বৈশ্বিক পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয় স্থান হারাতে পারে বাংলাদেশ

বিদায়ী অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক রফতানি কমেছে প্রায় ২ শতাংশ

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। দেশের মোট রফতানি অর্থমূল্যের প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ওই বছর বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ছিল প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের রফতানি ছিল ৩৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এরপর থেকে রফতানির এ চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।

সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল অ্যাসোসিয়েশনের (ভিআইটিএএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পোশাক ও টেক্সটাইল রফতানি এরই মধ্যে ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং চলতি বছরে ৪৭ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে দেশটির। একই সময়ে ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানও বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। ফলে বৈশ্বিক পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

শুধু বৈশ্বিক রফতানি নয়, বাংলাদেশের প্রধান দুই বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পোশাক আমদানি পরিসংখ্যানও উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে তুরস্ক, ভারত, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের রফতানিও কমেছে। তবে ভিয়েতনামের পতন হয়েছে মাত্র দশমিক ৭ শতাংশ।

ওটিইএক্সএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি কমেছে ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে ভিয়েতনামের রফতানি বেড়েছে ১ দশমিক ৩১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ২ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ১৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। অর্থাৎ বৈশ্বিক চাহিদা কমলেও প্রতিযোগী কয়েকটি দেশ বাজার ধরে রাখতে বা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

দেশের ভেতরেও একই সময়ে তৈরি পোশাক শিল্প খাতের পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে। ঈদুল আজহার ছুটি শেষে সাভার-আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ঘটনা বেড়েছে। প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান থাকা আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানা থেকে ১ হাজার ৮৬৮ শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ছয়টি শিল্পাঞ্চলের ৭৯টি কারখানায় ছাঁটাই হয়েছেন ৭ হাজার ৭৮৪ শ্রমিক। শিল্পসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাতটি শিল্পাঞ্চলে ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। সর্বশেষ বন্ধ হয়েছে ইসলাম গার্মেন্টস (ইউনিট-২)। এসব ঘটনার প্রভাব পড়েছে উৎপাদন ও রফতানিতেও।

গতকাল প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষ হয়েছে রফতানি কমে যাওয়ার ধারাতে। ১২ মাসে প্রবৃদ্ধি হয়েছে নেতিবাচক বা ঋণাত্মক দশমিক ৫৮ শতাংশ। মোট পণ্য রফতানি হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রফতানিতে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থাকলেও শেষ পর্যন্ত ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসই ছিল নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির। অর্থাৎ অর্থবছরের মোট নয় মাসে রফতানি কমার চিত্র দেখা গেছে। জুনে ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও রফতানিকারকরা বলছেন, সেটি মূলত আগের বছরের নিম্ন ভিত্তির প্রভাব।

রফতানির এ নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির ধারায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রফতানি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। এর মধ্যে নিট পোশাক রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক কমেছে দশমিক ৬১ শতাংশ। যদিও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রকৌশল পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্যে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তবে পোশাক খাতের পতন দেশের সামগ্রিক রফতানিকে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে ঠেলে দিয়েছে।

সামগ্রিক পণ্য রফতানি বাজারের চিত্রও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার জার্মানিতে রফতানি কমেছে ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। ইউরোপের অন্যতম বড় বাজার স্পেনে প্রবৃদ্ধি থাকলেও সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় বাজারে চাপ স্পষ্ট।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে ইয়াংওয়ান করপোরেশন, হা-মীম গ্রুপ, মন্ডল গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, অনন্ত গ্রুপ, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ এবং মাইক্রো ফাইবার গ্রুপ। দেশের মোট রফতানির বড় অংশই এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে তাদের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ক্রয়াদেশের পরিস্থিতি পুরো রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।

হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত অর্থবছর রফতানির গতি ছিল শ্লথ। ভবিষ্যতে অবস্থা কী হবে, তা নির্ভর করছে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।’

দেশের শীর্ষ রফতানিকারক উদ্যোক্তাদের মতে, গত অর্থবছর টিকে থাকাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের হিসাবে পোশাক খাতে প্রকৃতপক্ষে ১০ থেকে ১২ শতাংশের মতো নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির চাপ ছিল। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো পুরনো ক্রেতাদের ধরে রাখতে পারলেও নতুন ক্রয়াদেশ প্রত্যাশামতো বাড়েনি। আগামী বছর বড় ব্র্যান্ডগুলোর অর্ডার নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এমএ রহিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন অর্থবছর কেমন যাবে, তা এখনই বলা কঠিন। ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, ইউরোপের দুর্বল অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। জার্মানি ও ইউরোপের বাজার ভালো না থাকলে পোশাকের চাহিদাও বাড়বে না। ডিবিএল ভালো করলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি খুব আশাব্যঞ্জক নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখাটা বেশ সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। ভিয়েতনামের রফতানি আয় আমাদের চেয়ে বেশি এবং সেখানে আমাদের মতো এত বেশি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নেই। চীন থেকে সরে আসা অর্ডারের বড় অংশ বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম ভাগ করে নিলেও দ্বিতীয় অবস্থানে টিকে থাকাটা এখন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আরিফ অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘আমরা বৈশ্বিক ও জাতীয় দুই দিক থেকেই একটি কঠিন সময় সফলভাবে মোকাবেলা করেছি। গত দুই-তিন মাসে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জুনে আমরা ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি। আগামী বছর রফতানিকারকদের জন্য আরো ভালো হবে।’

এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) ও বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, জুনের উচ্চ প্রবৃদ্ধি বিভ্রান্তিকর। তিনি বলেন, ‘গত বছরের জুনে কোরবানির ঈদের কারণে কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। তাই এবার প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে রফতানি আদেশ বাড়েনি। আমাদের পরিস্থিতির কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। আগামী কয়েক মাসে রফতানি খুব বেশি বাড়বে বলে মনে হচ্ছে না।’

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখার চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্য সংযোজন। আমরা যদি দ্বিতীয় অবস্থানে থেকেও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে না পারি কিংবা মূল্য সংযোজন বাড়াতে না পারি, তাহলে সেই অবস্থানের তেমন অর্থ থাকে না।’

মাহমুদ হাসান খান আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন শুল্কনীতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনের রফতানি বৃদ্ধি, ভিয়েতনামের মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুবিধা, ভারত-ইইউ সম্ভাব্য এফটিএ, পণ্যের দরপতন এবং দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জ্বালানি, অর্থায়ন, লজিস্টিকস ও নীতিগত সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার বিকল্প নেই।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয় অবস্থান শক্তভাবে ধরে রাখলেও এখন আর সেই অবস্থান নিশ্চিত নয়। উৎপাদন সক্ষমতা, বাজার বৈচিত্র্য, মূল্য সংযোজন এবং বিনিয়োগ পরিবেশে দ্রুত উন্নতি না হলে বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরো কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।

আরও