৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করে জনগণকে অপমান করেছে সরকার: জামায়াত আমির

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করে কার্যত জনগণকে অপমান করেছে সরকার। বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও রেফারেন্ডাম এভাবে বৃথা যায়নি। তিনি প্রশ্ন তুলেন, বাংলাদেশে চারটি রেফারেন্ডাম হয়েছে- এটা চতুর্থ। চতুর্থটাও বিএনপির হাতে। জিয়াউর রহমান যে গণভোট করেছিলেন, সেই প্রথমটাও সংবিধানে ছিল না। শেষটাও সংবিধানে ছিল না। ওটা যদি জায়েজ হয়, তাহলে এটা জায়েজ হবে না কেন?

আজ শুক্রবার সকালে ঢাকার আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামীর ‘জেলা ও মহানগরী আমীর সম্মেলনে’ দেয়া উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। সম্মেলনে দলের নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং সাংগঠনিক ৭৯টি জেলা ও মহানগরীর আমির-সেক্রেটারিরা উপস্থিত ছিলেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যের শুরুতে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের শহীদের মর্যাদা ও আহতদের সুস্থতা কামনা করেন জামায়াত আমির। এছাড়াও যারা জেল জুলুম নির্যাতন ও আয়নাঘরের শিকার হয়েছেন, যাদের জান-মাল ও ইজ্জতের ওপর আঘাত হয়েছে, তাদের প্রতিও দলের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি।

এ সময় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। ট্রানজিশনাল পিরিয়ডের সরকার হিসেবে তাদের একটি পবিত্র দায়িত্ব ছিল ক্ষমতা হস্তান্তরটিকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করা। কার্যত তারা সে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি, ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে জাতির মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হয়নি। কেন হয়নি তা পরিষ্কার। নির্বাচনকে সুষ্ঠু হতে দেয়া হয়নি। ব্যাপক ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার মুখ থেকে তা বের হয়েছে। তিনিই প্রথম রাজসাক্ষী।

সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, দুটি ভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে পৃথক ব্যালটে। একটি ছিল জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন, আরেকটি হলো গণভোটে হ্যাঁ কিংবা না। জনগণ তাদের রায় দিয়েছে। গণভোটে ৬৮ শতাংশের বেশি হ্যাঁ-তে ভোট দিয়েছেন জনগণ। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টা বলেছেন, তাদের আমরা মেইন স্ট্রিমে আসতে দেইনি। তাদের ১৬৮টি পাওয়ার কথা ছিল তাদের আমরা ৬৮টিতে বেঁধে দিয়েছি। এটি চরম লজ্জাজনক।

জামায়াত আমির বলেন, ইতিহাস একদিন এ নির্বাচনের পোস্টমর্টেম করবে। সেদিন আরো অনেক জিনিস বের হয়ে আসবে। তবে আমাদের ঐক্য (১১ দল) দেশ পরিচালনার জায়গায় গেল কিনা সেটি বড় আফসোসের জায়গা নয়, জনগণের আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু হলো। আমরা চাইনি দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বোঝাপড়া করে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতার মসনদে যারা গিয়েছিলেন, তারা তাদের পরিণতি নিয়ে বিদায় হয়েছেন। এখনো যদি কেউ এমন করে থাকেন, তাদের পরিণতি ভিন্ন কিছু হওয়ার কথা নয়- তা প্রমাণিত, কারণ প্রধান বিচারক আল্লাহ তায়ালা।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের আফসোসের জায়গা হলো জনগণের ভোটাধিকার আর কতকাল চোরাবালিতে হামাগুড়ি খাবে। আমরা আশাবাদী, দেশে সুস্থ রাজনীতির বিকাশ ঘটবে। আমরা সেই সুস্থ রাজনীতির ধারায় হাঁটছি বলেই এতো বড় দলীয় বা জোটগত ক্ষতি আমরা মেনে নিয়েছি বৃহত্তর স্বার্থে। আরেকটি আফসোস হলো আমরা প্রথম দিনে দুটি শপথ নিলেও সরকারি দল একটি নিয়েছে। আমরা প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান ও ঘৃণা করি।

বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক যত প্রতিষ্ঠান ছিল, সবগুলো ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে। খেলার ময়দানেও বাপের তালিকায় আবার কেউ স্বামীর তালিকায়- এভাবে দলীয়করণ করে ফেলা হলো। সিভিল প্রশাসনে যে লোকগুলো আসলে দক্ষ, তাদের ওএসডি করা হচ্ছে। তাদের মেধা থেকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। আর জনগণের ওপর জুলুম করা হচ্ছে। পুলিশেও একই অবস্থা। সব দিকে একটা মহা-নৈরাজ্য চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চোখের পলকে বিদায়। দুদক থেকে কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেছেন, মানবাধিকার কমিশন থেকে পদত্যাগ করে খোলা চিঠি দিয়েছেন। বিচারকদের উপর হস্তক্ষেপ করে এখন ২৮ জন বিচারককে শোকজ করা হয়েছে, অথচ বলা হচ্ছে বিচারকরা স্বাধীন। এ অল্প সময়ের ভিতরে তারা এ কাজগুলো করেছে।

চাঁদাবাজির সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং হেলথ কার্ডও দিবেন এটা ভালো, কিন্তু সে জায়গায়ও দলীয়করণ। আবার এটাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি হচ্ছে। চাঁদাবাজি আগের চেয়ে এখন দিন দিন বাড়ছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে মানুষ পিষ্ট। দুই কারণে, একটা জ্বালানি সংকটে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, আরেকটি হলো- বাড়তি চাঁদার চাপ। এর সবটুকু খেটে খাওয়া মানুষের ঘাড়ে চাপছে। অথচ আপনারা বলেছিলেন দুর্নীতির টুটি চেপে ধরবেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি- মিডিয়া আর সমাজের বিভিন্ন জায়গার ভালো মানুষগুলোর ঠোট সেলাই করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এভাবে কারো ঠোট বা মুখ চিরদিন বন্ধ করা যায় না।

তিনি বলেন, আমরা ন্যায়সম্মত সব কাজে সমর্থন এবং সহযোগিতা দিব। অন্যায় এবং জনগণের অধিকার হরণ করার যত কাজ আছে সব কাজের বাধার দেয়াল হয়ে দাঁড়াব, ইনশাআল্লাহ। এ ক্ষেত্রে এক চুলও ছাড় দিব না।

আরও