সত্তরের দশকের শেষভাগ। ঢাকা-দিল্লির মধ্যে তখন বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি। দেশ দুটির মধ্যে পানিচুক্তিসহ বেশকিছু বিষয় নিয়ে চলছে টানাপড়েন। এমন এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমন্ত্রণে ১৯৭৯ সালের ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই দুইদিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন। সফর শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এ আলোচনার (রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে) মধ্য দিয়ে ১৯৭৭ সালে শুরু হওয়া ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো মজবুত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়; এক যৌথ বিবৃতিতে দেশ দুটির মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়ন প্রচেষ্টার তালিকায় গঙ্গা প্রণালির বিভিন্ন নদী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবাহিত সেচের পানিবণ্টন বিষয়ে একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রসঙ্গটিও উঠে আসে ১৯৭৯ সালের ১৯ এপ্রিল দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে। এতে আরো উল্লেখ করা হয় পরের মাসেই হয়তো কমিশনের বৈঠক হবে।
যৌথ বিবৃতি অনুসারে, সীমান্ত বিরোধ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হবে। এছাড়া আলোচনা হবে ঝুলে থাকা ছিটমহল বিনিময় এবং সামুদ্রিক সম্পদ ও সমুদ্রতলের সম্ভাব্য তেলের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সমুদ্র সীমানা নির্ধারণের মতো বিষয়েও।
উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের ভারত সফরের ঠিক আগেই স্বাক্ষর হয়েছিল ফারাক্কা নিয়ে অন্তর্বর্তী একটি সমঝোতা, যা পরে গঙ্গা চুক্তির ভিত তৈরি করেছিল।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য ও বেশি দাম বাংলাদেশীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। যৌথ নদীর পানি বেশির ভাগ ভারতের কৃষকরা সেচকাজে ব্যবহার করছেন, এ নিয়েও অসন্তোষ ছিল। অন্যদিকে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে ভারতে প্রবেশ করছিলেন—এ নিয়ে পাল্টা অভিযোগ ছিল ভারতের।
এসব অভিযোগের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজির বাংলাদেশ সফরের আগ পর্যন্ত দেশ দুটির সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছানোর পেছনে ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে গুলির ঘটনাটি বড় ভূমিকা রাখে। এরপর দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন কাটতে শুরু করে ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভারত সফরের মধ্য দিয়ে।
শুধু বাংলাদেশই নয়, প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করেছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই। তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন মুহাম্মদ জিয়া-উল-হক। প্রধানমন্ত্রী দেশাইয়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল বলে লোকমুখে চাউর হয়েছিল। তারা নাকি প্রায়ই ফোনে কথা বলতেন। মোরারজি দেশাইয়ের ঘনিষ্ঠ এক কূটনীতিক অবশ্য বলেন, তাদের মধ্যে (দেশাই ও জিয়া-উল-হক) একবারই সাক্ষাৎ হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে কেনিয়ার প্রেসিডেন্টের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দিন। সেই সাক্ষাৎ ছিল মিনিট কয়েকের জন্য। তারা মূলত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে থাকা সমস্যা সমাধান করতে চেয়েছিলেন।
১৯৯০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালনকারী মোরারজি দেশাইকে নিশান-ই-পাকিস্তান খেতাবে ভূষিত করা হয়। মোরারজিকে দেয়া পাকিস্তানের এ খেতাব কংগ্রেসের ভ্রু কুঁচকে দেয়। কিন্তু দেশাই সেসব সমালোচনা কানে না তুলে পুরস্কারটি গ্রহণ করেন।
দেশাই ভারতে বিতর্কিত হয়েছেন আরো কিছু কারণে। বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংকে (র) ‘দুর্বল’ করার মতো সিদ্ধান্তের কারণে। ‘র’য়ের বাজেট ৩০ শতাংশ হ্রাসের পরামর্শ দিয়েছিলেন দেশাই। তার এ সিদ্ধান্তকে ভালো চোখে দেখেনি দেশটির অনেকেই। অভিযোগ উঠেছিল নিজের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠা করতে তিনি এমনটা চেয়েছিলেন।
ভারতের একজন সাবেক কূটনীতিক প্রভু দয়ালের মতে, দেশাই ‘র’-কে ঘৃণা করতেন। কারণ তার দৃষ্টিতে ইন্দিরা গান্ধী এ সংস্থাটি বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারির জন্য ব্যবহার করেছিলেন।
ভারত ও বাংলাদেশ সম্পর্কে মোরারজির ভূমিকা বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও লেখক মাহবুব উল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মোরারজি দেশাই উপমহাদেশের রাজনীতিকে যেভাবে দেখেছেন ভারতের অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রী সেভাবে দেখেননি। তিনি যতদিন ক্ষমতায় ছিলেন ততদিন ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে একটি সুসম্পর্ক ছিল। গঙ্গার পানিচুক্তি, বাণিজ্য ভারসাম্যসহ বেশকিছু বিষয়ে তিনি প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি খুব অল্প সময় ক্ষমতায় থাকার পর ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় আসেন। আবারো দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। প্রতিবেশী দেশের প্রতি অবদানের কারণেই কিন্তু পাকিস্তান তাকে নিশান-ই-পাকিস্তান উপাধি দিয়েছিল।’
তিনি আরো বলেন, ‘মোরারজি দেশাইয়ের আগে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ছিলেন। তার সময়ে ‘র’ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। এ পরিকল্পনার খবরটি একটি গণমাধ্যমে বের হয়। তারপর যখন মোরারজি দেশাই ক্ষমতায় আসেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পরিকল্পনাটি ‘র’ তাকে জানায়। এটা শুনেই উনি চমকে উঠে বলেন, “হোয়াট! ইউ ওয়ান্ট টু কিল দ্য প্রেসিডেন্ট অব আওয়ার নেইবারিং কান্ট্রি?” এ প্রশ্নের পর তিনি পরিষ্কার নির্দেশ দেন যে—এ পরিকল্পনা আমি পছন্দ করি না; এটা বন্ধ কর।’
মোরারজি দেশাই যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন তখন দুই নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে টানাপড়েন চলছিল। ভারতের অনেক কূটনৈতিক মনে করেন, এমন অবস্থায় মোরারজি দেশাইয়ের দূরদর্শী ভূমিকা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিল। নিজ দেশে এজন্য তিনি অনেক সমালোচনার মুখে পড়লেও তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি।