নারায়ণগঞ্জ শহরের আল-আমিন নগর এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে পণ্যবাহী কার্গো জাহাজের ধাক্কায় এমএল আফসার উদ্দিন নামে একটি যাত্রীবাহী লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই শিশু ও তিন নারীসহ ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নৌ পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় এখনো ১০-১৫ জন নিখোঁজ রয়েছে। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস, নৌ পুলিশ ও বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধার কার্যক্রম চালায়। ধাক্কা দেয়া কার্গো জাহাজসহ নয়জনকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ জানায়, এমএল আফসার উদ্দিন নামে যাত্রীবাহী লঞ্চটি গতকাল বেলা আড়াইটায় নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল থেকে অর্ধশত যাত্রী নিয়ে মুন্সীগঞ্জ রওনা হয়। কিছুক্ষণ পর লঞ্চটি সৈয়দপুরের আল-আমিন নগর এলাকায় পৌঁছলে রূপগঞ্জ থেকে আসা পণ্যবাহী কার্গো জাহাজ এমভি রূপসী-৯ যাত্রীবাহী লঞ্চটিকে পেছন দিক থেকে ধাক্কা দেয়। কার্গো জাহাজটি প্রায় ৩ মিনিট ধরে লঞ্চটিকে ধাক্কা দিতে থাকে। এতে লঞ্চটি পানিতে তলিয়ে যায়। স্থানীয়রা জানান, ১০-১২ জন যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও বেশকিছু যাত্রী নিখোঁজ হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। লঞ্চডুবির খবর ছড়িয়ে পড়লে নিখোঁজের স্বজনরা নদীতীরে ছুটে আসেন। কেউ কেউ নৌকা নিয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চটির স্থানে স্বজনদের সন্ধান করেন।
নারায়ণগঞ্জ নৌ পুলিশের ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, লঞ্চডুবির ঘটনায় সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন নারী, দুজন শিশু ও একজন পুরুষ। তিনি আরো জানান, লঞ্চডুবির ঘটনায় দায়ী কার্গো জাহাজটি পুলিশ আটক করেছে। পরে জাহাজের চালকসহ নয়জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌ পুলিশের নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদা।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফীন বলেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চটি উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ পুলিশ উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে।
মাওয়া থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় ডুবে যাওয়া লঞ্চ উদ্ধারে কাজ শুরু করেছে। এছাড়া নিহত একজনের পরিচয় জানা গেছে। তিনি হলেন মুন্সীগঞ্জের ইসলামপুরের বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন (৫৫)। তার পিতার নাম মৃত জুলফিকার আলী। তার স্বজন জহিরুল ইসলাম মুন্সি বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নিহত জয়নাল বালি ড্রেজিংয়ের ব্যবসা করতেন। ব্যবসার কাজেই তিনি নারায়ণগঞ্জ গিয়েছিলেন।
নিখোঁজের স্বজনদের আহাজারি
শীতলক্ষ্যায় চর সৈয়দপুর এলাকায় কার্গো জাহাজের ধাক্কায় এমএল আফসার উদ্দিন নামে একটি যাত্রীবাহী লঞ্চডুবির পর প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন লঞ্চের যাত্রীরা। কেউ কেউ সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন। নৌ পুলিশ বলছে, এখনো ১০-১৫ জন যাত্রী নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজের স্বজনরা নদীর তীরে গিয়ে আহাজারি করছে। তারা দ্রুত নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান চান।
কারণ অনুসন্ধানে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি
যাত্রীবাহী লঞ্চডুবির ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মঞ্জুরুল হাফিজ জানান, সৈয়দপুরের আল-আমিন নগর এলাকায় লঞ্চডুবির ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম বেপারীকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে নৌ পুলিশের একজন, ফায়ার সার্ভিসের একজন, বিআইডব্লিউটিএর একজন, জেলা পুলিশের একজন ও উপজেলা প্রশাসনের একজন সদস্য রয়েছেন।
এদিকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় লঞ্চডুবির ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনের জন্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বজলুর রশিদকে আহ্বায়ক করে আরো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিনদিনের মধ্যে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে। এ তদন্ত কমিটির বিষয়টি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘটনাস্থল পরিদর্শন
কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক ও মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস গতকাল সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের যে স্থানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সে স্থানটি এ মৌসুমে অত্যন্ত সরু হয়ে যায়। দুইপাশে প্রভাবশালীদের অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা শিল্প-কারখানার লাইটার জাহাজের কারণে নদীতে চলাচলের জায়গা কমে যায়। তিনি মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জের নৌপথকে নির্বিঘ্ন করতে ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে দাবি জানান।
এর আগে গত বছরের ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় শীতলক্ষ্যার সৈয়দপুরে এমভি সাবিত আল হাসান নামে একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ডুবে যায়। এতে ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটে।