জনবল সংকটে ধুঁকছে কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর

ঊনিশ শতকে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতায় এক অনন্য নাম কাঙাল হরিনাথ মজুমদার।

তিনি শুধু কবি বা সংগীতজ্ঞই নন, ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, সম্পাদক, ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, শিক্ষক ও সমাজ সংস্কারক। তাকে সহজেই চেনা হয় গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল পূর্ব বাংলার প্রথম সংবাদপত্র ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’, যা সাধারণ কৃষক-প্রজাদের দুঃখ-দুর্দশা, জমিদারদের শোষণ ও সামাজিক অসংগতি নিয়ে নির্ভীকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করত।

তার জীবন ও কর্মকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌর ভবনের পাশে গড়ে তোলা হয় ‘কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর’। তবে জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা ও সীমিত প্রচারণায় দর্শনার্থীদের প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি।

২০২৩ সালে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে হরিনাথের বাস্তুভিটার পাশেই জাদুঘরটির যাত্রা শুরু হয়। প্রায় ২৮ শতক জমির ওপর নির্মিত দৃষ্টিনন্দন দ্বিতল ভবনটির নিচ তলায় রয়েছে সম্মেলন কক্ষ, মিলনায়তন, পাঠাগার ও অফিস কক্ষ। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে জাদুঘরের মূল গ্যালারি, যেখানে সংরক্ষিত আছে ঐতিহাসিক মুদ্রণযন্ত্র, কাঙালের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র, পাণ্ডুলিপি, প্রেসের যন্ত্রাংশ, কবিতা, পত্রিকার প্রচ্ছদ, কাঠের ব্লক, পাথর এবং সেই সময়ের বিশিষ্ট মনীষীদের ছবি। এখানে প্রবেশ করলেই যেন ভেসে ওঠে উনিশ শতকের বাংলার সমাজ বাস্তবতা ও কাঙাল হরিনাথের নির্ভীক সাংবাদিকতার চিত্র। নতুন প্রজন্মের জন্য এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস পাঠের স্থান।

স্থানীয়রা বলছেন, কাঙাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরের সবচেয়ে বড় সমস্যাই হলো জনবল সংকট। দৃষ্টিনন্দন ভবন, মূল্যবান সংগ্রহ ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও জাদুঘরটিতে বর্তমানে নয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপরীতে তিনজনকে দিয়ে সবকিছু চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে প্রশাসনিক কাজ থেকে শুরু করে দর্শনার্থীদের গাইড করা, প্রদর্শনী রক্ষণাবেক্ষণ, লাইব্রেরি পরিচালনা, গবেষণা কার্যক্রম সহায়তা সব দায়িত্ব ভাগ হয়ে যায় এ সীমিত সংখ্যক লোকের ওপর। জাদুঘরের লাইব্রেরিতে প্রায় ৭০০ বই থাকলেও একজন লাইব্রেরিয়ান না থাকায় সেটি চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে গবেষক, শিক্ষার্থী ও পাঠকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। দর্শনার্থীদের জন্য প্রশিক্ষিত গাইড নেই। যারা দায়িত্বে আছেন, তারা অন্য কাজের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সহায়তা করেন। এতে দর্শনার্থীরা কাঙাল হরিনাথ ও তার সময়কাল সম্পর্কে সম্যক ধারণা পান না।

এছাড়া ঐতিহাসিক নথি, পাণ্ডুলিপি ও পুরনো মুদ্রণযন্ত্র সংরক্ষণের জন্য বিশেষজ্ঞ কর্মী প্রয়োজন, কিন্তু তা নেই। এতে মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। জনবল কম থাকায় নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কর্মশালা বা সেমিনার আয়োজন করা যাচ্ছে না। ফলে দর্শনার্থীর সংখ্যা সীমিত থেকে যাচ্ছে।

জাদুঘরের ইনচার্জ তাপস কুমার মণ্ডল জানান, জাদুঘরের পাঠাগারে ৭০০ বই থাকলেও লাইব্রেরিয়ান না থাকায় সেটি চালু করা যাচ্ছে না। এতে গবেষক, সাহিত্যিক ও পাঠকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এত বড় জাদুঘরে আমরা মাত্র নয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২০ জন দর্শনার্থী এলেও ছুটির দিনে এ সংখ্যা কিছুটা বাড়ে। প্রচার-প্রচারণার অভাবেও দর্শনার্থী সংখ্যা প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না।’

দর্শনার্থী ও গবেষকদের অভিযোগ, কাঙাল হরিনাথকে নিয়ে লেখা উল্লেখযোগ্য অনেক বই ও গবেষণাকর্ম সংরক্ষিত নেই জাদুঘরে। ফলে হরিনাথের জীবন, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার পূর্ণাঙ্গ রূপ নতুন প্রজন্ম ও গবেষকরা জানতে পারছেন না। যা কিছু সংরক্ষিত আছে, তারও একটি অংশ পাঠাগারে নেই। ফলে দর্শনার্থীরা সরাসরি তা ব্যবহার করতে পারছেন না। এ অব্যবস্থাপনা জাদুঘরের প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব ও গবেষণা মূল্যকে কমিয়ে দিচ্ছে।

কাঙাল হরিনাথকে নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন ড. আমানুর আমান। হরিনাথকে নিয়ে রচিত একমাত্র ইংরেজি গ্রন্থের প্রণেতাও তিনি। এ বিষয়ে ড. আমানুর আমান বলেন, ‘সে সময় সমাজ, সমাজের অগ্রগতি, সংবাদসেবা এবং বিশেষ করে নারী উন্নয়ন সম্পর্কে কাঙাল হরিনাথ যে দূরদর্শী ও মানবিক চিন্তা ধারণ করেছিলেন, তা ছিল সত্যিই বিরল ও সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তিনি শুধু একজন সাংবাদিক বা সাহিত্যিকই নন, বরং সমাজ চিন্তায় একজন অগ্রপথিক ছিলেন।’

ড. আমানুর আমানের মতে, কাঙাল হরিনাথ তার লেখনী ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজের অসংগতি, শোষণ-বঞ্চনা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। নারীর অবস্থান উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার এবং সংবাদপত্রকে সমাজসেবার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের যে সাহসী দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

আরও