কাশ্মীরি পণ্ডিত রামেশ্বর নাথ কাও

স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে বিজয়ের মাসজুড়েই স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন প্রেক্ষিত সম্পর্কে নানা আয়োজন থাকছে বণিক বার্তায়। আজকের উপস্থাপনাটি আরএন কাওয়ের ভূমিকা নিয়ে—

স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ। উপলক্ষে বিজয়ের মাসজুড়েই স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন প্রেক্ষিত সম্পর্কে নানা আয়োজন থাকছে বণিক বার্তায়। আজকের উপস্থাপনাটি আরএন কাওয়ের ভূমিকা নিয়ে 

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের () প্রতিষ্ঠাতা প্রধান রামেশ্বর নাথ কাও (আরএন কাও) জাতিতে তিনি ছিলেন একজন কাশ্মীরি পণ্ডিত। জম্মু কাশ্মীরের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বরাবরই বেশ নাজুক অবস্থানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এর পরও ভারতের রাজনীতি থেকে শুরু করে বিনোদন জগৎ পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে সাফল্যের ছাপ রেখেছেন তারা। তবে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি নাম জওহরলাল নেহরু তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী। এরা দুজনেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

দুজনের আমলেই ভারতের নিরাপত্তা পররাষ্ট্র ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন আরএন কাও। উত্তর প্রদেশের বারানসিতে জন্মগ্রহণকারী আরএন কাওয়ের পরিবারের শেকড় ছিল কাশ্মীর উপত্যকার শ্রীনগর জেলায়। চাচার কাছে মানুষ হওয়া রামেশ্বর নাথ স্নাতক স্নাতকোত্তর করেছেন লক্ষ্ণৌ  এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটি থেকে। ১৯৪০ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইন্ডিয়ান ইমপেরিয়াল পুলিশে যোগ দেন আরএন কাও।

দেশভাগের সময় ভারতীয় পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগকে (আইবি) ঢেলে সাজানো হয়। ওই সময় আরএন কাওকেও পোস্টিং দেয়া হয় আইবিতে। সেখানে ভিআইপিদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করতেন তিনি। ওই সময়েই পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর নজরে আসেন তিনি। নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের প্রধান হিসেবে তাকে নিয়োগ দেন নেহরু। আইবির স্পাইমাস্টার হিসেবে আরএন কাওয়ের দক্ষতায় বেশ মুগ্ধ ছিলেন তিনি। লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সময়েও একই দায়িত্ব পালন করে যান আরএন কাও।

১৯৫৫ সালে প্রশান্ত মহাসাগরে ভারতীয় উড়োজাহাজ কাশ্মীরি প্রিন্সেস বিস্ফোরিত হওয়ার ঘটনা তদন্তে বেশ কৃতিত্ব দেখান আরএন কাও। সে সময় চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইও তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিলেন।

১৯৬২ সালের চীন-ভারত ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে সামরিক প্রয়োজনে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে বিশেষায়িত সংস্থার অভাব বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করেছিল নয়াদিল্লি। সে সময় জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজটি আইবিই করত। কিন্তু অভ্যন্তরীণ পরিচালনগত জটিলতা ব্যাপক রাজনৈতিকীকরণের কারণে সংস্থাটিকে প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছিল না। সময় আইবির সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে বিশেষায়িত সংস্থার মাধ্যমে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার উল্লেখ করেছেন আরএন কাও।

অবস্থায় ১৯৬৮ সালে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা তত্পরতা চালানোর উদ্দেশ্যে বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা হয় র। ইন্দিরা গান্ধী সংস্থাটি গড়ে তোলার দায়িত্ব দেন আইবির বৈদেশিক শাখার প্রধান পিতা নেহরুর বিশ্বাসভাজন আরএন কাওকে।

আইবি থেকে বাছাইকৃত আড়াইশ গোয়েন্দাকে নিয়ে গড়ে তোলেন রামেশ্বর নাথ। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দ্রুত তারা পরিচিতি পায় দক্ষ ঝানু গুপ্তচর হিসেবে, যাদের অভিহিত করা হতো কাওবয় বলে। অন্যদিকে ইন্দিরা গান্ধীসহ সহকর্মীরা আরএন কাওকে শ্রদ্ধাপূর্ণভাবে সম্বোধন করতেন রামজি হিসেবে।

মুখ্য সচিব পিএন হাকসার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব পিএন ধর, পররাষ্ট্র সচিব টিএন কাউলসহ সে সময় ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী উপদেষ্টাদের মহলে বেশ কয়েকজন কাশ্মীরি পণ্ডিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হয়ে উঠছিলেন আরএন কাও।

গঠনের পর আরএন কাও প্রথমেই নজর দেন চীন, পাকিস্তান পূর্ববঙ্গের ওপর। সংস্থাটির কাউন্টার টেররিজম শাখার সাবেক প্রধান বি রমণ তার কাওবয়েজ অব বইয়ে উল্লেখ করেছেন, গঠনের কয়েক মাসের মধ্যে আরএন কাও দুটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেন। প্রথমত, পাকিস্তান চীনে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা সুসংহত করা। দ্বিতীয়ত, পূর্ব পাকিস্তানে গোপন তত্পরতা বৃদ্ধি সুসংহত করা।

গোয়েন্দা তৎপরতা চালাতে গিয়ে এক বছরের মধ্যেই আরএন কাও বুঝতে পারেন পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতা অবশ্যম্ভাবী। নয়াদিল্লিভিত্তিক লেখক পররাষ্ট্রনীতি বিশারদ জোরাওয়ার দৌলত সিং তার ইন্ডিয়াস ফরেন পলিসিজ ডিউরিং দ্য কোল্ড ওয়ার বইতে জানাচ্ছেন, ১৯৬৯ সালেই কাওয়ের অভিমত ছিল, পূর্ব পাকিস্তান আরো ঘোলাটে পরিস্থিতি সম্ভাব্য স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ভারতের প্রস্তুত থাকা উচিত।

ওই বছরের এপ্রিলে এক সরকারি তারবার্তায় আরএন কাও উল্লেখ করেন, পূর্ব পাকিস্তানে এরই মধ্যে জোরালো হয়ে ওঠা আন্দোলন দমনে সেখানকার কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনী অন্যান্য আধাসামরিক বাহিনীকে ব্যাপক মাত্রায় ব্যবহার করতে পারে। সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য বল প্রয়োগের ফল হিসেবে এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে, যেখানে ইস্ট বেঙ্গল রাইফেলসের একাংশের (সাম্প্রতিক পূর্ব পাকিস্তান ষড়যন্ত্র মামলার ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে) সমর্থন নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কেন্দ্রের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এমনকি স্বাধীনতাও ঘোষণা করে বসতে পারে। যদিও ঘটনা সহসা না- ঘটতে পারে; কিন্তু এখন থেকেই ভারত সরকারের ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য নীতি হাতের সম্ভাব্য সব বিকল্পের কথা ভেবে রাখা উচিত।

জোরাওয়ার দৌলত সিং জানাচ্ছেন, তারবার্তার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে ভারতের কৌশল কেমন হবে, তা নিয়ে নয়াদিল্লিতে বিতর্ক শুরু হয়। এর মধ্যে একটি পক্ষে ছিলেন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাদের বক্তব্য ছিল, ভারতের নিজ স্বার্থেই কখনই উচিত হবে না পাকিস্তানের অখণ্ডতা ভাঙতে দেয়া। এর বিরোধিতা করে আরএন কাও বলেন, ধরনের একটি সংকট তৈরি হলে ইন্দিরা গান্ধীর উচিত হবে ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা।

সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ের পরও ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন, পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে বাঙালিদের আধিপত্য ভারতের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের বৈরী মনোভাব দূর করতে সহায়ক হবে। ফলে তাদের কেউ কেউ তখনো পাকিস্তানের অখণ্ডতাতেই ভারতের স্বার্থরক্ষা হবেএমন মতামত দিয়ে যাচ্ছিলেন।

কিন্তু বিষয়ে আরএন কাওয়ের মধ্যে সামান্যতম বিভ্রান্তি ছিল না। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের জানুয়ারির শুরু থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সম্ভাব্যতা সম্পর্কে আরো নিঃসন্দেহ হতে থাকেন তিনি। বিষয়টিতে প্রভাবিত হয়ে পড়েন ইন্দিরা গান্ধীও। সময় বাঙালিদের দমনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য পরিবহনে ব্যাঘাত ঘটাতে ভারতের ওপর দিয়ে পাকিস্তানি উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান না থাকায় সেটি সহজ কোনো পদক্ষেপ ছিল না। কারণ এক্ষেত্রে কোনো কারণ না দেখিয়ে নিজ দেশের আকাশসীমায় প্রতিবেশী দেশের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দিলে ভারতের কূটনৈতিক চাপে পড়ার আশঙ্কা ছিল। অবস্থায় আরএন কাওকে প্রথার বাইরে গিয়ে কোনো সমাধান বের করে আনার দায়িত্ব দেন ইন্দিরা গান্ধী।

সময় এক অভিনব সমাধান বের করেন আরএন কাও। কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে থাকা -এর ডাবল এজেন্টদের দিয়ে পাকিস্তানগামী উড়োজাহাজ হাইজ্যাক করানোর পরিকল্পনা করেন তিনি। পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারতের সামনে নিজ আকাশসীমার ওপর দিয়ে পাকিস্তানি সব ফ্লাইট চলাচল বন্ধের অজুহাত তৈরি হয়। বিষয়টি পাকিস্তানের জন্য সৈন্য সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনকে মারাত্মক রকমের দুঃসাধ্য করে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিষয়টি পরিণত হয় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দুঃস্বপ্নে।

১৯৭১ সালের ১৪ জানুয়ারি সরকারের জন্য তৈরি করা এক প্রতিবেদনে আরএন কাও লেখেন, সামরিক বাহিনীর হার্ডলাইনার, সুবিধাভোগী আমলা এবং পাকিস্তানের সামন্ততান্ত্রিক স্বার্থ আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিটিকে উল্টোদিকে প্রবাহিত করতে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ক্রমবর্ধমান হারে চাপ দিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ধরনের কৌশল দিয়ে বাঙালিদের এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীর কিছু অংশকে ভাঁওতা দেয়া অসম্ভব।

পরবর্তী সময়ের ঘটনাপ্রবাহে কাওয়ের ধারণাগুলোই সঠিক বলে প্রমাণিত হতে থাকে। আরএন কাওয়ের ধারণা ততদিনে ইন্দিরা গান্ধীকেও প্রভাবিত করেছে বেশ ভালোভাবে। মার্চ পিএন হাকসার, আরএন কাও, টিএন কাউল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিবকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, যার কাজ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা দিলে তা ভারতের ওপর কী ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সামরিক প্রভাব ফেলবে; তা খতিয়ে দেখা।

২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশী সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নেয় ভারতে। দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রামের পর দেশ স্বাধীনে সক্ষম হয় মুক্তিপাগল বাঙালি। সে সময় বাঙালিদের প্রশিক্ষণ-অস্ত্র সামরিক সম্ভার দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ভারত। এর ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন কাশ্মীরি পণ্ডিত আরএন কাও।

আরও