জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা জমে উঠেছে হাওর ও পাহাড়বেষ্টিত জেলা নেত্রকোনায়। স্থানীয় পাঁচটি আসনে আইনপ্রণেতা হওয়ার লড়াইয়ে জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন বিএনপি, ১১ দলীয় জোটের জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিশসহ বিভিন্ন দলের ২৫ প্রার্থী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনায় দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি স্বতন্ত্র ও নারী প্রার্থীরাও ভোটারদের নজর কাড়ছেন।
নেত্রকোনার পাঁচটি আসনে বরাবরই বিএনপি ও আওয়ামী লীগ প্রাধান্য ধরে রেখেছিল। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানে পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় পাল্টে গেছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। এরই মাঝে কোনো কোনো আসন বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীর দ্বৈরত আলোচনায় রয়েছে। আবার কোনো আসনে বিএনপি-খেলাফত মজলিশ বা বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী স্বতন্ত্র হয়ে জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিচ্ছেন।
আওয়ামী লীগবিহীন এবারের নির্বাচনে বিএনপি জেলার পাঁচ আসনে জয় পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে ভালো ফলাফলের জন্য জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। আবার একই আসনে দুই দলের দুই নারীসহ নতুন করে এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল সরগরম উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
গারো পাহাড়ি অঞ্চলের কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-১ আসন। ১৯৯১ সালের পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুবার করে জয় পায় এখানে। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আসনটিতে কায়সার কামালের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ১১ দলীয় জোটের খেলাফত মজলিশের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম রাব্বানী। এছাড়া রয়েছেন মো. আনোয়ার হোসেন খান (জাতীয় পার্টি), মো. আব্দুল মান্নান (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), মো. আলকাছ উদ্দিন মীর (কমিউনিস্ট পার্টি) এবং আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া মো. বেলাল হোসেন (জাতীয় গণতান্ত্রিক দল)।
সদর ও বারহাট্টা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-২ আসনকে জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন বিবেচনা করা হয়। এখান থেকে জেলার পুরো রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ হয়। ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি নির্বাচনে আসনটিতে আওয়ামী লীগ তিনবার জয় পায়। বিপরীতে বিএনপি জয়ী হয় একবার।
আসনটিতে বিএনপির হয়ে লড়াইয়ে আছেন দলটির জেলা সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক। এখানে ১১ দলের জোটের প্রার্থী এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ফাহিম রহমান খান পাঠান। আরো আছেন খেলাফত মজলিশের মাওলানা আব্দুল কাইয়ূম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন মনোনীত দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী মহাসচিব গাজী মুহাম্মদ আব্দুর রহীম রুহী ও জাতীয় পার্টির এবিএম রফিকুল হক তালুকদার।
কেন্দুয়া-আটপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-৩ আসন। এখানে ১৯৯১ সালের পর থেকে ২০০৮ সাল নাগাদ চারটি নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুবার করে জয় পায়।
এ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও জেলা বিএনপির নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী। অবশ্য আসনটিতে ড. রফিকুলের দিকে শক্ত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মাঠে রয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দলটির জেলা সাবেক সহসভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন ভূইয়া দুলাল। দুই প্রার্থীর একই ঘরানার ভোট টানায় হিসাব-নিকাশ করে জোরালো প্রচারণায় রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী খায়রুল কবির নিয়োগী। নেত্রকোনা-৩ আসনে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মো. আবুল হোসেন তালুকদার (জাতীয় পার্টি), মো. শামছুদ্দোহা (ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ) ও মো. জাকির হোসেন (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)।
হাওরাঞ্চল মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী উপজেলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-৪। জেলার এ আসন থেকে অতীতে হেভিওয়েট প্রার্থী দিয়ে জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দল। যথাক্রমে সাবেক মন্ত্রী আব্দুল মমিন ও সাবেক মন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ১৯৯১-২০০৮ সালে জয় পাওয়ায় আসনটি জেলার ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত। এ আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুবার করে জয় পেয়েছে। এবারো বিএনপির দলীয় প্রার্থী সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। তিনি ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় প্রায় ১৬ বছর কারাগারে ছিলেন। নেত্রকোনা-৪ আসনে বাবর শক্তিশালী প্রাথী। আসনটিতে ১১ দলীয় জোটের হয়ে মাঠে রয়েছেন ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক সম্পাদক আল হেলাল তালুকদার। সিপিবির কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য নারীনেত্রী জলি তালুকদারও প্রার্থী হয়েছেন এখান থেকে। প্রার্থী তালিকায় আরো রয়েছেন চম্পা রাণী সরকার (বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি) ও মো. মুখলেছুর রহমান (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)।
একটি মাত্র উপজেলা পূর্বধলা নিয়ে গঠিত নেত্রকোনা-৫ আসন। এখান থেকে ১৯৯১-২০০৮ সাল নাগাদ চারটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুবার করে জয় পায়। এবার বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন দলটির সাবেক জেলা সাধারণ সম্পাদক ও পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু তাহের তালুকদার। জামায়াতে ইসলামীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন দলটির জেলা সহসাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাসুম মোস্তফা। অন্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মো. নুরুল ইসলাম (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)। তবে আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা বলছেন ভোটাররা।
জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যমতে, নেত্রকোনায় ভোটার রয়েছেন ২০ লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৬ জন। এর মধ্যে ১০ লাখ ৩৭ হাজার ২২৫ পুরুষ, ১০ লাখ ৭ হাজার ৪৭১ নারী ভোটার ও ৪০ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।