মেট্রো কর্তৃপক্ষের কাছে নেই বাড়তি বিয়ারিং প্যাড, দুর্ঘটনা ঘটলে প্রতিস্থাপন নিয়ে শঙ্কা

গত ২৬ অক্টোবর ফার্মগেটে মেট্রোরেলের পিলার থেকে একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়লে নিহত হন পথচারী আবুল কালাম। এ ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাবার ও স্টিলের তৈরি এ বিশেষ বস্তুটি।

গত ২৬ অক্টোবর ফার্মগেটে মেট্রোরেলের পিলার থেকে একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়লে নিহত হন পথচারী আবুল কালাম। এ ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাবার ও স্টিলের তৈরি এ বিশেষ বস্তুটি। মেট্রোরেলের প্রতিটি পিলারে আছে চারটি করে বিয়ারিং প্যাড। গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ হলেও মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের কাছে অতিরিক্ত কোনো বিয়ারিং প্যাড নেই। অর্থাৎ এ মুহূর্তে দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো কারণে যদি বিয়ারিং প্যাড পরিবর্তন বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়, তাহলে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের কিছুই করার থাকবে না। গতকাল উত্তরার দিয়াবাড়ির মেট্রোরেল কার্যালয়ে পেশাদার সাংবাদিকদের রিপোর্টার্স ফর রেল অ্যান্ড রোডের (আরআরআর) সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘‌দুর্ঘটনার পর মেট্রোরেলের সব বিয়ারিং প্যাড ফিজিক্যালি পরীক্ষা করা হয়েছে। এ সময় কিছু প্রাথমিক কাজ করা হয়েছে। কিছু বিয়ারিং প্যাডে বন্ধনী দেয়া হয়েছে, যেন সেগুলো সরে না যায়। এখন কিছু স্থায়ী কাজ করা দরকার। বিয়ারিং প্যাডগুলো ঠিক অবস্থায় আছে কিনা, তা জানতে আমরা ফাংশনাল টেস্ট করতে চাই। এ টেস্টের সময় বিয়ারিং প্যাড পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আমাদের হাতে এখন কোনো বিয়ারিং প্যাড নেই, যে কারণে ফাংশনাল টেস্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার কোনো জায়গায় রিপ্লেসমেন্টের প্রয়োজন হলেও ডিরেক্টলি সেটা আমরা করতে পারব না।’

মেট্রোরেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরো বলেন, ‘‌আমাদের কন্ট্রাক্টস ডকুমেন্টে কোথাও লেখা ছিল না, স্পেয়ার হিসেবে বিয়ারিং রাখতে হবে। পরামর্শকরা এটা কোনো কারণে মিস করে গেছেন অথবা লেখেননি। স্পেয়ার ছাড়া কোনো জিনিস লাগানো হয়েছে এমন উদাহরণ পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যাবে না।’

সেক্ষেত্রে ফার্মগেটের দুর্ঘটনার পর কীভাবে বিয়ারিং প্যাড সংগ্রহ করা হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মতিঝিল-কমলাপুর অংশের সম্প্রসারণকাজের জন্য ঠিকাদারের কাছে বিয়ারিং প্যাড ছিল। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে ফার্মগেটে বসিয়েছি।’

সম্প্রতি মেট্রোরেলের জন্য বিয়ারিং প্যাড কেনার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ২০টি বিয়ারিং প্যাড কেনার কার্যাদেশ দেয়ার কথা জানিয়ে ফারুক আহমেদ বলেন, ‘‌‌আগামী বছরের জানুয়ারিতে বিয়ারিং প্যাডগুলো আমাদের হাতে আসবে।’ গত ২৬ অক্টোবর মেট্রোরেলের ফার্মগেটের ৪৩৩ নম্বর পিলার থেকে মোট দুটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়েছিল। যার একটি পড়ে পথচারী আবুল কালামের মাথায়। খুলে পড়া অন্য বিয়ারিং প্যাডটির হদিস এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা।

প্রসঙ্গত, মেট্রোরেলে (মতিঝিল থেকে উত্তরা পর্যন্ত) মোট পিলার আছে ৬২০টি। প্রতিটি পিলারে চারটি করে মোট ২ হাজার ৪৮০টি বিয়ারিং প্যাড বসানো আছে।

তদন্ত কমিটির মেয়াদ বৃদ্ধি: বিয়ারিং প্যাড দুর্ঘটনার পর সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, এ কমিটির মেয়াদ ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া কমিটিতে আরো তিনজন নতুন বিশেষজ্ঞ যুক্ত হয়েছেন।

ফারুক আহমেদ বলেন, ‘‌দুর্ঘটনার পর আমরা ফিজিক্যালি সব বিয়ারিং প্যাড পরীক্ষা করেছি। পরীক্ষায় যেগুলো আমাদের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে, সেগুলোতে ‌বন্ধনী দেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১০টি বন্ধনী দিয়েছি। যেসব বিয়ারিংয়ে বন্ধনী দেয়া প্রয়োজন হবে, ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে তার সবগুলোতেই দিতে পারব।’

মতবিনিময় সভায় তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেন তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য ডিএমটিসিএলের লাইন-৬-এর প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব। তিনি বলেন, ‘‌আমরা চার-পাঁচটা সম্ভাব্য কারণ নিয়ে কাজ করছি। এখানে নকশাগত ত্রুটি থাকতে পারে। এছাড়া বিয়ারিং প্যাডে কোনো অসংগতি থাকতে পারে। নাশকতার মতো বিষয়ও আমরা উড়িয়ে দিচ্ছি না।’

নিহত কালামের স্ত্রী মেট্রোরেলে চাকরি পাচ্ছেন: বিয়ারিং প্যাড দুর্ঘটনায় নিহত পথচারী আবুল কালামের স্ত্রী আইরিন আক্তার পিয়াকে ডিএমটিসিএলে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিহতের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। আমরা নিহতের স্ত্রীকে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের এ সিদ্ধান্তে তিনি (আইরিন আক্তার) রাজি আছেন। চাকরি দেয়ার জন্য আমরা প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করছি।’

আরও