ঘুস, অনিয়ম আর টেবিল ঘোরার যন্ত্রণা—রাজউকের সেবা মানেই যেন ভোগান্তির অন্য নাম। বরাদ্দপত্র থেকে শুরু করে ভবনের নকশা অনুমোদন কিংবা ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র সবখানেই অনিয়ম। গত বছরের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চিত্র বদলাবে—এমনই প্রত্যাশা ছিল নগরবাসীর। যদিও সংস্থাটির অনিয়মের চিত্র আগের মতোই রয়ে গেছে বলে অভিযোগ সেবাপ্রত্যাশীদের। রাজধানী ঢাকার বাসযোগ্যতা ফেরাতেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি রাজউক—এমন অভিযোগ করেছেন নগরসংশ্লিষ্টরা।
রাজউকে মূলত কয়েক ধরনের সেবা পেতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হন সেবাপ্রত্যাশীরা। সেবাগুলো হলো উত্তরাধিকার সূত্রে নামজারি, হস্তান্তর বা দান বণ্টন সূত্রে নামজারি, প্লট হস্তান্তর/দানপত্র/হেবা দলিল/বণ্টন দলিল রেজিস্ট্রি অনুমতি, ফ্ল্যাট হস্তান্তর/দানপত্র বণ্টনের অনুমতি, প্লট বা ফ্ল্যাটের আমমোক্তারনামা অনুমোদন ও অনুমতি বাতিল, উত্তরাধিকার সূত্রে সংশোধিত বরাদ্দপত্র, প্লটের কোনো মূল কাগজ/ডকুমেন্টস হারানো গেলে সত্যায়িত কপি সরবরাহ করা, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, ইমারত নির্মাণের নকশা অনুমোদনের ছাড়পত্র, ইমারত নির্মাণ অনুমোদনপত্র, বসবাস ব্যবহার সনদ ইত্যাদি।
বিশেষ করে বড় ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয় ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে। বিষয়টি নিয়ে তিনজন ভূমি মালিক ও একাধিক ডেভেলপারের সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার। তারা জানান, বাড়ির নকশা অনুমোদন এমন প্রক্রিয়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, মোটা অংকের ঘুস ছাড়া এ কাজ অসম্ভব। সেবাপ্রত্যাশীরা বাড়ি নির্মাণের সময় নকশা অনুমোদনের জন্য ঘুসের টাকা আলাদা রেখে তারপর কাজ শুরু করেন। বাড়ি ও প্রজেক্টভেদে প্ল্যান পাস ৫ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুস দিতে হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
রাজউকের বড় দুর্নীতি হয় নকশা অনুমোদনসংক্রান্ত কাজগুলোর ক্ষেত্রে। এখানেই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সেবাপ্রত্যাশীরা। এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধের জন্য ২০২২ সালে ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটিং সিস্টেম (ইসিএসপি) নামে অনলাইন সেবা চালু করেছিল রাজউক। বাড়ির নকশা অনুমোদনে ইচ্ছুক ব্যক্তি সাইটে জমির পরচা, খাজনার রসিদ, এনআইডি ইত্যাদি দিয়ে একটি অ্যাকাউন্ড খুলে ছাড়পত্র নিতে হয়। এ বিষয়ে রাজউকের একাধিক সূত্র বণিক বার্তাকে জানিয়েছে, ওয়েবসাইট শুধু নামেই। সব কাজ টেবিলে টেবিলেই হয়।
অনলাইন হওয়ার পরও কীভাবে নকশা অনুমোদনে দুর্নীতি হয় জানতে চাইলে রাজউক সূত্র জানায়, ভূমির মালিক ছাড়পত্র পাওয়ার পর রাজউকের অনুমোদিত ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে বাড়ির যাবতীয় নকশা সাবমিট করতে হয়। নকশা অনলাইনে সাবমিট করলেই সেটা ভুল বলে রিজেক্ট করে দেয়। কিন্তু কেন রিজেক্ট করে দিয়েছে তা জানানো হয় না। এ ব্যাপারে জানার জন্য সরাসরি গিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করলে তখনই মানুষ ঘুস দিতে বাধ্য হয়। রাজউক সূত্রে জানা গেছে, দুই মাস ধরে অনলাইন সেবা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর আগে রাজউকের ওয়েবসাইট হ্যাক করে ১৫ তলা ভবনের নকশা অনুমোদনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। রাজউকের সেবা অনলাইন করা হলেও ঘুস-দুর্নীতি ও জনভোগান্তির জায়গায় কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘রাজউকের সেবা খুবই জটিল। এটা এতই কঠিন যে মানুষ রাজউকের নাম শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে যায়। এখানে এক সেবার জন্য অসংখ্য জায়গায় অসংখ্য প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিতে হয়। যেটা তারা চাইলে সহজ করতে পারত।’
রাজউকের সেবার জটিলতার বিষয়ে তিনি আরো বলেন, ‘কোন সেবা কত দিনে দিতে হবে সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলে দেয়া আছে। কিন্তু সে সময়সীমার মধ্যে সেবা না পেলে কী করণীয় সে ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। যে কারণে এখানে ১৫ দিনের ফাইল মাসের পর মাস পড়ে থাকে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মানুষকে হয়রানি করা হয় কিন্তু এর নিরসনে কঠোর কোনো ব্যবস্থা রাজউক নেয়নি।’
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজউক চাইলে ঢাকার কোনো ভবনের নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটত না। ভবনের নকশা অনুমোদনের সময়ই সংশ্লিষ্ট জোনের কর্মকর্তারা ঘুস খেয়ে বসে থাকেন। তারপর ভবন নির্মাণকালে ইন্সপেক্টররা ঘুস খেয়ে চুপ থাকেন। যখন বিল্ডিং নির্মাণ শেষ হয়ে যায় তখন আবার টাকার বিনিময়ে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেয়া হয়। আবার ভবনে যখন আগুন লাগে কিংবা ধসে পড়ে তখন বলা হয়, ভবনের নকশার ব্যত্যয় হয়েছে।
রাজউকের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে ভ্যারিয়েডস বিল্ডারসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজউক কাগজে-কলমে নিট অ্যান্ড ক্লিন প্রতিষ্ঠান। তারা আজ পর্যন্ত নিয়ম ভেঙে কোনো ভবনের অনুমোদন দেয়নি। কিন্তু ভবন মালিকদের সঙ্গে অলিখিত চুক্তি থাকে। সঠিক নকশা দেয়া হলেও ভবনে যেভাবে খুশি ভবন বানানোর ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ নেয় না। লেনদেন ঠিক থাকলে কেউ কিছু বলে না। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মূল নকশা দেখিয়ে রাজউকের কর্মকর্তারা পার পেয়ে যান।’
তিনি বলেন, ‘রাজউকের মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব ছিল ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে। কিন্তু তারা সেটা করেনি। যখন কোনো ভবন নকশা মানা হয় না তখন যদি রাজউক গিয়ে ভবনের কলাম ভেঙে দিত তাহলে কারো সাহসই হতো নকশার ব্যত্যয় করার। তারা গিয়ে বারান্দা ভেঙে দেয়। গিয়ে গেটে একটু খোঁচা দিয়ে আসে। আর বলে অফিসে গিয়ে কথা বলবেন। তখন ভবন মালিক বুঝে নেয় কেন দেখা করতে বলা হয়েছে।’
বাসযোগ্য নগরী গড়ার কথা বলে ২০২৩ সালে নতুন ড্যাপ গেজেট করে রাজউক। সে ড্যাপ নিয়েও নগরবাসী পড়েছেন তীব্র ভোগান্তিতে। ড্যাপের কারণে একদিকে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিপুল পরিমাণ ঘুস দিয়ে ব্যাক ডেটে ভবন অনুমোদন করানো হচ্ছে। এরই মধ্যে ড্যাপ কিছু জায়গায় ছাড় দিয়ে একবার গেজেট হয়েছে। সর্বশেষ ড্যাপ আবার সংশোধনের জন্য মন্ত্রণালয়ে আছে।
সম্প্রতি রাজউকের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথে ফাস্টট্র্যাক সেবা চালু করেছে সংস্থাটি। পাঁচটি কম্পিউটার নিয়ে পাঁচজন কর্মকর্তা বসে আছেন বুথে। তারা জানান, ফাস্টট্র্যাক বললেও এটা আসলে হেল্প ডেস্ক। তাদের কাছে কোনো ডাটাবেজ নেই। যে কারণে ফাস্টট্র্যাক সেবা দিতে পারছেন না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে কোথায় কার কাছে যেতে হবে সেটাই শুধু জানান তারা।
রাজউকের সংস্কার নিয়ে জানতে চাইলে স্থপতি ইকবাল হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজউক নানা উদ্যোগ নিয়েছে সেবা সহজ করার জন্য আর দুর্নীতি কমানোর জন্য। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখনো হচ্ছে না। আমি সবসময় বলেছি, রাজউকের কর্মকর্তারা একবারের জন্য টেবিলের এ পাশে এসে সেবাপ্রত্যাশী হিসেবে অভিজ্ঞতা নিক। তাহলে বোঝা যাবে রাজউকের সেবা কত জটিল। আমরা বলে আসছি ভবনের অনুমোদন সহজ করে তদারকি যেন কঠিন করা হয়। কতটুকু কী হয় দেখা যাক।’
তবে দুর্নীতি কমেনি এমন অভিযোগের বিষয়ে একমত নন রাজউকের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) ড. মো. আলম মোস্তফা (যুগ্ম সচিব)। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি গত সেপ্টেম্বরে। দুর্নীতি নিয়ে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। আমি আসার পর এখন পর্যন্ত ৪৮ কর্মকর্তাকে দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়েছে। আরো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। ১৮ জনকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। এটা একটা বড় পদক্ষেপ। এটার সুফলও আমরা পাচ্ছি। তবে পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত করতে সময় লাগবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি রাজউকের পুরো সেবা অনলাইনে নিয়ে আসতে। নকশা অনুমোদনের সেবা সাময়িক বন্ধ আছে। আশা করি শিগগিরই চালু করতে পারব। অনলাইন হয়ে গেলে সেবাও সহজ হয়ে যাবে। আর এখন আমরা যেকোনো বিষয়ে অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। এটাও সেবা সহজের অংশ।’