সোনার বাংলা নীতি আলোচনা ২০২৬

শিল্পে জ্বালানি সংকট, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও করনীতিতে সংস্কারের আহ্বান উদ্যোক্তাদের

দেশের শিল্প খাত বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে জ্বালানি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা।

একই সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, কর কাঠামো সহজীকরণ, রফতানি বহুমুখীকরণ ও নীতিগত পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

রাজধানীর শেরাটন ঢাকায় গতকাল বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম সোনার বাংলা নীতি আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব মতামত তুলে ধরেন এবং শিল্পের টেকসই উন্নয়নে জ্বালানি নিরাপত্তা, সহজ ব্যবসায় পরিবেশ ও স্থিতিশীল করনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সার্বিকভাবে ব্যবসায়ী নেতারা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর কাঠামো যৌক্তিক রাখা, ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘শিল্পের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন জ্বালানি, যা বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।’ তিনি জানান, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১০০ এমএমএসসিএফ হারে গ্যাস উৎপাদন কমছে। অন্যদিকে এলএনজি আমদানির জন্য বিদ্যমান দুটি এফএসআরইউ দিয়ে চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। নতুন টার্মিনাল স্থাপনেও সময় লাগবে কয়েক বছর।

এ পরিস্থিতিতে তিনি বড়পুকুরিয়ার কয়লাসম্পদ ব্যবহার করে ওপেন পিট পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাব দেন। তার মতে, এ রিজার্ভ ব্যবহার করে আগামী ৩০ বছর পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা শিল্পের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল ব্যবসার প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘বাস্তবে কর কাঠামো সহজ হওয়ার পরিবর্তে আরো জটিল হয়ে উঠছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ডিজিটাল প্রক্রিয়া চালু হলেও কার্যত নানা ধাপে জটিলতা ও নেতিবাচকতা বাড়ছে।

তিনি বলেন, ‘সরকার কর বাড়ালেও ব্যবসায়ীদের আপত্তি নেই, তবে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা জরুরি। অন্যথায় জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।’

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী কর বৃদ্ধি না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘কর বাড়ালে পণ্যের দাম ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে যাবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ফ্রিজ থেকে শুরু করে সাধারণ খাদ্যপণ্যের দামও বেড়ে যাবে।

তিনি আরো বলেন, ‘কর অপরিবর্তিত রাখলে অর্থনীতি সম্প্রসারিত হবে এবং রফতানি খাত উপকৃত হবে। একই সঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য আরো ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানান।’

এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মাহবুব উর রহমান বলেন, ‘রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং পোশাক খাতে আমাদের এখন যে কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ বা প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আছে তা ধরে রাখা ও বাজার সম্প্রসারণের জন্য আমাদের জ্বালানির পর্যাপ্ততা, প্রাপ্যতা ও নিরাপত্তা প্রয়োজন। রফতানি খাতের মাল্টিপ্লায়ার ইমপ্যাক্ট কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তার অভাবে এ খাতের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’ এছাড়া দেশের ক্রেডিট রেটিং হ্রাস পাওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, যা ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্বাস্থ্য খাতে বৈদেশিক মুদ্রা রোধে হেলথ ইন্স্যুরেন্স চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছে, যা রোধে স্বাস্থ্য বীমার বিকল্প নেই। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তা সঠিকভাবে ব্যয় না হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, যা উদ্বেগজনক।’

এদিকে কোকা-কোলা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব আহমেদ খান বলেন, ‘দেশের সফট ড্রিংকস বাজার তুলনামূলক ছোট হলেও এ খাতে বিশ্বের সর্বোচ্চ করহার বিদ্যমান। তিন বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কর বাড়ানো হয়েছে, যা ব্যবসার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি দীর্ঘমেয়াদি করনীতি ও নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর জোর দেন।

আরও