গোটা বিশ্বে লো-এন্ড রেঞ্জের বা কম মূল্যের পোশাকের বাজারই বড়। এ ধরনের পণ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রধানতম হলো বাংলাদেশ। তবে বিশ্ববাজারে রফতানি প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে কম মূল্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের তৈরি পোশাকও রফতানি করছেন উদ্যোক্তারা। এক্ষেত্রে ৮০-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশী কাঁচামাল ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্রের মাধ্যমে আমদানি করতে হচ্ছে। এ কারণে উচ্চমূল্যের পোশাক রফতানি করে ৩০ শতাংশ স্থানীয় মূল্যসংযোজন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এসব রফতানিকারক সরকারের নগদ সহায়তা বা প্রণোদনা পাচ্ছেন না। তাতে আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ছে এবং ধীরে ধীরে রফতানি সক্ষমতা হারাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান।
তাই উচ্চমূল্যের পোশাক প্রতি ডজনের ফ্রি অন বোর্ড (এফওবি) মূল্য ৬০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি হলে স্থানীয় মূল্যসংযোজনের হার ২০ শতাংশেই নগদ সহায়তা দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সম্প্রতি অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠি দিয়ে সংগঠনটি এ দাবি জানিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ চিঠির একটি অনুলিপি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছেও পাঠানো হয়েছে। বিজিএমইএ বলছে, তৈরি পোশাক শিল্পের আমদানীকৃত কাঁচামাল ও স্থানীয় কাঁচামালের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তুলার দাম মাত্রাতিরিক্ত বাড়ায় সুতার দাম বেড়েছে ৬০-৭০ শতাংশ। ফ্যাব্রিকসের দাম বেড়েছে ২৫-৩৫ শতাংশ। একইভাবে আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদি বা অ্যাকসেসরিজের দাম বেড়েছে ১৫-২৫ শতাংশ।
এছাড়া পরিবহন ব্যবস্থাও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয়ভাবে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে। মাত্রাতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের নিজ নিজ ব্যাংক থেকে প্রদত্ত ক্রেডিট লিমিট বা কম্পোজিট লিমিটের মধ্যে থেকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাক টু ব্যাক এলসি খুলতে পারছে না।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গত সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সব খাতে নগদ সহায়তা বা রফতানি প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রফতানির বিপরীতে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ দেশীয় মূল্যসংযোজন থাকতে হবে। কিন্তু উচ্চমূল্যের তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বিদেশী ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করতে কোনো কোনো চালানের বিপরীতে ৮০-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশী কাঁচামাল ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে আমদানি করতে হয়। এছাড়া উচ্চমূল্যের তৈরি পোশাকে উন্নত মানের কাঁচামাল ব্যবহার করতে হয়। ক্রেতা নির্ধারিত বিদেশী সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এ কারণে ৩০ শতাংশ দেশীয় মূল্যসংযোজন করা সম্ভব হয় না।
বিজিএমইএ আরো বলছে, বিশ্ববাজারে রফতানি প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ প্রচলিত পণ্যগুলোর পাশাপাশি উচ্চমূল্যে তৈরি পোশাক রফতানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকার থেকে উৎসাহ দেয়ার জন্য নীতিসহায়তা প্রয়োজন। উচ্চমূল্যে তৈরি পোশাকের ডজনপ্রতি এফওবি মূল্য ৬০ ডলার বা তার বেশি হলে রফতানির ক্ষেত্রে স্থানীয় মূলসংযোজন হার ২০ শতাংশ এবং যেসব পোশাকের প্রতি ডজন এফওবি মূল্য ৬০ ডলারের কম, সেক্ষেত্রে মূল্যসংযোজন হার ২৫ শতাংশ করা জরুরি। এ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন সংশোধনেরও অনুরোধ জানায় বিজিএমইএ।
বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি এসএম মান্নান (কচি) বণিক বার্তাকে বলেন, বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য দেশের পোশাক শিল্প-কারখানাগুলো এখন সিনথেটিক ফাইবার থেকে পণ্য উৎপাদনের দিকে নজর বাড়াচ্ছে। এ বিষয়টিই বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যসংযোজিত পণ্য ও নন-কটন টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র করে তুলেছে। তবে এক্ষেত্রে ৮০-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশী কাঁচামাল আমদানি করে এসব পণ্য রফতানির পর ৩০ শতাংশ দেশীয় মূল্যসংযোজন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী রফতানি প্রণোদনা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সব ধরনের পণ্যে ৩০ শতাংশ মূল্যসংযোজন বাধ্যতামূলক। তাই বর্তমানে উচ্চমূল্যের পোশাক রফতানি করে নগদ সহায়তা থেকে বঞ্চিত থাকছেন উদ্যোক্তারা। এতে কারখানাগুলো আর্থিকভাবে সংকটের মধ্যে পড়ছে।
এসব বিষয় নিয়ে গত মার্চে অর্থ বিভাগের মনিটরিং সেলের মহাপরিচালকের সঙ্গে বিজিএমইএর প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সেই বৈঠকের আলোচনার ভিত্তিতে বিজিএমইএ সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছে। সরকার নতুন বাজার তৈরি ও নতুন পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রেও নীতিসহায়তা দিয়ে উচ্চমূল্যের পোশাক রফতানিকে উৎসাহিত করা হবে বলেই মনে করেন তিনি।