রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াত করা মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে পদ্মা সেতু। যাতায়াতকে আরো আরামদায়ক করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়ক, যা পরিচিত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে নামে। তবে যানবাহনের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত এ মহাসড়কে আসন্ন ঈদুল ফিতরের সময় তীব্র যানজট হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। মহাসড়কটির ছয়টি স্থানে থাকা টোল প্লাজা থেকে যানজট শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন তারা। যদিও মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদুল ফিতরের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে টোলবুথসহ পুরো এক্সপ্রেসওয়ের ব্যবস্থাপনায় জোর দেয়া হচ্ছে।
৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে টোল প্লাজা রয়েছে ছয়টি স্থানে। ধলেশ্বরী সেতু ও ভাঙ্গার টোল প্লাজায় টোলবুথ আছে ছয়টি করে। এর বাইরে আব্দুল্লাহপুর, শ্রীনগর, পুলিয়াবাজার ও মালিগ্রামেও রয়েছে টোল প্লাজা।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে তিন ধরনের টোল আদায় ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। ব্যবস্থাগুলো হলো ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেম (ইটিসি), টাচ অ্যান্ড গো ও ম্যানুয়াল পদ্ধতি। এর মধ্যে ইটিসি ও টাচ অ্যান্ড গো ডিজিটাল পদ্ধতি। এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল শুরু হয়েছে দুই বছরের বেশি সময় হলো। কিন্তু এখনো টোল আদায়ের এসব ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করতে পারেনি সওজ অধিদপ্তর।
বর্তমানে টোল আদায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন ম্যানুয়াল পদ্ধতি অর্থাৎ কাউন্টারে প্রতিটি যানবাহন থামিয়ে টোল আদায় করছে। এ পদ্ধতিতে একেকটি যানবাহন পাড়ি দিতে সময় লেগে যায় ৩০ সেকেন্ড থেকে এক মিনিট। কখনো কখনো আরো বেশি।
বর্তমানে স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজাগুলোতে যানজট খুব একটা থাকে না। তবে গাড়ির চাপ যেদিন বেশি হয়, সেদিন কিছুটা যানজট তৈরি হয় বলে জানিয়েছেন পরিবহন চালকরা। তাদের আশঙ্কা, আসন্ন ঈদযাত্রায় স্বাভাবিক সময়ের দ্বিগুণ গাড়ি চলবে এক্সপ্রেসওয়েতে, যার চাপ সামাল দিতে গিয়ে টোল প্লাজাগুলোতে তৈরি হতে পারে দীর্ঘ যানজট।
এক্সপ্রেসওয়েতে প্রতিদিন কী পরিমাণ যানবাহন চলাচল করে, তার একটা হিসাব পাওয়া যায় পদ্মা সেতুর টোল প্লাজা থেকে পাওয়া তথ্যে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৪ এপ্রিল ১১ হাজার ৩০৫টি যানবাহন পারাপার হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন পারাপার হওয়া যানবাহনের সংখ্যা সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে ২০ হাজারের আশপাশে থেকেছে। তবে গত ঈদুল আজহায় দৈনিক যান চলাচল ৩২ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। গত বছরের ১১ জুলাই পদ্মা সেতু পারাপার হয়েছিল ৩২ হাজার ৪৪০টি যানবাহন।
আসন্ন ঈদুল ফিতরের সময় প্রতিদিন স্বাভাবিক সময়ের অন্তত দ্বিগুণ যানবাহন চলবে বলে মনে করছেন ঢাকা-গোপালগঞ্জের মধ্যে চলাচল করা টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের চালক আব্দুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঈদের সময় পদ্মা সেতু ও এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহনের সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বা তারও বেশি হতে পারে। সড়কে গাড়ির চাপ বাড়লে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে টোল প্লাজাগুলোতে। গত ঈদুল আজহার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, টোলবুথ থেকে তৈরি হয় যানজট, যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে কয়েক কিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত হয়। টোল আদায় কার্যক্রমে ধীরগতি হলে এবার এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতু এলাকায় তীব্র যানজট হতে পারে।’
আসন্ন ঈদযাত্রায় ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে যানজটমুক্ত রাখতে উদ্যোগী হয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। ঈদযাত্রা যানজটমুক্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার লক্ষ্যে বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নুরীর সভাপতিত্বে গত ২০ মার্চ মাওয়া ও জাজিরা এলাকায় আলাদা দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে এক্সপ্রেসওয়ে যানজটমুক্ত রাখা ও মানুষের ঈদযাত্রা স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে ১১টি সুপারিশ করেন মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা। এক্সপ্রেসওয়ের মাওয়া প্রান্তে টোলবুথের সংখ্যা বৃদ্ধি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান, সুবিধাজনক স্থানে পাবলিক টয়লেট স্থাপন, টোলহার নিয়ে প্রচারণা ও জনগণকে ভাংতি টাকা নিয়ে আসার অনুরোধ, টোল প্লাজায় পর্যাপ্ত ভাংতি টাকা রাখা, ডাকাতিপ্রবণ এলাকায় সিসিটিভি স্থাপন ও মাওয়ায় জাতীয় মহাসড়ক এন-৮-এর সংযোগ সড়কের মিসিং লিংকের কাজ দ্রুত শেষ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে জাজিরা প্রান্তে টোলবুথের সংখ্যা বৃদ্ধি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান, সুবিধাজনক স্থানে পাবলিক টয়লেট স্থাপন, টোলহার নিয়ে প্রচারণা ও জনগণকে ভাংতি টাকা নিয়ে আসার অনুরোধ ও টোল প্লাজায় পর্যাপ্ত ভাংতি টাকা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েটি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ঢাকা জোনের অধীনে। ঈদযাত্রায় যানজটের শঙ্কার বিষয়ে জানতে গতকাল একাধিকবার চেষ্টা করেও ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তবে ঈদ উপলক্ষে যানবাহন চলাচল নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং আওতাধীন দপ্তর ও সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সদর কার্যালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হবে বলে জানিয়েছেন মহাসড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শুধু পদ্মা সেতুর রুট দিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতের জন্য ১০০টি বাসে বিশেষ সেবা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। এর বাইরে সারা দেশেও ঈদ উপলক্ষে বিশেষ বাস সেবা চালুর কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম।
ঈদুল ফিতর উপলক্ষে মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রেলপথে যাত্রার জন্য সহজে টিকিট প্রাপ্তি, টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধ ও শিডিউল বিপর্যয় নিরসনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সড়কপথের জন্য বাস স্টেশনের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা, মহাসড়কের শৃঙ্খলা, যানজট নিরসন, বিভিন্ন রুটে বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি, টিকিটপ্রাপ্তি সহজলভ্য করা ও সড়ক-সেতু সংস্কারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নৌপথের জন্য ফেরির সংখ্যা বৃদ্ধি, নৌঘাট ও ফেরি ব্যবস্থাপনা, নৌযানের মান নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন রোধ, ঝুঁকিমুক্ত নৌ চলাচল নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর বাইরে আকাশপথের জন্য অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি ও টিকিটের মূল্য সহনীয় রাখার নির্দেশনা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।