ঢাকায় সবজির দৈনিক বিক্রি প্রায় ৭ লাখ কেজি ও মাছ ৯০ হাজার কেজি

সবজিতে শীর্ষে কারওয়ান বাজার, মাছে যাত্রাবাড়ী

ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ—বৃহত্তর ঢাকার এ চার সিটি করপোরেশনে কয়েক কোটি মানুষের বসবাস। উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানসহ নানা কারণে রাজধানীমুখী মানুষের হার দিন দিন বাড়ছে। যদিও এসব এলাকায় খাদ্য উৎপাদন খুব বেশি নয়। সবজি ও মাছসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের প্রায় পুরোটাই আসে অন্যান্য জেলা থেকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে বলা

ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ—বৃহত্তর ঢাকার এ চার সিটি করপোরেশনে কয়েক কোটি মানুষের বসবাস। উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানসহ নানা কারণে রাজধানীমুখী মানুষের হার দিন দিন বাড়ছে। যদিও এসব এলাকায় খাদ্য উৎপাদন খুব বেশি নয়। সবজি ও মাছসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের প্রায় পুরোটাই আসে অন্যান্য জেলা থেকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার সিটি করপোরেশন এলাকার ১১টি প্রধান পাইকারি বাজারে দৈনিক ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৩ কেজি সবজি বেচাকেনা হয়। এর বাইরের বিভিন্ন উৎস মিলিয়ে বৃহত্তর ঢাকার বাজারগুলোয় দৈনিক সবজি বিক্রি হয় প্রায় ৭ লাখ কেজি। আর মাছ বিক্রি হয় ৯০ হাজার ৫৪০ কেজির মতো। 

রাজধানীকেন্দ্রিক মানুষের চাহিদা মেটাতে মূলত এ ১১টি পাইকারি বাজার হয়েই সবজি ও মাছ বিভিন্ন খুচরা বাজারে যায়। ঢাকায় সবজির চালান আসে ৫৯টি জেলা থেকে। কৃষকের উৎপাদিত এসব পণ্য কয়েক হাত ঘুরে ঢাকার ভোক্তাদের হাতে আসে। এ কারণে কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি থাকলে দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দাম অনেকটা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব। এছাড়া কৃষককে সরাসরি ঢাকার বাজারে বিক্রির জন্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দেয়া হলে তারাও ন্যায্যমূল্য পাবেন। 

এফএওর ‘ঢাকা আরবান ফুড সিস্টেম ২০২৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বৃহত্তর ঢাকার চার সিটি করপোরেশনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সবজির কেনাবেচা হয় কারওয়ান বাজারে। প্রায় ৫৮ শতাংশই বা দৈনিক ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫০ কেজি সরবরাহ হয় এ বাজার থেকে। এরপর মিরপুরের শাহ আলী মাজার পাইকারি বাজারে বেচা-বিক্রি হয় ১ লাখ ২ হাজার ৮১০ কেজি সবজি। এছাড়া শ্যামবাজারে দৈনিক ৫০ হাজার ৭৫০ কেজি, রায়েরবাজার সাদেক খান কৃষি মার্কেটে ১৬ হাজার কেজি, যাত্রাবাড়ী বাজারে ২৮ হাজার ৭০০ কেজি, সোয়ারীঘাট আড়তে ৭ হাজার ৪০০ কেজি, নারায়ণগঞ্জের দ্বিগুবাবুর বাজারে ১৯ হাজার কেজি, গাজীপুরের ভোগড়া আড়তে ৪ হাজার ৪০০ কেজি, বাইপাইল নতুন বাজারে ৫২ হাজার ৯০৩ কেজি ও চৌরাস্তা বাজারে ৭ হাজার ৪০০ কেজি সবজি হাতবদল হয়। 

বিভিন্ন সবজির ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ে কৃষক যে টাকায় বিক্রি করছেন তার চেয়ে প্রায় দুই-তিন গুণ বেশি দামে ঢাকার খুচরা বাজারগুলো থেকে কিনতে হয় ভোক্তাদের। এক্ষেত্রে পাইকারিতেই সবচেয়ে বেশি দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। যদিও বিভিন্ন পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কৃষকের কাছ থেকে সবজি কেনার পর পরিবহন খরচ ও বিভিন্ন স্থানে ধাপে ধাপে চাঁদা দিতে গিয়ে তাদের খরচ বেশি পড়ে যায়। ফলে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করতে হয় তাদের। 

বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি মো. ইমরান মাস্টার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বছর সবজির দাম কৃষক পর্যায়েই বেশি। কারণ সরবরাহ তুলনামূলক কম। বৃষ্টি ও ঘন কুয়াশার কারণে অনেকের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে তারা বাড়তি দামে বিক্রি করে ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছেন। আবার ঢাকায় আনার পর কিছু সবজি নষ্ট হয়। এছাড়া পরিবহনসহ নানা ধরনের খরচ রয়েছে। ফলে পাইকারি বিক্রেতারা খুব বেশি লাভ করতে পারেন না।’ 

বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে কৃষক যেন সরাসরি ঢাকার বাজারে তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারেন সে ব্যবস্থা রাখার তাগিদ দিয়েছেন কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের সরবরাহ চেইনে বিশেষ করে সবজির ক্ষেত্রে বড় ধরনের অপচয় হয়। কারওয়ান বাজারে গেলে দেখা যায়, অনেক সবজি নষ্ট হয়। আবার ব্যবসায়ীরা দাম ধরে রাখার জন্য কিছু সবজি নষ্ট করতেও দ্বিধাবোধ করেন না। বাজারগুলোকে বিকেন্দ্রীকরণের একটি উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ঢাকার বাজার ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করা দরকার। বিভিন্ন জায়গায় সবজি উৎপাদনের জোন রয়েছে। যারা উৎপাদন করে তাদের সরাসরি বাজারে থাকার ব্যবস্থা করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমবে, ভোক্তা কম দামে কিনতে পারবে এবং কৃষকও ভালো দাম পাবেন।’

দেশের ২০ জেলা থেকে ঢাকায় মাছের সরবরাহ হয়। পাইকারি বাজারগুলোর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি কেনাবেচা হয় কেবল যাত্রাবাড়ীতেই। সেখানে দৈনিক ৫১ হাজার ১৫০ কেজি মাছ হাতবদল হয়। এছাড়া সোয়ারীঘাট আড়তে ১১ হাজার ৪০০ কেজি, কারওয়ান বাজারে ৫ হাজার ৭০০ কেজি, গাজীপুরের কোনাবাড়ী বাজারে ১ হাজার কেজি, বাইপাইল নতুন বাজারে ৯ হাজার ১৯০ কেজি ও চৌরাস্তা বাজারে ১২ হাজার ১০০ কেজি মাছ বিক্রি হয়। 

রামপুরার মাছ ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা পাইকারি আড়ত থেকে কিনে আনি। মাছের মূল্যবৃদ্ধি বা হ্রাস মূলত নির্ভর করে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর। সাধারণত যেদিন যে মাছের সরবরাহ বেশি থাকে তার দাম আড়তে কমে যায়। আর সরবরাহ কম থাকলে দাম বেড়ে যায়।’ 

সার্বিক বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজার ব্যবস্থাপনাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। ঢাকার চারপাশে বা প্রান্তে বড় বাজার তৈরির মাধ্যমে কৃষিপণ্য সরবরাহ করা গেলে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা তৈরি করা সম্ভব হবে। তখন শুধু কারওয়ান বাজার বা যাত্রাবাড়ীর ওপর ভরসা করতে হবে না। এতে আশপাশের জেলাগুলোর কৃষকরা সরাসরি বাজারে অংশ নিতে পারবেন। দামও অনেকটা কমে আসবে।’

আরও