প্রণোদনা প্যাকেজ

দ্বিতীয় মেয়াদের ৯ মাসে বাস্তবায়ন ৩২ শতাংশ

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় বেশকিছু প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সরকার। তবে এ প্যাকেজের আওতায় ঋণ পেতে কঠিন শর্ত বেঁধে দেয়া হয়, যা পূরণ করতে না পারায় কয়েকটি প্যাকেজ থেকে ঋণ নিতে পারছেন না গ্রাহকরা। অন্যদিকে কয়েকটি প্যাকেজের আওতায় যে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তা আদায় নিয়ে চিন্তিত ব্যাংক খাত।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় বেশকিছু প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সরকার। তবে এ প্যাকেজের আওতায় ঋণ পেতে কঠিন শর্ত বেঁধে দেয়া হয়, যা পূরণ করতে না পারায় কয়েকটি প্যাকেজ থেকে ঋণ নিতে পারছেন না গ্রাহকরা। অন্যদিকে কয়েকটি প্যাকেজের আওতায় যে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, তা আদায় নিয়ে চিন্তিত ব্যাংক খাত। তাই ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ দিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। ফলে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন কার্যক্রম অনেকটা গতিহীন হয়ে পড়েছে। ঘোষণার নয় মাস পেরোলেও বাংলাদেশ ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সাতটি প্যাকেজের মধ্যে মাত্র তিনটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এ তিনটির বাস্তবায়ন হারও ভালো নয়।

প্রথম মেয়াদে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের প্রায় ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নে সক্ষম হয় ব্যাংক খাত। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তিন বছর প্রণোদনার আওতায় ঋণ বিতরণ করা হবে। গত বছর ১ জুলাই থেকে দ্বিতীয় মেয়াদের ঋণ বিতরণ শুরু হলেও কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এ দফায় চলমান সাতটি প্যাকেজের আওতায় মোট ৬৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে তথ্য বলছে, নয় মাস শেষে এ মেয়াদে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণ হয়েছে মাত্র ২১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার অর্থাৎ বাস্তবায়নের হার ৩২ শতাংশ। যদিও এ সময়ে ৭৫ শতাংশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুরু থেকেই প্রণোদনার আওতায় ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর অনীহা ছিল, যা এখন আরো প্রকট হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, প্রথম পর্যায়ে বিতরণ করা ঋণের একটি অংশ আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। আবার বিতরণ করা ঋণের সঠিকতা যাচাই করে সুদ ভর্তুকির টাকা পেতে কিছুটা ঝামেলা হচ্ছে। গ্রাহক টাকা ফেরত না দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সময়মতো ব্যাংকের হিসাব থেকে পুনঃঅর্থায়নের টাকা কেটে নিচ্ছে। এসব কারণে ঋণ বিতরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম রয়েছে। আবার কিছু প্যাকেজ থেকে ঋণ পেতে কঠিন শর্ত পালন করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। তাই তারাও ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গাইডলাইন দেয়া হয়েছে। সে গাইডলাইন অনুযায়ী যদি কোনো গ্রাহক কোনো প্যাকেজের ঋণের জন্য আবেদন করে, তাহলে ব্যাংকগুলো তা দিতে বাধ্য। সরকারের ঘোষিত এ প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোকে দেয়া লক্ষ্য তারা পূরণ করবে বলে আশা করছি। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে প্রথম মেয়াদে ৪০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। এর মধ্যে দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ৩৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে প্রথম মেয়াদে ৩২ হাজার ৭২৪ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছিল ব্যাংকগুলো। তবে দ্বিতীয় দফায় প্যাকেজের এ অংশে বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৩০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। গত মার্চ শেষে ঋণ বিতরণ সম্ভব হয়েছে মাত্র ১০ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ নয় মাসে বাস্তবায়ন হার মাত্র ৩৫ শতাংশ।

একই প্যাকেজের আওতায় বিদেশী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রথম মেয়াদে ১২২ কোটি ৩৬ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করেছিল ব্যাংকগুলো। তবে দ্বিতীয় দফায় প্যাকেজের এ অংশে ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। গত মার্চ শেষে ঋণ বিতরণ সম্ভব হয়েছে মাত্র ১৬৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ নয় মাসে বাস্তবায়ন হার মাত্র ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ প্যাকেজের আওতায় ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৯ শতাংশ। যার মধ্যে ঋণগ্রহীতাকে সাড়ে ৪ শতাংশ দিতে হবে, বাকি সাড়ে ৪ শতাংশ সরকার সুদ ভর্তুকি হিসেবে দেবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। প্রথম দফায় এ প্যাকেজ থেকে ১৫ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে নয় মাসে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা অর্থাৎ ৪৪ দশমিক ৪০ শতাংশ। এ প্যাকেজের আওতায় ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৯ শতাংশ। যার মধ্যে ঋণগ্রহীতাকে ৪ শতাংশ দিতে হবে বাকি ৫ শতাংশ সরকার সুদ ভর্তুকি হিসেবে দেবে।

কৃষি খাতে ব্যাংকগুলোর পুনঃঅর্থায়নের জন্য দ্বিতীয় দফায় ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে মাত্র ১ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বা ৫৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ বিতরণ হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছিল ৪ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা বা ৮৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে কৃষকদের এ প্যাকেজের আওতায় ঋণ দেবে। আর ব্যাংকগুলোর সুদ-ক্ষতি বাবদ ৫ শতাংশ দেবে সরকার।

প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিমের আওতায় ঘোষণা করা হয় ৫ হাজার কোটি টাকা। এ প্যাকেজের আওতায় এখন পর্যন্ত সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৭৮টি প্রতিষ্ঠান। এখন পর্যন্ত ৬৩৬ কোটি টাকার ঋণ সুবিধা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ। এ প্যাকেজ থেকে দ্বিতীয় দফায় ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। এ প্যাকেজের আওতায় গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে।

কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র (সিএমএস) উদ্যোক্তাদের ছোট ঋণে গ্যারান্টি দিতে ২ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কর্মসূচির আওতায় সিএমএসএমই খাতের প্রণোদনার ঋণ খেলাপি হলে তার ৮০ শতাংশ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্রণোদনা প্যাকেজে এখন থেকে ৪১৫টি প্রতিষ্ঠানের ৮১ কোটি ৮৭ লাখ টাকার গ্যারান্টি ইস্যু হয়েছে। প্রথম দফায় বাস্তবায়ন হতাশাজনক, তাই দ্বিতীয় দফায় এটিরও বাস্তবায়ন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এনজিওর মাধ্যমে বিতরণের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিলের আওতায় প্রথম দফায় বিতরণ হয়েছে ২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। ৪ লাখ ৯১ হাজার ৩৮২ জনের মাঝে ৯ শতাংশ সুদে দেয়া হয়েছে এ ঋণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো ১ শতাংশ সুদে অর্থায়ন নিয়ে এনজিওগুলোকে দেয় সাড়ে ৩ শতাংশ সুদে। দ্বিতীয় দফায় এ প্যাকেজের বাস্তবায়নও শুরু করা সম্ভব হয়নি।

এসবের বাইরে পর্যটন খাতের হোটেল, মোটেল, থিম পার্কের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য ১ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল করা হয়েছে। এখান থেকে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ হবে। বাকি ৪ শতাংশ ভর্তুকি দেবে সরকার। এ প্যাকেজ থেকে প্রথম দফায় মাত্র ৭০ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদে এটিরও বাস্তবায়ন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

ঋণ বিতরণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আতাউর রহমান প্রধান বণিক বার্তাকে বলেন, লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে গত এপ্রিল শেষে ৫৪ শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। এখনো সময় রয়েছে, সোনালী ব্যাংক শতভাগ বিতরণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এপ্রিল থেকে শেষের দুই মাসে সব ব্যাংকেরই প্রণোদনার ঋণ বাড়তে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

প্রথম পর্যায়ে বিতরণকৃত ঋণের কিস্তি আদায়ের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আদায় খারাপ নয়। তবে কিছু কিস্তি আদায় পিছিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে নাম না প্রকাশের শর্তে অন্য কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, প্রথম মেয়াদে প্রণোদনার যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, সেগুলোই ঠিকঠাক আদায় হয়নি। কিস্তি দিতে পারছেন না গ্রাহক। তাই নতুন করে ঋণ দিতে ভয় পাচ্ছে ব্যাংক। গ্রাহক টাকা ফেরত না দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সময়মতো ব্যাংকের হিসাব থেকে পুনঃঅর্থায়নের টাকা কেটে নিচ্ছে। এসব কারণে ঋণ বিতরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম রয়েছে।

প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন না হওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, প্রণোদনার বেশ কয়েকটি প্যাকেজের অর্থ বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, তাতে বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল নেই। এর অর্থ ছাড়ে যেসব শর্ত দেয়া হয়েছে, তা পূরণ করে বেশির ভাগ উদ্যোক্তার পক্ষে ঋণ নেয়া সম্ভব নয়। তাই সার্বিকভাবে প্যাকেজ বাস্তবায়নে গতি নেই।

আরও