যানজট কমিয়ে দ্রুতগতির যোগাযোগ সুবিধা দিতে গত এক দশকে চট্টগ্রাম নগরে নির্মিত হয়েছে একাধিক ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়ে। কিন্তু নির্মাণের পর বারবার নকশা পরিবর্তন, অনাকাঙ্ক্ষিত বাঁক, সিগন্যালবিহীন সংযোগ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা এবং ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণকাজের কারণে এগুলো এখন দুর্ঘটনাপ্রবণ ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোয় পরিণত হয়েছে। শহরের আউটার রিং রোডের অংশে নির্মিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বাকলিয়া-কর্ণফুলী ফ্লাইওভার, দেওয়ানহাট-বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারসহ বেশ কয়েকটি সড়কে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকশায় সমন্বয়হীনতা এবং স্থায়ী ট্রাফিক পরিকল্পনা না থাকা এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ।
নিমতলা এলাকার বন্দর থানার সামনে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ২০ নভেম্বর একটি প্রাইভেট কার ছিটকে নিচে পড়ে যায়। এতে মোহাম্মদ শফিক নামে এক ব্যক্তি চাপা পড়ে প্রাণ হারান। আহত হন প্রাইভেট কারের চালকসহ পাঁচজন। মূলত অতিরিক্ত গতির কারণে গাড়িটি এক্সপ্রেসওয়ের রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে যায়। এর আগেও একাধিক মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এক্সপ্রেসওয়েতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণের সময় সঠিক ট্রাফিক জরিপ না করা, প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঝপথে নকশা পরিবর্তন এবং সংযোগ পয়েন্টগুলোয় পর্যাপ্ত জায়গা না থাকার কারণে ফ্লাইওভার ও এক্সপ্রেসওয়েতে অস্বাভাবিক বাঁক তৈরি হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে যা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে নকশা তদন্ত, সড়কের বাঁক সংশোধন, গার্ডরেল-গাইডলাইন বৃদ্ধিসহ গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি চালকদের সতর্ক করতে সাইনেজ, ক্যামেরা নজরদারি এবং রাতের আলোকায়ন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
চট্টগ্রাম নগরীর প্রথম উড়াল সড়ক বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার। এটি নির্মাণকালে বড় দুটি দুর্ঘটনা ঘটে। প্রথমবার একটি গার্ডার সড়কে ভেঙে পড়ে, তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পরবর্তী সময়ে এ ফ্লাইওভারের একটি গার্ডার পড়ে একসঙ্গে ১৩ জন নিহত ও অনেক মানুষ আহত হয়েছিল। ফ্লাইওভারটি নির্মাণ শেষে এতে কালুরঘাটমুখী একটি র্যাম্প সংযোগ দেয়া হয়। এরপর সব ধরনের যানবাহন চলাচল করলেও পিলারে ফাটলের পর থেকে হালকা যানবাহন ওঠা-নামার জন্য সেটি ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ চট্টগ্রামের প্রথম গণফ্লাইওভারের র্যাম্প সংযোগ নিয়ে নির্মাণ ও পরিচালনাকারী সংস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনো শেষ হয়নি।
নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে, একটি লেন হঠাৎ সরু হয়ে যাওয়া, বাঁক বা ঢালুপথে যথেষ্ট নির্দেশনা না থাকা এবং প্রয়োজনীয় গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুপস্থিত। ফলে দ্রুতগামী মোটরসাইকেল-প্রাইভেট কারের পাশাপাশি ভারী যানবাহনেরও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা বাড়ছে বলে পরিবহনচালক ও বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ।
চট্টগ্রামের সব ফ্লাইওভার নির্মাণ করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সবক’টি নির্মাণের ক্ষেত্রেই ত্রুটিপূর্ণ নকশার প্রমাণ পেয়েছে ট্রাফিক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রামের বটতলী রেলওয়ে স্টেশন থেকে ধনিয়ালাপাড়া পর্যন্ত নির্মিত ফ্লাইওভারেও রয়েছে নানা অপরিকল্পনার ছাপ। দুই লেনের ফ্লাইওভার হওয়ার কারণে দ্রুতগতিতে আসা যানবাহন ওভারটেকিং করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। একইভাবে ধনিয়ালাপাড়া থেকে ডিটি রোডের (ঢাকা ট্র্যাঙ্ক রোড) ওপর নির্মিত ওভারপাসটিও বিভাজকহীন দুই লেনের হওয়ায় তীব্র যানজট ও ওভারটেকিংয়ের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের শুলকবহর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত মুরাদপুর ফ্লাইওভার (পুরনো আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার) এখন যানবাহনের জন্য এক ঝুঁকিপূর্ণ পথে পরিণত হয়েছে। নির্মাণ শেষে এবং পরবর্তী সময়ে নকশা পরিবর্তনের কারণে ফ্লাইওভারটিতে এমন সব র্যাম্প যুক্ত করা হয়েছে, যা যানবাহনের ভারসাম্য ও নিরাপত্তাকে চরমভাবে বিঘ্নিত করছে। নির্মাণের পর ২ নম্বর গেট এলাকায় হঠাৎ একটি র্যাম্প নামানো হয়, যা মূল নকশায় ছিল না। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় র্যাম্পটি নির্মাণ করা হয়েছে অস্বাভাবিক উঁচুতে। এতে দ্রুতগতিতে চলা যানবাহন প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারায়।
লালখান বাজার প্রান্তে এ ফ্লাইওভারকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয় পরবর্তী সময়ে। একইভাবে জিইসি মোড় এলাকা থেকে একটি নতুন র্যাম্প মুরাদপুর ফ্লাইওভারের সঙ্গে সংযুক্ত করে এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযোগ দেয়া হচ্ছে। এসব নকশাবহির্ভূত র্যাম্প সংযোগের কারণে যানবাহনের গতিপথে হঠাৎ বাঁক, উঁচু-নিচুর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরো বাড়ছে।
জানতে চাইলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফ্লাইওভার নির্মাণের পর সেখানে নানা নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা রাখা হয়। নির্ধারিত গতির চেয়েও বেশি গতিতে যানবাহন চালানো হলে দুর্ঘটনা ঘটবেই। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ঘটা অধিকাংশ দুর্ঘটনাই মাত্রাতিরিক্ত গতিবেগের কারণে হয়েছে। এজন্য চালকদের যানবাহন চালানোর সময় সতর্কতা ও নির্দেশনা প্রতিপালন করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। প্রকল্পের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও পরবর্তী সময়ে নেয়া র্যাম্পগুলোর নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পের সার্বিক কাজ সম্পন্ন হলে গতিসীমাসহ পূর্ণাঙ্গ তদারকি ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে। এক্সপ্রেসওয়ের কয়েকটি বাঁক থাকলেও সেটি ঝুঁকিপূর্ণ নয়। দুর্ঘটনা এড়াতে বাঁকের আগে গতি নিয়ন্ত্রণাদেশ, শক্তিশালী ব্যারিয়ার দেয়া হয়েছে।’ উড়াল সড়ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়মের মধ্যে থেকে নির্দিষ্ট গতিতে যানবাহন চালানো উচিত বলে মনে করেন এ প্রকৌশলী।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শেষ হলে এটি বহদ্দারহাট কিংবা ২ নম্বর গেট এলাকা থেকে সরাসরি পতেঙ্গায় গিয়ে থামবে। মূলত মুরাদপুর ফ্লাইওভারের সঙ্গে সংযোগ হওয়ার কারণে ১৫ কিলোমিটারের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দূরত্ব বেড়ে হবে ২১ কিলোমিটার। দীর্ঘ এ উড়ালপথ টোল দিয়ে চলাচলের কারণে এখনো যানবাহনের হার অনেক কম। ২০২৫ সালে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে দৈনিক গড়ে ৩৯ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচলের প্রাক্কলন করা হয়েছিল। বর্তমানে চলছে মাত্র আট হাজারের কিছু বেশি যানবাহন। তুলনামূলক কম ব্যবহারের কারণে যানবাহনের গতিবেগ অনেক বেশি থাকে। তাছাড়া শতভাগ কাজ শেষ না করেও উন্মুক্ত করে দেয়ায় গতি নিয়ন্ত্রণাদেশ ও বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সীমিত। এ কারণে এখনই ব্যবস্থা নেয়া না হলে চট্টগ্রামের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ ফ্লাইওভারগুলোয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এ বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারগুলোর একটিও পূর্ণাঙ্গ কোনো সমীক্ষা এবং দেশের যানবাহনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নকশায় করা হয়নি। নির্মাণ চলাকালে কিংবা নির্মাণের পর দফায় দফায় নকশায় পরিবর্তনের মাধ্যমে এক প্রকার অদক্ষতারই প্রমাণ দিয়েছে নির্মাণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। যানবাহন চলাচলের প্রয়োজনে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে জানমালের নিরাপত্তার কথা সবার আগেই বিবেচনায় নিতে হয়। কিন্তু এলিভেটেডে এক্সপ্রেসওয়ের মতো দ্রুতগতির একটি উড়াল সড়কের অস্বাভাবিক বাঁক কোনোভাবেই কাম্য নয়। দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য যতই প্রতিবন্ধক দেয়া হোক না কেন এ ধরনের আঁকাবাঁকা উড়াল সড়ক যানবাহনচালকদের দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে ফেলবেই।’
৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটির মূল অংশের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৩ সালে। এতে রয়েছে ছোট-বড় একাধিক বাঁক। তবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে বারিক বিল্ডিং মোড়, সিইপিজেড মোড় ও কাঠগড় এলাকায়। চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে প্রধান কয়েকটি বাঁক ছাড়াও সল্টগোলা ও দেওয়ানহাট এলাকার অংশেও বাঁক রয়েছে। প্রায় ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের এ সড়ক দিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সিডিএ অর্ধবৃত্তাকার পদ্ধতিতে বাঁক কমানোর চেষ্টা করলেও সেটি পর্যাপ্ত নয়। কেননা চূড়ান্ত কাজ শেষ হওয়ার পর যানবাহন বাড়লে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বাঁকগুলোয় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। এজন্য নিরাপত্তার স্বার্থে ডিজিটাল ট্রাফিক সিস্টেমসহ নানামুখী তদারকি পদ্ধতি প্রয়োগ জরুরি বলে মনে করছেন যোগাযোগসংশ্লিষ্টরা।