নওগাঁর মান্দায় দেলুয়াবাড়ী হাটে সিন্ডিকেট করে অর্ধেক দামে দুধ কেনার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। হাটে কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ীর একক আধিপত্য বিস্তারে প্রতি বছর অন্তত সাড়ে ৪ কোটি টাকা লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সেখানকার দুগ্ধ খামারিরা। লোকসানের মুখে বন্ধ হতে বসেছে একের পর এক ডেইরি ফার্ম। খামারিদের টিকিয়ে রাখতে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় খামারিরা।
ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, মান্দা উপজেলায় সহস্রাধিক খামারে ১৬ হাজার ৭৭৫টি দুগ্ধ উৎপাদনকারী গাভী রয়েছে। যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ২৫ হাজার লিটার দুধ উৎপাদন হয়। উপজেলার বৃহত্তর দুধ কেনাবেচার হাট দেলুয়াবাড়ীতে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার লিটার দুধ কেনাবেচা হয়।
খামারিদের অভিযোগ, দেলুয়াবাড়ী হাটে বাইরের ব্যবসায়ীদের ঢুকতে দেন না স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তারাই সিন্ডিকেট করে প্রতিদিনের দুধের দাম নির্ধারণ করেন। প্রতি লিটার দুধ অর্ধেক দামে বিক্রি করতে খামারিদের বাধ্য করা হয়। এভাবে প্রতিদিন ওই হাটে আমদানি হওয়া গড়ে পাঁচ হাজার লিটার দুধের লভ্যাংশ থেকে অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বঞ্চিত করা হয় খামারিদের। বছর শেষে যার পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা।
মান্দা উপজেলার নুরুল্ল্যাবাদ ইউনিয়নের চকভোলাই গ্রামের খামারি ওসমান আলী নিজের পরিশ্রম ও মেধা কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছিলেন অর্ধ কোটি টাকার দুগ্ধ খামার। ইচ্ছা ছিল আয় করবেন কোটি টাকা। তবে তিন বছরের ব্যবধানে দফায় দফায় পশুখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়া এবং দুধের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তিনি এখন ঋণগ্রস্ত।
দুরবস্থার কারণ জানতে চাইলে ওসমান আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২৮টি গাভীর মধ্যে খামারে বর্তমানে ১৬টি গাভী অবশিষ্ট আছে। গাভীগুলোকে খাওয়ানোর মতো টাকা পকেটে নেই। দানাদার খাদ্যের দোকানে বকেয়া জমা পড়েছে ১০ লাখ টাকা। প্রতিদিন আটটি গাভী থেকে উৎপাদিত তিন মণ দুধ বাজারে বিক্রি করতে গেলে ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা প্রত্যেক খামারি পথের ফকির হয়ে যাব। কেউ-ই টিকে থাকতে পারব না। খামারিদের টিকিয়ে রাখতে দুধের বাজারে প্রশাসনের নিয়মিত বাজার মনিটরিং প্রয়োজন।’
শুধু ওসমান আলীই নন, মান্দা উপজেলার অনেক দুগ্ধ খামারিই এখন ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। যারা কয়েক বছর আগেও সফল খামারিদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে দুগ্ধ খামার গড়ে তুলেছিলেন। তবে দুধ উৎপাদনের পর বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে উৎপাদন খরচই তুলতে পারেনি তারা। বিষয়টি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারাও। খামারিদের এ দুরবস্থার জন্য মূলত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকেই দায়ী করছেন তারা।
নুরুল্লাবাদ ইউনিয়নের গুডাংগি গ্রামের খামারি ওমর ফারুক বলেন, ‘কয়েক বছর আগে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে খামার গড়ে তুলেছিলাম। ভেবেছিলাম দুধ বিক্রি করে ঋণের টাকা পরিশোধ করব। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। দফায় দফায় দুধের দাম কমায় পাঁচটি গাভীর মধ্যে দুটি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। এখন খামারে অবশিষ্ট তিনটি গাভী থেকে দৈনিক ৭৫ লিটার দুধ উৎপাদন করতে কমপক্ষে ২ হাজার ৪০০ টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ এ দুধ দেলুয়াবাড়ী হাটে বিক্রির সময় পাচ্ছি মাত্র ২ হাজার ২৫০ টাকা। বাজারে ইচ্ছামতো দাম কমিয়ে দুধ কিনছে সেখানকার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সদস্যরা।’
কুসুম্বা ইউনিয়নের চকগোপাল গ্রামের খামারি মেহেদী হাসান বলেন, ‘চারটি গাভীর প্রত্যেকটিকে দৈনিক ৬০০ টাকার দানাদার খাবার খাইয়ে গড়ে ১৫ লিটার করে দুধ পাচ্ছি। এ দুধ ৪৫০ টাকায় বিক্রি করার পর প্রতিটা গাভীতে দৈনিক কমপক্ষে ১৫০ টাকা করে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। এভাবে চারটি গাভীতে প্রতি মাসে কমপক্ষে ১৮ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। দুধের হাটে সিন্ডিকেটের কারণে আমি এখন পথে বসার উপক্রম। তাই বাধ্য হয়ে খামারের সব গরু বিক্রি করে অন্য ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
উপজেলা ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফজলে নূর বলেন, ‘আমার সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে শত শত বেকার যুবক ঋণ নিয়ে গরুর খামার গড়ে তুলেছে। দুধ বিক্রির টাকায় ঋণ পরিশোধের স্বপ্ন দেখেছিল তারা। কিন্তু তাদের সেই আশা এখন হতাশায় রূপ নিয়েছে। দেলুবাড়ী হাটে সিন্ডিকেট করে দৈনিক অর্ধেক দামে দুধ কিনছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। প্রতি বছর অন্তত সাড়ে ৪ কোটি টাকা লাভ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে খামারিদের। উপজেলা প্রশাসনকে বহুবার জানালেও তারা ব্যবস্থা নেয়নি।’
উপজেলা ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি চন্দন কুমার বলেন, ‘গত তিন বছরে দফায় দফায় পশুখাদ্যের দাম বাড়লেও দেলুয়াবাড়ী বাজারে দুধের দাম বাড়েনি। উল্টো খামারিদের চাপে ফেলে কম দামে দুধ কেনেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। তাদের সিন্ডিকেটে এখন অনেক খামারি পথে বসবার উপক্রম। সেখানে বাজার মনিটরিংয়ে প্রশাসন কখনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। তাই বাধ্য হয়ে মাঝেমধ্যেই সড়কে দুধ ঢেলে নীরব প্রতিবাদ জানান খামারিরা। এ সিন্ডিকেট রুখে দিতে হলে মহাসড়কসংলগ্ন স্থানে দুধের হাট স্থানান্তর করে বাইরের ব্যবসায়ীদের আসার সুযোগ দিতে হবে। সে সঙ্গে মিল্ক প্রসেসিং সেন্টার নির্মাণ করা হলে এ অঞ্চলের প্রত্যেক খামারি ন্যায্য দাম পাবেন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবসায়ী রঞ্চিত কুমার দাস বলেন, ‘দেলুয়াবাড়ী হাটে সময়ে-অসময়ে চাহিদার তুলনায় অধিক পরিমাণ দুধ আমদানি বেড়েই চলেছে। এছাড়া খামারিরা ওজনে সবসময়ই প্রতারণার আশ্রয় নেন। মূলত এ দুটি কারণেই খামারিদের থেকে কম দামে দুধ কিনতে হয়। চাহিদার বাইরে যেটুকু দুধ কিনি সেটা বেশির ভাগ সময়ই নষ্ট হয়।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. বেনজির আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেলুয়াবাড়ী বাজারে দুধের দামে কারসাজির বিষয়ে আমরা সত্যতা পেয়েছি। সেখানে খামারিদের দুধের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তাই হাটের জায়গাটি মহাসড়কসংলগ্ন স্থানে স্থানান্তর করে সেখানে বড় পরিসরে দুধের হাট বসানোর পরিকল্পনা এরই মধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে।’