাহিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। কাস্টমসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিন্ডিকেটের বাকি সদস্যদের শনাক্ত করতে বিভাগীয় তদন্ত জোরদার করা হয়েছে।
জানা গেছে, বেনাপোল স্থল বন্দরে কাস্টমসের একটি মাত্র গুদাম রয়েছে, যা সরাসরি কাস্টমস হাউজের নিয়ন্ত্রণে থাকে। বন্দর থেকে মালিকবিহীন যত পণ্য জব্দ করা হয়, নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো এ গুদামেই রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে সুবিধাজনক সময়ে এসব উপযোগী পণ্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানো হয়। কিন্তু এ সরকারি প্রক্রিয়াকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে একটি দুর্নীতিবাজ চক্র।
গত ২২ জুন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর নামে বন্দরের কাস্টমস গুদাম থেকে কাভার্ড ভ্যানে করে বিপুল পরিমাণ পণ্য বের করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাভার্ড ভ্যানটি চ্যালেঞ্জ করে বেনাপোল বাজার মোড় থেকে জব্দ করে যশোর ব্যাটালিয়ন (৪৯ বিজিবি)। এ সময় বিজিবির কাছে পণ্য পরিবহনের কোনো বৈধ বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় কাস্টম হাউজের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎসহ গাড়ির চালক ও সহকারীকে আটক করা হয়। কাভার্ড ভ্যানটি থেকে উচ্চ শুল্কের ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস ও আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ জব্দ করা হয়। এ ঘটনা বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
তদন্তে দেখা গেছে, চোর চক্র অভিনব কৌশল ব্যবহার করছে। বেকিং পাউডার আমদানির ঘোষণা দিয়ে আনা দামি শাড়ি ও প্রসাধনী কাস্টমস গুদাম থেকে গায়েব করা হয়েছে। আবার কখনো বন্দরে ঢোকার মুখেই ভারতীয় ট্রাক থেকে বাংলাদেশী ট্রাকে পণ্য সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। গত ২৫ জুন এমন এক চুরিতে ২ হাজার ৭৮৪ কেজি পণ্য গায়েব হয়, যেখানে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দায়িত্বরত আনসার ও নিরাপত্তারক্ষীরা নিষ্ক্রিয় ছিলেন। বন্দরের ৩৭ ও ৪১ নম্বর গুদাম থেকে পণ্য চুরির ঘটনায় বেশ কয়েক জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
বেনাপোল কাস্টম হাউজের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, ‘চলমান প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাস্টমসের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত, তাদের শনাক্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ফৌজদারি মামলাও হবে।’ বন্দরের গুদাম থেকে পণ্য চুরির সঙ্গে ওয়্যারহাউজ সুপারিনটেনডেন্টরাও জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ফাইজুর রহমান বলেন, ‘বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ চেয়েও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাওয়া যাচ্ছে না।’
সিসিটিভি ফুটেজ সরবরাহের বিষয়ে বেনাপোল বন্দরের পরিচালক মো. শামীম হোসেন বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেয়ার জন্য আমরা আগ্রহী। কিন্তু বন্দরে ৪১৮টি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। এটা অপারেট করে থার্ড পার্টি (তৃতীয় পক্ষ)। এটা টেকনিক্যাল বিষয়। তাছাড়া নির্দিষ্ট করে সময় জানাতে হয়। এসব কারণে অনেক সময় ফুটেজ পেতে দেরি হয়। তবে চুরি ঠেকাতে বন্দর ও কাস্টমস এখন সমন্বয় করে কাজ করছে। আমাদের দপ্তরের কর্মকর্তা হলেও আমরা কাউকে প্রশ্রয় দিচ্ছি না।’
বেনাপোল বন্দর ব্যবহারকারী সারথি লজিস্টিকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিয়ার রহমান বলেন,"‘রাজস্ব ফাঁকি ও চুরির কারণে বন্দরের ব্যবসায়িক শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। বৈধ আমদানিকারকরা পণ্য রেখে নিরাপত্তা পাচ্ছেন না।