দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন। আর এ ধরনের যান সবচেয়ে বেশি চলাচল করে মাদারীপুর মহাসড়কে। এর পরই সিলেট মহাসড়কের অবস্থান। ফিটনেসবিহীন ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের মধ্যে রয়েছে মিনি, মধ্যম, বড় ট্রাক ও বাস; চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। হাইওয়ে পুলিশের জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব যান মহাসড়ক দুটিকে দুর্ঘটনাপ্রবণ করে তোলার পাশাপাশি অবকাঠামোগতভাবেও করেছে ঝুঁকিপূর্ণ।
দেশের মহাসড়কে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন শনাক্তে বিভিন্ন সেতুর টোলপ্লাজায় গত ৩১ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টার জরিপ পরিচালনা করে হাইওয়ে পুলিশ। ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের ভিত্তিতে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চিহ্নিত করা হয়। সেখানে দেখা যায়, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগ অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাদারীপুর মহাসড়ক। পদ্মা সেতু চালুর পর এ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। এর মধ্যে ভাঙ্গার বগাইল টোলপ্লাজায় ৩ হাজার ৩৬৬টি ট্রাক যাচাই শেষে ৪৭৭টি বা ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশকেই ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর ২ হাজার ৬৫০টি বাস যাচাই করে ৩৪২টিকে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা এ পথে মোট চলাচলকারী বাসের ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ।
সিলেট বিভাগের সঙ্গে সড়কপথে সারা দেশের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। প্রতিদিন এ পথ ধরে কয়েক হাজার যানবাহন চলাচল করে। গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়কটি ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। এ পথের আউশকান্দি টোলপ্লাজায় ৩ হাজার ৪৯৮টি ট্রাক যাচাই করে ৪৩৮টি ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
এছাড়া ছোট ও বড় আকারের ৯৯৮টি বাস যাচাই করে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ৪৪টিকে। এর বাইরে খুলনার লালন শাহ ও রূপসা টোলপ্লাজায় চলাচলকারী যানবাহনের মধ্যে ১২ দশমিক ২৩ শতাংশ ট্রাক এবং ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ বাস ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বঙ্গবন্ধু সেতুতে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ১০ দশমিক ৮ শতাংশ ট্রাক এবং ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ বাস। গাজীপুরের ধলেশ্বরী, মেঘনা ও ভৈরব সেতুর টোলপ্লাজা থেকে ২৫ হাজার ৯১৪টি ট্রাক যাচাই করে ২ হাজার ১৮টি ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে হাইওয়ে পুলিশ। একই টোলপ্লাজা থেকে ৯৭৯টি বাস ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কুমিল্লার দাউদকান্দি ও আশাগঞ্জ টোলপ্লাজায় ২ হাজার ১৭১টি ট্রাক এবং ৬৮০টি বাস ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
হাইওয়ে পুলিশের জরিপে দুর্ঘটনার শিকার যানবাহনের ধরনের তথ্যও উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে। এর পরই রয়েছে পর্যায়ক্রমে মোটরসাইকেল, বাস, প্রাইভেটকার ও থ্রি হুইলার। এসব দুর্ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়ার ফলে। এছাড়া পথচারী চাপা, মুখোমুখি সংঘর্ষ ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনাও রয়েছে। মহাসড়কের এসব দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি হয় ভোর ৬টা থেকে বেলা ১২টার মধ্যে। আর সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা হয় রাত ১২টা থেকে ৬টা পর্যন্ত।
ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনকে মহাসড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ ধরনের যানবাহন মহাসড়কের জন্য নানামুখী ক্ষতির পাশাপাশি শৃঙ্খলা ভঙ্গেরও অন্যতম কারণ। বিশেষ করে ত্রুটিপূর্ণ এসব যানের জন্য অন্য যানবাহনগুলোকে ঝুঁকির মুখে থাকতে হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআরআই) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আনফিট যানবাহনগুলো মূলত ফিটনেস নবায়ন করতে পারে না। এ ধরনের যানবাহনের টায়ারে সমস্যা থাকে, ইন্ডিকেটর নষ্ট থাকে। আবার কোনো যানবাহনের ব্রেকেও সমস্যা থাকে। ফলে এসব যানবাহন মহাসড়কের চলাচলের সময় নানা ধরনের দুর্ঘটনার সূত্রপাত ঘটনায়। বিশেষ করে ইন্ডিকেটর নষ্ট যানবাহনগুলোর সামনের বা পেছনের বাহনগুলো বিভ্রান্ত হয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। তাছাড়া ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন বিকল হয়েও মহাসড়কের তীব্র যানজট তৈরি করে। এজন্য অবশ্যই আনফিট গাড়ি কোনো অবস্থাতেই মহাসড়কের চলতে দেয়া যাবে না।’
হাইওয়ে পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত ডিআইজি (এইচআর অ্যান্ড মিডিয়া) মো. শামসুল আলম বলেন, ‘মহাসড়কের জন্য ফিটনেস ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন যানবাহনকে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ধরনের যানবাহন যেমন দুর্ঘটনার কারণ, তেমনই মহাসড়কের শৃঙ্খলাভঙ্গেরও অন্যতম কারণ। পাশাপাশি অতিরিক্ত গতি ও মাদকসেবী চালকদের চিহ্নিত করতে প্রতিনিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তাছাড়া চালক ও শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়মতি সভা করে সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। যানজট ও দুর্ঘটনামুক্ত নিরাপদ মহাসড়ক গড়তে কাজ করছে হাইওয়ে পুলিশ।’