কিন্তু নেই কোনো প্রশিক্ষক, নেই শিক্ষার্থীদের কোলাহল। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা অবকাঠামো আজ নীরবতার সাক্ষী। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) এখন এমনই চিত্র।
স্থানীয়ভাবে কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত প্রতিষ্ঠানটি চালু হয়েছিল বড় স্বপ্ন নিয়ে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ফেঞ্চুগঞ্জে প্রায় ১ দশমিক ৫০ একর জমির ওপর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে টিটিসি। প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেন্দ্রটিতে রয়েছে চারতলা একাডেমিক ভবন, তিনতলা ডরমিটরি এবং চারতলা শিক্ষকদের আবাসিক ভবন। আধুনিক ল্যাব ও প্রশিক্ষণ সরঞ্জামও স্থাপন করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের তিন বছরেই প্রতিষ্ঠানটি চরম শিক্ষক ও জনবল সংকটে পড়েছে। বর্তমানে এখানে কোনো স্থায়ী প্রশিক্ষক নেই। ফলে স্বাভাবিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
টিটিসি সূত্রে জানা গেছে, চালুর পর অ্যাকসিলারেটিং অ্যান্ড স্ট্রেনদেনিং স্কিলস ফর ইকোনমিক ট্রান্সফরমেশন (অ্যাসেট) প্রকল্পের আওতায় গ্রাফিকস ডিজাইন, কম্পিউটার অপারেশন, ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স, মোটর ড্রাইভিং ও সিভিল কনস্ট্রাকশন—পাঁচ ট্রেডে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। বিদেশী অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পটির মেয়াদ গত ১৬ মে শেষ হয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশিক্ষকরাও কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান। এর পরই কার্যত অচল হয়ে পড়ে পুরো প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটিতে সম্প্রতি ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিকস, আইটি সাপোর্ট টেকনিশিয়ান (কম্পিউটার অপারেশন), অটো মেকানিকস (ডিজেল ইঞ্জিন), মেশিন টুলস অপারেশন ও রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং—ছয়টি ট্রেডের জন্য আধুনিক ও ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট ল্যাবগুলোয় এসব যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষক ও জনবল না থাকায় এগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিশাল এ প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে মাত্র দুজন স্থায়ী কর্মী রয়েছেন। তাদের একজন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, যিনি একাই প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। অন্যজন একজন কম্পিউটার অপারেটর, যিনি দাপ্তরিক কাজে সহায়তা করছেন। শিক্ষক না থাকায় ক্লাস পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। ফলে একসময় যে শ্রেণীকক্ষগুলো শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর ছিল, সেগুলো এখন ফাঁকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে ফেঞ্চুগঞ্জ টিটিসিতে নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে না। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ল্যাবে স্থাপন করা আধুনিক যন্ত্রপাতি ও মালপত্র ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে আছে। তাই সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু না হলে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা এসব মূল্যবান যন্ত্রপাতি ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারাবে। এতে একদিকে যেমন সরকারি বিনিয়োগের অপচয় হবে, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তি তৈরির মূল উদ্দেশ্যও হবে ব্যাহত।
ফেঞ্চুগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুর রহিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থায়ী জনবল বলতে আমি আর আমার একজন কম্পিউটার অপারেটর আছেন। এখন কোনো প্রশিক্ষক নেই। বিগত দিনে অ্যাসেট প্রকল্পের আওতায় পাঁচটি কোর্স চালু ছিল। কিন্তু গত ১৫ মে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা হওয়ার পর এ প্রকল্প আর এক্সটেনশন হয়নি। এটি বিশ্বব্যাংকের আওতায় ছিল, প্রশিক্ষকও তারা নিয়োগ করত। তাই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্রশিক্ষকরা সবাই চলে গেছেন। এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে।’
নতুন জনবল চাওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আগামী জুলাই থেকে যেন নতুন সেশনে কোর্সগুলো চালু করা যায়, সেজন্য ছয়টি ট্রেডে ন্যূনতম একজন করে প্রশিক্ষক চেয়েছি। শিক্ষক পাওয়া গেলে ল্যাবগুলো সচল করার পাশাপাশি নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করে প্রতিষ্ঠানকে সচল করা সম্ভব হবে।’
কারিগরি শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে দক্ষ কর্মী তৈরির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এমন সময়ে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কার্যত অচল হয়ে থাকা শুধু ফেঞ্চুগঞ্জ নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই হতাশাজনক। দ্রুত স্থায়ী প্রশিক্ষক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পুনরায় চালু করা না গেলে কোটি টাকার এ প্রতিষ্ঠান শ্বেতহস্তীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।