পদ্মা সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল

কুষ্টিয়ার অর্থনীতি ও ব্যবসায় বড় ভূমিকা রাখবে

পদ্ম সেতু চালুর পর পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্যে এক দফা পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

পদ্ম সেতু চালুর পর পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্যে এক দফা পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এরই মধ্যে গড়ে উঠছে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা। পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগের ফলেও আমূল পরিবর্তন হবে। বর্তমানে কুষ্টিয়া থেকে ট্রেনে ঢাকায় যেতে ৮-১০ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে লাগবে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টা। এতে কেবল ব্যক্তি যোগাযোগই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যেও নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

বেনাপোলের ব্যবসায়ী একেএম মতিনুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু দিয়ে ট্রেন চালু হলে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্য সহজে ঢাকা নেয়া যাবে। আবার ঢাকা থেকে পণ্যগুলো অল্প খরচে বেনাপোলে আসতে পারবে। পণ্য পরিবহনে এখন এক ধরনের অস্থিরতা চলছে, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে।’ ট্রেন যোগাযোগ এ অস্থিরতা অনেকাংশে কমিয়ে দেবে তিনি মনে করেন।

ফরিদপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে বলা হতো অবহেলিত জনপদ। পদ্মা সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হলে এ অবস্থা আর থাকবে না। এ অঞ্চলে নতুন নতুন শিল্প-প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে, কর্মসংস্থানের পথও খুলবে।’

সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১ নভেম্বর পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচল শুরু হবে। এদিন খুলনা থেকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও পরদিন ২ নভেম্বর বেনাপোল থেকে বেনাপোল এক্সপ্রেস পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকায় যাওয়ার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পশ্চিম) অসীম কুমার তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ট্রেনের সেবা আরো উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।’ ভালো সেবা কাঙ্ক্ষিত সফলতা এনে দেবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি খুলনা ছাড়ার কথা রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে এবং ঢাকা পৌঁছবে ভোর ৫টা ১০ মিনিটে। খুলনা থেকে ঢাকায় যাওয়ার পথে দৌলতপুর, নওয়াপাড়া, যশোর, মোবারকগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা, পোড়াদহ জংশন, কুষ্টিয়া কোর্ট, রাজবাড়ী, ফরিদপুর এবং ভাঙ্গা স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে থামবে। পরদিন অর্থাৎ ২ নভেম্বর থেকে নতুন রুটে যাত্রা শুরু করবে বেনোপোল এক্সপ্রেস। ওই দিন ট্রেনটি বেনাপোল ছাড়বে দুপুর ১টায় এবং ঢাকা পৌঁছাবে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে। অন্যদিকে ট্রেনটি ঢাকা ছাড়বে রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে এবং বেনাপোল পৌঁছবে সকাল ৭টা ২০ মিনিটে। ঢাকা থেকে খুলনা পর্যন্ত চলা সুন্দরবন এক্সপ্রেস, ঢাকা থেকে বেনাপোল পর্যন্ত চলা বেনাপোল এক্সপ্রেস বঙ্গবন্ধু সেতুর বদলে পদ্মা সেতু হয়ে চলবে। এর পাশাপাশি রাজশাহী থেকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পর্যন্ত মধুমতি এক্সপ্রেস নামে যে ট্রেনটি চলাচল করছে, সেটির চলার পথ বাড়িয়ে ঢাকায় নিয়ে আসা হবে। অর্থাৎ ঢাকা থেকে রাজশাহীর যোগাযোগেও রেলে নতুন একটি পথ চালু করতে যাচ্ছে পদ্মা রেল সেতু। এ তিন রুটের ট্রেন চলাচল পর্যবেক্ষণ করে পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেনের সংখ্যা আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার শাহাদাত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখনো যেহেতু নির্মাণাধীন সব লাইনের কাজ শেষ হয়নি। পুরোপুরি চালু হলে, এ হিসাব আরো পরিমার্জিত ও সহজ হবে। যশোরের চেঙ্গুটিয়া থেকে নড়াইল পর্যন্ত রেল সড়কের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে। সব ঠিক থাকলে আগামী বছর থেকে বেনাপোলের সঙ্গে নড়াইল হয়ে ঢাকায় যাবে ট্রেন। সম্পূর্ণ রেলপথ নির্মাণ না হওয়ায় বিকল্প পথে অর্থাৎ মাওয়া থেকে ফরিদপুর-রাজবাড়ী-পোড়াদহ হয়ে ট্রেন যাবে যশোর। বেনাপোল থেকে ঢাকা যাবে একই পথে। আপাতত পোড়াদহ হয়ে ঢাকা পৌঁছতে সময় একটু বেশি লাগবে। তবে বেনাপোলের সঙ্গে নড়াইল হয়ে ঢাকার রেল যোগাযোগ চালু হলে বদলে যাবে বন্দরের চিত্র। তখন সময় আরো কম লাগবে।’

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার শাহাদাত আলী বলেন, ‘এটা শুধু দূরত্ব কমাতে যাচ্ছে তা নয়, পুরো যোগযোগ ব্যবস্থায়ই আমূল পরির্বতন আনতে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সুবিধা হতে যাচ্ছে পণ্য পরিবহন সেক্টরে। মোট জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের বড় অংশ সাশ্রয় হলে পণ্যের দাম সূত্র ধরেই কমে যাবে।’ এজন্য পরিবহনের পুরো ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ওপর জোর দেন তিনি।

যশোর অঞ্চলের টেকসই কৃষি উন্নয়ন সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক রমেশ চন্দ্র ঘোষ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষিনির্ভর যশোর অঞ্চলের কৃষি খাত আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। যশোর-সাতক্ষীরা অঞ্চলের মাছের পাশাপাশি গদখালী ও ঝিকরগাছার ফুল, বিভিন্ন ধরনের সবজি, নারিকেল ও কাঁঠালসহ কৃষিপণ্য সহজে পৌঁছে যাবে ঢাকায়। দ্রুত কৃষিপণ্য ঢাকায় পৌঁছলে এ অঞ্চলের কৃষক উপকৃত হবেন।’

আরও