ইমারত নির্মাণের অপরিহার্য উপাদান বালি। দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে আহরিত বালি ইমারত নির্মাণে ব্যবহার হয়। তবে বালি উত্তোলনের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা রয়েছে। দেশের নদ-নদীতে সরকার নির্ধারিত স্থানকে বালুমহাল বলা হয়। নীতিমালা অনুসরণ করে এসব স্থান থেকে বালি উত্তোলনে আইনগত কোনো বাধা নেই। মৌলভীবাজারের বিভিন্ন নদ-নদীতে গত বছর ৪১টি বালুমহাল ছিল। পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় এ বছর কমিয়ে রাখা হয়েছে ২৬টি। এর মধ্যে সাতটি মহাল ইজারা দিতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন। দফায় দফায় বিজ্ঞপ্তি দিলেও শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার বালুমহাল ইজারায় অংশ নেয়নি কেউ। তবু এসব স্থান থেকে অবাধে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে মনু ও ধলাই নদের পাঁচ সেতু।
পরিবেশবিদরা বলছেন, অপরিকল্পিত বালি উত্তোলনের কারণে নদীর বেড়িবাঁধ ভাঙন এবং তীর রক্ষায় পাকা ব্লক পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি। ভেঙে যাচ্ছে বিভিন্ন নদ-নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ। তীরবর্তী এলাকার মানুষের মাঝে ভাঙন আতঙ্ক বাড়ছে। বোমা মেশিন ও ড্রেজার দিয়ে অবাধে বালি উত্তোলনের কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে কয়েকটি সেতু ও কালভার্ট।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ অনুযায়ী, যেকোনো সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারাজ, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা আবাসিক এলাকা থেকে সর্বনিম্ন এক কিলোমিটারের মধ্যে বালি তোলা যাবে না। এছাড়া বালি বা মাটি উত্তোলন কিংবা বিক্রির জন্য খননের ফলে কোনো নদীর তীর ভাঙনের শিকার হলেও বালি তোলা যাবে না। আইন অমান্যকারীর দুই বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মনু ও ধলাইসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও ছড়া থেকে প্রতিদিন যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। বালি উত্তোলনের কারণে পিলারের নিচের মাটি সরে যাওয়ায় কুলাউড়ার রাজাপুরসহ কয়েকটি সেতু ঝুঁকিতে রয়েছে। মৌলভীবাজার-কমলগঞ্জ সড়কের চৈত্রঘাট এলাকার ধলাই সেতুর নিচ থেকে কয়েকটি ড্রেজার দিয়ে চলছে বালি উত্তোলন। কুলাউড়ার শরীফপুর ইউনিয়নের চাতলাপুর সেতুর ভাটিতে দেড়-দুইশ ফুটের মধ্যে রয়েছে একাধিক ড্রেজার। উত্তোলন করা বালি নদের পাড়ে স্তূপ করে রাখা হয়েছে এবং সেখান থেকে বিক্রি করা হচ্ছে। উপজেলার রাজাপুর সেতুর পিলারের নিচের মাটি সরে গেছে। নবনির্মিত সেতুটি এখনো চালুই হয়নি। তার আগেই এ অবস্থার জন্য বালি উত্তোলনকে দায়ী করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়রা বলছেন, জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে বালি উত্তোলনের অন্যতম স্থান কুলাউড়া। উপজেলার কটারকোনা, রাজাপুর ও চাতলাপুর এলাকায় যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চলছে বালি উত্তোলন। এছাড়া মনু নদের দুর্লভপুর, কামালপুর, সরকার বাজার, নতুন ব্রিজ ও রাজনগর উপজেলার জাহিদপুর ও আব্দুল্লাহপুরে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর দুই পাশের বিভিন্ন এলাকা, সদর উপজেলার শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি স্থান থেকেও তোলা হচ্ছে বালি। এছাড়া শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ও সিন্ধুরখান ইউনিয়নের বিভিন্ন ছড়া থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে সিলিকা বালি।
স্থানীয় বাসিন্দা মনসুর আলী বলেন, ‘মৌলভীবাজার-কমলগঞ্জ সড়কের চৈত্রঘাট এলাকার ধলাই সেতুর কাছ থেকে বালি উত্তোলনের ফলে বছর দুয়েক আগে পুরনো সেতুটি ভেঙে যায়। পাশে তৈরি হচ্ছে নতুন আরেকটি সেতু। কিন্তু বন্ধ হয়নি বালি উত্তোলন।
আরেক বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘কুলাউড়ার চাতলাপুর সেতু দিয়ে ভারতের সঙ্গে চাতলাপুর শুল্কস্টেশন রয়েছে। এ সড়ক দিয়ে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন হয়। বালি তোলার কারণে ঝুঁকিতে
পড়েছে সেতুটি।’
জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, জেলার ২৬টি বালুমহালের মধ্যে ১৯টি ইজারা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গলের শিয়ালছড়া, কুলাউড়ার গোপালিছড়া ও ফানাই নদীর দুটি বালুমহাল, জুড়ী উপজেলার জুড়ী নদী, বড়লেখা উপজেলার নিকড়ীছড়া ও পাবনীয়াছড়ার বালুমহাল ইজারায় কেউ অংশগ্রহণ করেনি।
অভিযোগ রয়েছে, অবৈধভাবে বালি লুটপাটের উদ্দেশ্যে সিন্ডিকেট করে এসব মহাল ইজারায় কেউ অংশগ্রহণ করেনি। মহালগুলো ইজারা দেয়া না গেলেও সেসব জায়গা থেকে প্রতিদিন লুট হচ্ছে বালি।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. ইসরাইল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অবৈধভাবে বালি উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে মামলা, জরিমানা ও গত ১১ মাসে প্রায় ২৭০ জনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বালি বহনকারী কয়েকটি গাড়িও জব্দ করা হয়েছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
২০১৩ সালে এক প্রজ্ঞাপনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, রাজনগর, কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলার ৫২টি ছড়াকে সিলিকা বালিসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ১৯টি ছড়া থেকে অযান্ত্রিক পদ্ধতিতে বালি উত্তোলনের জন্য ইজারা দেয় খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো। এ পদ্ধতিতে বালি উত্তোলন করলে পরিবেশ-প্রতিবেশ হুমকির মুখে পড়বে উল্লেখ করে ২০১৬ সালের ৮ মার্চ মৌলভীবাজারের ৫২টি পাহাড়ি ছড়া থেকে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) ছাড়া বালি উত্তোলন বন্ধ ও নতুন করে ইজারা প্রদানে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। ২০১৮ সালের ৩ জুলাই উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সিলিকা বালির এনভায়রমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) পরিচালনার এবং পরিবেশের ছাড়পত্র (ইসিসি) ছাড়া কোয়ারি (সিলিকা বালি উত্তোলন অঞ্চল) থেকে সিলিকা বালি উত্তোলন এবং লিজ না দেয়ার নির্দেশ দেন। এসব আইনি জটিলতায় জেলার ৫২টি সিলিকা বালি কোয়ারির অধিকাংশ ইজারা দেয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সমন্বয়ক আ স ম সালেহ সোহেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজনে বালি দরকার। কিন্তু নিয়মনীতি না মেনে বালি তোলায় প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি, ভেঙে যাচ্ছে বিভিন্ন নদ-নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ। তীরবর্তী এলাকার মানুষ ভাঙন আতঙ্কে থাকছেন। বৈধ মহালগুলো থেকে আইন মেনে অযান্ত্রিক পদ্ধতিতে বালি উত্তোলন করলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমে আসবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, প্রতি বছর জেলার মনু ও ধলাই নদে ভাঙনের ফলে ব্যাপক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর মধ্যে নদীর তীরবর্তী মানুষের বাড়িঘর বিভিন্ন স্থাপনা ও ফসলি জমিও রয়েছে। পাউবোর বাঁধের ক্ষতি মিলিয়ে প্রতি বছর ধলাই নদে ৫-৬ কোটি টাকা এবং মনু নদে এর দ্বিগুণ অংকের আর্থিক ক্ষতি হয়।
মৌলভীবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ বিন ওয়ালিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বালি উত্তোলনের কারণে অনেক স্থানে বেড়িবাঁধে ভাঙন এবং তীর রক্ষায় পাকা ব্লক পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বালুমহাল ইজারা না দিতে লিখিত সুপারিশ করেছে পাউবো। বালি উত্তোলন করলেই নদীভাঙন সৃষ্টি হয় না। অপরিকল্পিতভাবে উত্তোলনের কারণে ভাঙন দেখা দেয়। পাউবোর কারিগরি টিমের পরামর্শ নিয়ে বালুমহাল ঘোষণা ও ইজারা দেয়া হলে নদীভাঙন অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব।’