বরিশাল বিভাগে খাদ্যসহায়তা পাননি ৮৩ শতাংশ জেলে

প্রজনন মৌসুম নির্বিঘ্ন করতে ১২ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত সাগর ও নদীতে ইলিশ মাছ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার।

প্রজনন মৌসুম নির্বিঘ্ন করতে ১২ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত সাগর ও নদীতে ইলিশ মাছ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। এ সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্যসহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হয়। সহায়তার এ চাল ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই বিতরণ করার কথা। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শুরু হলেও বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় গতকাল (১৫ অক্টোবর) পর্যন্ত চাল পেয়েছেন মাত্র ২০ শতাংশ জেলে। বাকি ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ এখনো পাননি সরকারি এ সহায়তা। তবে সব জেলায় কম-বেশি জেলেরা চাল পেলেও বরগুনায় গতকাল পর্যন্ত এক কেজি চালও বিতরণ করা হয়নি।

বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের ছয় জেলার ৪১টি উপজেলায় ৩ লাখ ২২ হাজার ৮৪১ জেলের মাঝে ৭ হাজার ৬৯৬ দশমিক শূন্য ৩ টন চাল বিতরণ করার কথা। গতকাল পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩২৩ দশমিক শূন্য ৯৫ টন। এর মধ্যে চাল পেয়েছেন মাত্র ৫২ হাজার ৯২৩ জেলে। এখনো পাননি ২ লাখ ১৮ হাজার ৯০৩ জেলে। এর মধ্যে ভোলা জেলার সাত উপজেলার ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৯৯ জেলের মধ্যে ৩ হাজার ৩৪৭ দশমিক ৪৭৫ টন চাল বিতরণের কথা। সেখানে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৭৩০ দশমিক ৩৩০ টন। এখনো চাল পাননি ৭৮ দশমিক ১৮ শতাংশ জেলে। পটুয়াখালী জেলার আট উপজেলায় ৬৪ হাজার ৭৭১ জেলের মধ্যে ১ হাজার ৬১৯ দশমিক ২৭৫ টন চাল বিতরণ করার কথা। বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ২৯৪ দশমিক ২৫০ টন। চাল পাননি ৮১ দশমিক ৮২ শতাংশ জেলে। বরিশাল জেলার নয় উপজেলার ৫১ হাজার ৭০০ জেলের মধ্যে ১ হাজার ২৯২ দশমিক ৫০০ টন চাল বিতরণের কথা। সেখানে বিতরণ করা হয়েছে ২০৩ দশমিক ৮৯০ টন। এখনো চাল পাননি ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ জেলে।

এছাড়া পিরোজপুর জেলার সাত উপজেলায় ১৭ হাজার ৭০০ জেলের মধ্যে ৪৪২ দশমিক ৫০০ টন চাল বিতরণ করার কথা। বিতরণ করা হয়েছে ৩৪ দশমিক ২৪৫ টন। পাননি ৯২ দশমিক ২৬ শতাংশ জেলে। বরগুনা জেলার ছয় উপজেলায় ৩৬ হাজার ১৪ জেলের মধ্যে ৯০০ দশমিক ৩৫ টন চাল বিতরণের কথা। তবে সেখানে গতকাল পর্যন্ত এক কেজি চালও বিতরণ করা হয়নি। ঝালকাঠি জেলার চার উপজেলায় ৩ হাজার ৭৫৭ জেলের মধ্যে ৯৩ দশমিক ৯৩০ চাল বিতরণের কথা। বিতরণ করা হয়েছে ৬০ দশমিক ৩৮০ টন। এখনো চাল পাননি ৩৫ দশমিক ৭১ শতাংশ জেলে।

এ প্রসঙ্গে বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক নৃপেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খাদ্যসহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করা একটি শ্রেণীর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এটি প্রক্রিয়াধীন। নিরীহ জেলেদের জীবিকার কথা চিন্তা করেই দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই জেলেদের ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হবে। তবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যারা মাছ ধরতে নদীতে নামছেন, তারা অভিযানে ধরা পড়বেন। এবার কোনো প্রকার ছাড় দেয়া হচ্ছে না। আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে।’

এদিকে সঠিক সময়ে খাদ্যসহায়তা না পেয়ে পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বঞ্চিত জেলেরা। রয়েছে মহাজনের দাদন পরিশোধের চিন্তাও। বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার আলীমবাদ ইউনিয়নের জেলে রহিম উদ্দিনের পরিবারে সদস্য ছয়জন। গত কয়েক মাস নদীতে জাল ফেলে ইলিশ পাননি। প্রায় প্রতিদিনই তাকে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছে। এখন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় নদীতেই নামতে পারছেন না তিনি। সহায়তার চাল না পেয়ে পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি।

যদিও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উপজেলায় ১৮ হাজার ৮৭০ জেলে ২৫ কেজি করে চাল পাবেন। চলতি সপ্তাহের মধ্যে চাল দেয়া শেষ করতে হবে। জেলেদের তালিকা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় থেকে করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটি তত্ত্বাবধান করেন।’

অন্যদিকে বরিশালের নদ-নদীতে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিনই মৌসুমি জেলেরা মাছ শিকারে নামছেন। তবে মৎস্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মাঠ কর্মকর্তারা নদীতে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রাখায় ধরা পড়ছেন অনেকেই। বিগত বছরগুলোয় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ নিধন করায় এ বছর অভ্যন্তরীণ নদ-নদীর ৩২টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর নজরদারি করছে মৎস্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলাসংলগ্ন মেঘনার সাতটি পয়েন্ট অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিগত কয়েক বছর এ পয়েন্টগুলোয় নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বাধা দিতে গেলে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জেলেদের হামলার মুখেও পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গুলিও ছুড়তে হয়েছে।

এ বিষয়ে বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিমল চন্দ্র দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছর প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে মৌসুমি জেলেরা নদীতে জাল ফেলে পার পাচ্ছেন না। এভাবে চললে এ বছর প্রচুর মা-ইলিশ মিঠাপানিতে ডিম ছাড়বে। নিষেধাজ্ঞার এ সময়টুকু জেলেরা মাছ শিকার না করলে, সুফলও ভোগ করবেন জেলেরা। অসচ্ছল জেলেদের চাল বিতরণ কার্যক্রম উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা তদারকি করছেন। পর্যায়ক্রমে সব জেলেই চাল পেয়ে যাবেন।’

আরও