ফ্লাইট ও রুট কমিয়ে, ভাড়া বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছে এয়ারলাইনসগুলো। জেট ফুয়েলের বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। গতকাল অভ্যন্তরীণ রুটের জন্য জেট ফুয়েলের দাম এক ধাক্কায় লিটারে ৮৯ টাকা ৮৮ পয়সা বা প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটগুলোর জন্য জেট ফুয়েলের দাম লিটারে ৫৮ সেন্টের বেশি বাড়ানো হয়েছে। এর আগে গত ৮ মার্চ জেট ফুয়েলের দাম অভ্যন্তরীণ রুটে লিটারে ১৭ টাকা ২৯ পয়সা এবং আন্তর্জাতিক রুটে লিটারে প্রায় ১২ সেন্ট বৃদ্ধি করেছিল বিইআরসি। এ হিসাবে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দেশের বাজারে উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়ল। বড় অংকের মূল্যবৃদ্ধির কারণে টিকিটের মূল্যবৃদ্ধি, যাত্রী হারানো ও বাজারে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা।
জ্বালানি বাজারের সংবাদ, তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ওপিআইএসের হিসাব বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রতিদিন প্রায় ১১ লাখ ব্যারেল জেট ফুয়েল রফতানি করে, যা বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ১৭ শতাংশ। যুদ্ধের কারণে এ অঞ্চল থেকে জ্বালানি সরবরাহ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং বিশ্ববাজারে পণ্যটির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জেট ফুয়েলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ফ্লাইট ও রুট কমানোর পাশাপাশি টিকিটের মূল্য সমন্বয় করছে দেশটির এয়ারলাইনসগুলো। জ্বালানি সংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার।
ভিয়েতনামের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়ায় দেশটির জাতীয় বিমান সংস্থা আগামী মাস থেকে সপ্তাহে প্রায় দুই ডজন অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট স্থগিত করবে। অন্যদিকে মিয়ানমারের এমএআই এবং মিয়ানমার ন্যাশনাল এয়ারলাইনসসহ দেশটির প্রধান সব বিমান সংস্থা ২০ মার্চ থেকে তাদের অধিকাংশ ফ্লাইট স্থগিত করা শুরু করেছে। জ্বালানি সংকটের জেরে অভ্যন্তরীণ বিমান পরিষেবা বন্ধ রাখার পরিকল্পনাও করছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইন। জ্বালানি সংকটের কারণে এরই মধ্যে দেশটি জরুরি অবস্থা জারি করেছে।
জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ভাড়ায় ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিয়েছে ভারত সরকার। মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস, ফায়ারফ্লাই, বাটিক এয়ার মালয়েশিয়া, ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারওয়েজ, হংকং এয়ারলাইনস এবং এয়ার ইন্ডিয়ার মতো এশিয়ার বেশকিছু বিমান সংস্থা জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান খরচের প্রেক্ষাপটে বিমান ভাড়া এবং ফুয়েল সারচার্জ (জ্বালানি মাশুল) বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। একই পথে হাঁটছে বিশ্বের আরো অনেক এয়ারলাইনস।
জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে টিকিটপ্রতি ভাড়া ১২০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। দেশের সাতটি অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর সংগঠন এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি) সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-যশোর রুটে টিকিটপ্রতি ভাড়া ১০০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বাকি পাঁচ রুটের ভাড়া বেড়েছে টিকিটপ্রতি ১২০০ টাকা।
এর আগে গত ৮ মার্চ প্রথম দফায় মূল্যবৃদ্ধির পর অভ্যন্তরীণ রুটে ভাড়া ‘সামান্য’ সমন্বয় করেছিল অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করা তিন বেসরকারি এয়ারলাইনস।
দেশে জেট ফুয়েলের নতুন মূল্যবৃদ্ধিকে ক্ষতিকর ও অযৌক্তিক হিসেবে অভিহিত করেছে এওএবি। গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশের এয়ারলাইনসগুলো মারাত্মক আর্থিক চাপে পড়বে এবং অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ভার চাপবে। একই সঙ্গে জেট ফুয়েলের ওপর কর বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় আরো বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের বিমান চলাচল শিল্পের টেকসই উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করবে। মূল্যবৃদ্ধির ফলে অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ফ্লাইট চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দ্রুত পুনর্বিবেচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিজ্ঞপ্তিতে এওএবির সেক্রেটারি জেনারেল ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘ভারত ও নেপাল জেট ফুয়েলের মূল্য অপরিবর্তিত রেখেছে, পাকিস্তানে ২৪.৪৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮.৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে এ বৃদ্ধির হার প্রায় ৮০ শতাংশ। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিকভাবে বেশি।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে জানানো হয়েছে। গত ২২ দিনে প্রায় ২৫টি তেলবাহী জাহাজ দেশে এসেছে এবং এসব তেল পূর্বনির্ধারিত মূল্যে কেনা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সাম্প্রতিক সময়ে তেলের মূল্য হ্রাস পেয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাকে ভিত্তি করে এত বড় পরিসরে জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।’
জেট ফুয়েলের দরবৃদ্ধির কারণে ভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে এয়ারলাইনসগুলো। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে দেশের বেসরকারি এয়ারলাইনস এয়ার অ্যাস্ট্রার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তেলের দাম বিশ-বাইশ দিনের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় ভাড়া বাড়িয়ে সমন্বয় করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। তবে আমরা আশা করছি, তেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার ঘটনাটি সাময়িক এবং আমাদের টিকিটের মূল্য সমন্বয়টাও হবে সাময়িক সময়ের জন্য। যদি যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হয় এবং তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় তাহলে তেলের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে চলে আসবে। তখন আমরাও হয়তো আবার সমন্বয় করে ভাড়া কমিয়ে আনব। কিন্তু এ মুহূর্তে টিকিটের সারচার্জ বাড়িয়ে খরচ পোষানো ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’
ভাড়া বাড়ালেই যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে, তা মনে করেন না ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম। তার মতে, ভাড়া বাড়ালে আকাশপথের যাত্রী কমে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেট ফুয়েলের বাড়তি দাম আমাদের অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে। এখন প্রশ্ন হলো শুধু ভাড়া সমন্বয় করে কি একটি এয়ারলাইনস টিকে থাকতে পারবে? প্যাসেঞ্জার আসবে কোথা থেকে? ভাড়া বাড়ালে অনেকেই আকাশপথের বিকল্প খুঁজবেন, যা যাত্রী প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে।’”
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের যে টিকিটগুলো আগে বিক্রি হয়ে গেছে, সেখানে নতুন করে চার্জ নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে প্রতিটি ফ্লাইটে আমাদের বিশাল লোকসান গুনতে হবে।’
আন্তর্জাতিক রুটে জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানোর কারণে ইউএস-বাংলা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বাজার হারানোর শঙ্কার মধ্যে পড়েছে উল্লেখ করে কামরুল ইসলাম বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে যেখানে জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছে ১৮ থেকে ২৪ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা ৮০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বা সিঙ্গাপুরে জ্বালানির গড় দাম যেখানে ০.৬০ ডলারের আশেপাশে, সেখানে আমাদের অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এ অসম প্রতিযোগিতায় দেশী এয়ারলাইনসগুলো টিকতে না পারলে পুরো বাজার চলে যাবে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর দখলে।’