মালয়েশিয়ার একটি পাম বাগানে তিন বছর ধরে কাজ করছেন ময়মনসিংহের ফুলপুরের আবদুল্লাহ। বাগানের কাজের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত ভিডিও বানিয়ে আপলোড করেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে। নিজের নামে থাকা ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইবার ৭০ হাজারেরও বেশি, যেখানে প্রকাশ করেছেন তিন হাজারের বেশি ভিডিও। পাশাপাশি ‘আমি প্রবাসী’ ও ‘প্রবাসীর গল্প’ নামে রয়েছে তার একাধিক ফেসবুক পেজ, যেখানে প্রতিদিনই তিনি নতুন ভিডিও ও রিলস প্রকাশ করেন। ভিডিওগুলোর বেশির ভাগ দর্শকই প্রবাসী শ্রমিক, যারা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসব কনটেন্ট দেখায় মগ্ন থাকছেন। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ বিচ্যুতি ও উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তৈরি হচ্ছে চাপ। শুধু তা-ই নয়, দীর্ঘ সময় অনলাইনে থাকার অভ্যাস থেকে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার সঙ্গেও, যা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নানা দেশে কর্মরত অনেক প্রবাসী এখন নিয়মিত টিকটক ও ফেসবুকে দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ভিডিও তৈরি করছেন। সামাজিক মাধ্যমে আয় করার মোহে তারা কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ হারাচ্ছেন। নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে ওভারটাইম করার সুযোগ থাকলেও সে সময় তারা ব্যয় করছেন কনটেন্ট তৈরিতে। এতে শুধু কাজের দক্ষতাই কমছে না, নিয়োগকর্তাদের কাছে ক্ষুণ্ন হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশীদের ভাবমূর্তি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশের শ্রমবাজারে অনেক কর্মী নিয়মিত কাজের বাইরে সামাজিক মাধ্যম ও নানা অনলাইন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে বিপথগামী হচ্ছেন। কর্মঘণ্টায় বা কর্মস্থলে টিকটক-ফেসবুক ব্যবহার, নিয়মিত ভিডিও কনটেন্ট তৈরি—সবই নিয়োগকর্তাদের কাছে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে। ওভারটাইম না করার কারণে প্রবাসীদের আয় কমে যাচ্ছে। যেকোনো সময় কোম্পানি থেকে ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিও তৈরি করছে। দীর্ঘ মেয়াদে এ প্রবণতা শ্রমবাজারে বাংলাদেশীদের সংকট ডেকে আনতে পারে। তাই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রবাসী কর্মজীবীদের টিকটক-ফেসবুকে আসক্তি নিয়ে কথা হয় অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকীর সঙ্গে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রবাসীরা অনেকে বিনোদনের জন্য কর্মক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরি করছেন। অনেকের কাছে তা আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে। এ আসক্তি তাদের কর্মক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে, কাজের ক্ষতি করছে এবং নিয়োগকর্তাদের কাছে কর্মীদের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রবাসীদের নানা বিষয়ে যারা সচেতনতা ক্যাম্পেইন করেন তাদের উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সচেতনতা তৈরি করা। এছাড়া বিএমইটি ও টিটিসিতে যেসব প্রশিক্ষণ হয়, সেখানেও এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা দরকার।’
প্রবাসে কনটেন্ট তৈরি করে বাড়তি আয় ও খ্যাতি অর্জনের ভিন্ন গল্পও রয়েছে। তবে এ সংখ্যাটা খুবই নগণ্য। ফেসবুক, টিকটকে রাতারাতি ভাইরাল হয়েছিলেন টাঙ্গাইলের মানিক মিয়া। টিকটকে তার ফলোয়ারের সংখ্যা এখন ১০ মিলিয়ন, ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবে প্রায় দুই মিলিয়ন ফলোয়ার রয়েছে। শুরুতে সৌদি আরবে রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত জিনিসপত্র কুড়িয়ে বিক্রি করার নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ করে ভাইরাল হন ফেসবুকে। তারকা বনে যাওয়া মানিক দেশে ফিরে হেলিকপ্টারে করে গ্রামের বাড়িতে যান। এমনকি বিয়ে করতেও যান হেলিকপ্টারে চড়ে। বর্তমানে দেশে মোবাইলের দোকান চালানোর পাশাপাশি অনলাইনে ব্যবসা করছেন মানিক মিয়া।
প্রবাসীরা বলছেন, এমন সব ঘটনা অনেক প্রবাসীকেই উৎসাহী করে তুলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরিতে। তাদের ধারণা কাজের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনের জন্য কনটেন্ট তৈরি করলে বাড়তি আয় ও খ্যাতি অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
সৌদি আরবের কৃষি খামারে কাজ করা এক বাংলাদেশী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমি যে খামারে কাজ করি সেখানে সাম্মাম ফল, ত্বীন ফল, তরমুজ, স্ট্রবেরি, ড্রাগনসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করা হয়। নিয়মিত এসবের ভিডিও তৈরি করে ইন্টারনেটে দেই। এসবের পেছনেও অনেক সময় যায়। ওভারটাইম করার সময় থাকে না। রুমে বসে ভিডিও নিয়ে কাজ করি। এখান থেকে অনেকেই টাকা পায়।’
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, গড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যাচ্ছেন ১০ লাখের বেশি শ্রমিক। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত গেছেন প্রায় সাড়ে চার লাখ কর্মী।
রামরুর প্রতিবেদন অনুসারে গত বছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেছেন ১০ লাখ ১১ হাজার ৯৬৯ জন। তাদের মধ্যে দক্ষ কর্মীর সংখ্যা মাত্র ২ লাখ ১৪ হাজার ৪৪ জন, যা মোট শ্রমবাজারের ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। একই সময়ে স্বল্পদক্ষ কর্মী (অদক্ষ) হিসেবে বিদেশে গেছেন ৪ লাখ ৯১ হাজার ৪৮০ জন বা ৫৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। বিদেশে কর্মী পাঠানো ও রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়লেও দক্ষ কর্মী পাঠানোয় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। কর্মীদের বেশির ভাগই অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ। ফলে কর্মক্ষেত্রে তুলনামূলক কম বেতন পান আবার ওভারটাইম কাজ করার আগ্রহ না থাকায় তুলনামূলক বেশি আয়ের সুযোগ হারাচ্ছেন বাংলাদেশী কর্মীরা।
মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের একটি পাম বাগানে কাজ করেন বাংলাদেশী সায়েদুল। ৩০ বছর বয়সী এ তরুণ সাড়ে ৫ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গেলেও কাজের বাইরে কোনো ওভারটাইম করেন না। যে কারণে নির্দিষ্ট বেতনের বাইরে বাড়তি তার কোনো ইনকাম নেই। অথচ অন্য এক রাজ্যে একই ধরনের কাজ করে তার চেয়ে দ্বিগুণ বেতন পান অন্য বাংলাদেশীরা।
মালয়েশিয়ায় বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুরুতেই বেশির ভাগ কাজে মালয়েশিয়ায় ৪০-৫০ হাজার টাকার বেশি আয় করার সুযোগ নেই। তবে এ আয় বেশি করতে হলে ওভারটাইম করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশীদের অনেকেই ৮ ঘণ্টার বাইরে বাড়তি কাজ করতে চান না। এ কাজের বাইরে অনেকে ফেসবুক, টিকটকসহ নানা কাজে সময় পার করেন। অনেকে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছেন। এ কারণে আবার অনেকে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন না। জুয়ার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।
কথা হয় সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তবে শ্রমিকদের এসব কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কেউই আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাইকমিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত কাজের বাইরে ওভারটাইম কাজ করলে বেশি আয় হলেও সেই সময়টা অনেকে অনলাইনে ব্যয় করছেন। কেউ হয়তো ভিডিও তৈরির পেছনে সময় দেন, কেউ বিনোদনের পেছনে, কেউ কেউ অনলাইনে গেম ও জুয়ার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছেন। তাদের এসব কর্মকাণ্ডে কর্মক্ষেত্র ও নিয়োগকর্তাদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি যে করছে না সেটি বলা যাচ্ছে না।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশের তিনটি ব্যাংকের ৩০টির অধিক মানি ট্রান্সফার আউটলেট আছে জানিয়ে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, ‘দেশটিতে বৈধ-অবৈধ প্রায় ১৫ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশী আছেন। আমাদের মতো হোয়াট কলার জব করেন তারা দেশে টাকা পাঠান না। শ্রমিকরাই টাকা পাঠান। প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের বাইরেও ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। কিন্তু যে পরিমাণ বাংলাদেশী দেশটিতে রয়েছেন তা এ আউটলেট দিয়ে সেবা দেয়া সম্ভব না। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট দেশের বাজারভিত্তিক ডলারের দাম নির্ধারণ না করায় কয়েক পয়সার ব্যবধান হলেও প্রবাসীরা হুন্ডিতে টাকা পাঠান। বর্তমানে হুন্ডির তুলনায় ব্যাংকিং চ্যানেল কিছুটা বেশি হওয়ায় রেমিট্যান্স বেড়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের গত জুলাই থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রবাসীরা ১ হাজার ১৪৯ কোটি বা ১১ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের (২০২৪-২৫) একই সময়ে প্রবাসীরা ৯৯০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছিলেন। চলতি নভেম্বরের প্রথম ১২ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৩৫ কোটি ডলার। যেখানে গত বছরের নভেম্বরের একই সময়ে ৯৬ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছিল।