মনু নদের উৎস ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা থেকে। ১৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ নদের ৭৪ কিলোমিটার পড়েছে বাংলাদেশে। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়ন দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদরের ৭৪ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে কুশিয়ারা নদীর সঙ্গে মিশেছে। মূলত গ্রীষ্ম মৌসুমে নদে তেমন পানি থাকে না। বর্ষায় উজানের ঢলে খরস্রোতা হয়ে ওঠে নদটি। তখন আশপাশের অঞ্চলে দেখা দেয় বন্যা। প্লাবিত হয় নিম্নাঞ্চল। বন্যা প্রতিরোধে ২০২০ সালে ৯৯৬ কোটি ২৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এরপর দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৫৩ শতাংশ।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার কারণেই মূলত প্রকল্পের অগ্রগতি কম হচ্ছে। এছাড়া ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বাধার কারণে কয়েকটি স্থানে কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে প্রকল্পটি যথাসময়ে বাস্তবায়ন না হওয়ায় জনমনে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। বর্ষায় আবারো বন্যার আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বর্ষা এলেই রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলার মানুষ বন্যা আতঙ্কে থাকেন। উজান থেকে নেমে আসা ঢলে নদের বাঁধের কোথাও না কোথাও ভাঙন দেখা দেয়। বছরের পর বছর ধরে বন্যা প্রতিরোধে স্থায়ী সমাধানের দাবি তুলে আসছেন এলাকার মানুষ। ২০১৮ সালে মৌলভীবাজারে দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা। শহরের বড়হাট এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় পশ্চিমাঞ্চল।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, বন্যার কবল থেকে শহর ও মনু নদপারের জনপদ রক্ষা করতে আবারো জোরালো হয় স্থায়ী সমাধানের দাবি। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাউবো মনু নদের ভাঙন থেকে মৌলভীবাজার জেলা সদর, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলা রক্ষা প্রকল্প হাতে নেয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০২০ সালের জুনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পায়। ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৯৬ কোটি ২৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এটিই প্রথম মনু নদের বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সবচেয়ে বড় প্রকল্প।
বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে পলিমাটিতে নদীর তলদেশের অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে। অনেক স্থানে চর জেগে উঠেছে। শুষ্ক মৌসুমে প্রায় শুকিয়ে যায় নদ। আর বর্ষায় পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণে নদটি পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মনু নদের পাড় ভাঙা ও বন্যা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮৪ সালে মৌলভীবাজার শহরে ভয়াবহ বন্যায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে সৃষ্ট বন্যা ছিল সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এরই মধ্যে ৭২টি প্যাকেজের ৭১টির কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ১৫টি প্যাকেজের কাজ চলমান। জেলার তিনটি উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হবে। প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৩০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ বাঁধ (সিসি ব্লকের প্রতিরক্ষা কাজ) শহরের পশ্চিমাঞ্চলে আড়াই কিলোমিটার নতুন ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ, শহরের বিদ্যমান ৭৬৫ মিটার পুরনো ফ্লাড ওয়াল পুনর্বাসন ও উঁচু করা, ৮৬ কিলোমিটার পুরনো বাঁধ পুনর্বাসন, ৩৫টি স্থানে ১২ দশমিক ১১ কিলোমিটার চর অপসারণ ও ২২৮ একর জমি অধিগ্রহণ। এর মধ্যে ৩০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ বাঁধের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। নতুন ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ ও পুনর্বাসন কাজে ব্যয় হবে ৪০ কোটি এবং ৮৬ কিলোমিটার পুরনো বাঁধ পুনর্বাসনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯০ কোটি টাকা। প্রকল্পের বাকি টাকা ব্যয় হবে চর অপসারণসহ অন্যান্য কাজে। ২০২৩ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে দুই দফায় দুই বছর সময় বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। বর্ধিত মেয়াদেও কাজ শেষ না হওয়ায় আরো এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৫৩ শতাংশ। গত বছর এ সময়ে ছিল ৪৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে এক বছরে কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৬ শতাংশ। এর মধ্যে ৩০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ বাঁধের কাজ হয়েছে ৪১ শতাংশ, ৮৬ কিলোমিটার পুরনো বাঁধ পুনর্বাসনের কাজ হয়েছে ৪৩ শতাংশ, ফ্লাড ওয়াল নির্মাণকাজের অগ্রগতি হয়েছে ১৫ শতাংশ ও চর অপসারণ কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৫৫ শতাংশ।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্পটি অনুমোদনের খবরে তাদের মাঝে আশার আলো সঞ্চারিত হয়। কিন্তু কাজের ধীরগতি এখন শঙ্কা তৈরি করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এক লাখ হেক্টর ফসলি জমি বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাবে। প্রায় দেড় লাখ মানুষ নদীভাঙনের ঝুঁকিমুক্ত হবে। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বাঁধ ভেঙে বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে।
সার্বিক বিষয়ে পাউবো মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ বিন ওয়ালিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন জটিলতার মুখে পড়ছি। জমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসনে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। এছাড়া কুলাউড়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় বিএসএফের বাধার কারণে তিনটি প্যাকেজের কাজ বন্ধ রয়েছে। বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানে এবং সমাধানের চেষ্টা চলছে।’