ডেইরি ফার্মে বছরে কোটি টাকা আয় মেহেরুননেসার

গরুর খামার গড়ে তাক লাগিয়েছে দিয়েছেন মৌলভীবাজারের এক গৃহবধূ। নয় বছর আগে মাত্র ১২টি গরু দিয়ে শুরু করেছিলেন ছোট্ট একটি খামার।

গরুর খামার গড়ে তাক লাগিয়েছে দিয়েছেন মৌলভীবাজারের এক গৃহবধূ। নয় বছর আগে মাত্র ১২টি গরু দিয়ে শুরু করেছিলেন ছোট্ট একটি খামার। সেটি এখন রূপ নিয়েছে বিশাল ফার্মে। গরু, কবুতর, বায়োগ্যাস প্লান্ট, মাছ ও ফল চাষের সমন্বয়ে গৃহবধূ মেহেরুননেছা বেগমের গড়া আরএম ডেইরি ফার্ম অ্যান্ড অ্যাগ্রো ফিশারিজে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেক মানুষের। তার সাফল্য দেখে দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের। এ বছর জাতীয়ভাবে ডেইরি আইকন পুরস্কার লাভ করেছেন এ উদ্যোক্তা।

সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার জালালপুর গ্রামে আরএম ডেইরি ফার্মে গিয়ে এ উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, গল্পটা প্রায় বছর নয় আগের। তার স্বামী হানিফুর রহমান সিলেট সিটি করপোরেশনে চাকরি করেন। ২০১৪ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল ইসলাম চৌধুরী বিভিন্ন জাতের ১২টি গরু বাছুর তাদের উপহার দেন এবং গরুর খামার গড়ে তুলতে উৎসাহ দেন। বসতবাড়ির পাশে একটি ঘরে সেই ১২টি গরু নিয়ে যাত্রা শুরু। প্রথম যাত্রার ১২টি গরু থেকে লাভ হওয়ায় আরো গরু বাড়ানোর উদ্যোগ নেন তিনি। স্থানীয় একটি ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ১৯টি ফিজিয়ান গাভী ক্রয় করেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি এ খামারিকে। ১৯টি গাভী ক্রয়ের পর বাড়তে থাকে গরুর সংখ্যা। জায়গা সংকুলান করতে না পারায় উন্নতমানের চারটি শেড নির্মাণ করেছেন। বর্তমানে দেশী-বিদেশী দেড় শতাধিক গরু রয়েছে খামারে। ফিজিয়ান, শাহীওয়াল এবং ক্রস জাতের পাশাপাশি রয়েছে কিছু দেশী জাতের গরু। এর মধ্যে ৭০টি গাভী রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ লিটার দুধ বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে প্রতি লিটার দুধ ৯০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

মেহেরুননেসা বেগম বলেন, ‘স্বামীর চাকরির পাশাপাশি নিজেকে স্বাবলম্বী করার জন্য এ উদ্যোগ নিই। নারী বলে পেছনে থাকার দিন শেষ। চেষ্টা করলেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমি সফল হয়েছি। তবে এ কৃতিত্ব আমার একার নয়, স্বামী ও পরিবারের সবার সহযোগিতায় সম্ভব হয়েছে এমন সাফল্য। স্বামী-ভাশুরসহ পরিবারের সবাই পাশে আছেন, তারাও শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।’

তার এ স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছেন তার শাশুড়িকেও। খামারের নামের সঙ্গে যুক্ত করেছেন শাশুড়ি মরিয়ম বেগমের নাম। রহমান মরিয়ম (আরএম) ডেইরি ফার্ম অ্যান্ড অ্যাগ্রো ফিশারিজ। বর্তমানে ফার্মে ২৫ জন কর্মচারী কাজ করছেন। আরো বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে চান এ উদ্যোক্তা।

উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন মেহেরুননেসা বেগমের স্বামী হানিফুর রহমান। তিনি সব ধরনের সহায়তা করে যাচ্ছেন। তিনি জানান, এখন প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনের পরিধি বেড়েছে। পাঁচ একর জায়গার এ ফার্মে গরু পালনের সঙ্গে রয়েছে কবুতর পালন, একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট, পুকুরে মাছ চাষ, ড্রাগনসহ বিভিন্ন ফলের বাগান। বর্তমানে আড়াই থেকে তিন বছরের ৩০টি ষাঁড় রয়েছে। এসব ষাঁড়ের দাম সর্বনিম্ন ৩ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা। গরুর গোবর দিয়ে পরিচালিত বায়োগ্যাস প্লান্টটি গ্যাস ও সার উৎপাদন করছে। বর্তমানে ফার্মে ও আশপাশের ২৫টি পরিবারকে বাণিজ্যিকভাবে বায়োগ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ১ হাজার ২৫০ টাকার বিনিময়ে খামারের আশপাশের বসতবাড়িতে চুলায় জ্বলে বায়োগ্যাস। পাশাপাশি নিজেদের এবং খামারের কর্মচারীদের রান্নায় ব্যবহার হচ্ছে বায়োগ্যাস। আর উৎপাদিত সার নিজেদের ঘাসের জমি ও ফসল উৎপাদনের কাজে ব্যবহার হচ্ছে। তিনটি পুকুরে মাছ চাষ করা হচ্ছে। বছরে ৩-৫ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়। পুকুরপাড়ে পরীক্ষামূলকভাবে ড্রাগন ফলের চাষ করে আশাতীত ফলন মিলেছে। বাগানে ২৪০টি গাছ থেকে গত বছর প্রায় ৩ লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করা হয়। এ বছর আরো বেশি ফল এসেছে গাছে। ৫ লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা তাদের। তাদের হিসাবে প্রতিষ্ঠানের সব দিক থেকে প্রাপ্ত আয় বছরে প্রায় কোটি টাকা। কর্মচারীদের বেতনসহ সব খরচ বাদে বছরে ৩০-৪০ লাখ টাকা মুনাফা সম্ভব হচ্ছে।

হানিফুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এ উদ্যোগ এখন অনুকরণীয়। দূর থেকে অনেকে প্রতিষ্ঠানটি দেখতে আসেন। এসব কাজে আগ্রহী হচ্ছেন অনেকে। লোকবল নিয়োগে স্থানীয় বেকার যুবকদের প্রাধান্য দেয়া হয়। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটি আরো প্রসারিত করে শতাধিক লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারব বলে আশা করছি।’

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুস ছামাদ বলেন, ‘এ প্রতিষ্ঠান শুধু মৌলভীবাজারের নয়, পুরো দেশের মধ্যে অনুকরণীয়। প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে তাদের সব ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে। তাদের দেখে নতুন নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছে।’

আরও