নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতিও হতাশাজনক। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে এসেছে। ব্যাংকের সুদহার বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের ফলে ব্যবসার খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। সব মিলিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফায়। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে কোম্পানিগুলোর মধ্যে মাত্র তিনটির প্রবৃদ্ধি হয়েছে দুই অংকের। অন্যদিকে এ সময়ে ছয়টি কোম্পানির নিট মুনাফা কমে গেছে আর লোকসান বেড়েছে একটির।
দেশের পুঁজিবাজারে বর্তমানে ১৩টি বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড ও বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের আর্থিক বছর মার্চে শেষ হওয়ার কারণে কোম্পানি দুটি চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। বাকি ১১টি কোম্পানি এরই মধ্যে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, এ সময়ে গ্রামীণফোন লিমিটেড, হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশ পিএলসি ও লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেডের আয় ও মুনাফা দুটোই কমেছে। আয় বাড়লেও এ সময়ে মুনাফা কমেছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি), লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি ও ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের। আয় কমা সত্ত্বেও চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে রবি আজিয়াটা পিএলসির মুনাফা বেড়েছে। অন্যদিকে আয় বাড়ার পরও আলোচ্য সময়ে লোকসান বেড়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেডের। তাছাড়া আয় কমার পাশাপাশি লোকসান হয়েছে আরএকে সিরামিকস বাংলাদেশ লিমিটেডের। এ সময়ে শুধু বাটা সু কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড ও রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশ পিএলসির আয় ও মুনাফা দুটোই বেড়েছে।
টেলিযোগাযোগ খাতের তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি গ্রামীণফোনের আয় ও মুনাফা চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে আগের বছরের তুলনায় কমেছে। আলোচ্য প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় ২ দশমিক ৫০ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৮৩৪ কোটি ৫২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে গ্রামীণফোনের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৬৩৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১ হাজার ৩৩৮ কোটি ৪ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে ৫২ দশমিক ৬২ শতাংশ।
সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক কোম্পানি হাইডেলবার্গ ম্যাটেরিয়ালস বাংলাদেশ গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ৪২৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আয় করেছে, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৪৮০ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আয় কমেছে ১০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আলোচ্য প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ১৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে ৫০ শতাংশ।
লিন্ডে বাংলাদেশের গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে আয় হয়েছে ৫৫ কোটি ৪ লাখ টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৫৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় কমেছে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৮ কোটি ৬ লাখ টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির নিট মুনাফা কমেছে ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ।
তামাক খাতের বহুজাতিক কোম্পানি বিএটিবিসি চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে আয় করেছে ৯ হাজার ৫৯৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৯ হাজার ৪০৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ২ শতাংশ। তবে আয় বাড়লেও আলোচ্য প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ২৩ শতাংশ কমে ৩১৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে আয় হয়েছে ৮৫১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৮২৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ৩ দশমিক ১২ শতাংশ। আয় বাড়লেও আলোচ্য প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা কমেছে ১৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট মুনাফা হয়েছে ১৩৯ কোটি ৭ লাখ টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১৬২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
এ বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার ৯৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা আয় করেছে, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৯৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ১ দশমিক ৫২ শতাংশ। অবশ্য আয় বাড়লেও গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ৩৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমে ১৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের চেয়ারম্যান মাসুদ খান আরো দুটি বহুজাতিক কোম্পানি বিএটিবিসি ও সিঙ্গার বাংলাদেশের পর্ষদে পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইউনিলিভারের কথা যদি বলি এ সময়ে আমাদের গ্রস মুনাফা মার্জিন কমে গেছে। এর কারণ হচ্ছে যে পরিমাণ ব্যয় বেড়েছে সে অনুসারে আমরা পণ্যের দাম বাড়াতে পারিনি। পাশাপাশি গত বছর আমাদের কিছু সঞ্চিতি ছাড় করা হয়েছিল, যেটি এ বছর আর হচ্ছে না। এছাড়া আমাদের মূল গ্রুপ থেকে এক বছরের জন্য টেকনিক্যাল ফির ক্ষেত্রে ছাড়া দিয়েছিল, যেটি গত বছরের জুন থেকে আবার আরোপ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব কারণে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের নিট মুনাফা কমে গেছে। গত বছরের শেষের দিকে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য এনবিআরের পক্ষ থেকে সিগারেটের ওপর শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। এতে সিগারেট বিক্রিতে ধস নেমেছে, যে কারণে গত প্রান্তিকে বিএটিবিসির মুনাফা কমে গেছে। অন্যদিকে নতুন কারখানার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে গত প্রান্তিকে সিঙ্গারের আয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রবৃদ্ধি হওয়ার পরও লোকসান বেড়েছে। নতুন কারখানার জন্য ব্যাংক ঋণ নিতে হয়েছে এবং এর ফলে দুই বছর ধরেই সুদ বাবদ ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।’
সার্বিকভাবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফায় ভাটার বিষয়ে মাসুদ খান বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে এলেও এখনো এটি প্রত্যাশিত মাত্রায় নেমে আসেনি। ফলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা এখনো সংকুচিত অবস্থায় রয়েছে এবং তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে তারপর অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যয় করছেন। এতে এফএমসিজি কোম্পানিগুলোর বিক্রি কমে গেছে। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার কারণে বছর খানেকের মধ্যেই মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। আর মূল্যস্ফীতি কমে এলে ব্যবসার পরিস্থিতিও ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করছি।’
টেলিযোগাযোগ খাতের কোম্পানি রবি আজিয়াটার গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে আয় হয়েছে ২ হাজার ৩৪১ কোটি ১৫ লাখ টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ২ হাজার ৫১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় কমেছে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। তবে আয় কমলেও আলোচ্য প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়েছে ১৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট মুনাফা হয়েছে ১২৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১০৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
সিঙ্গার বাংলাদেশ গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ৫৫৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা আয় করেছে, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৪০০ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অবশ্য আয় বাড়লেও গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট লোকসান বেড়েছে ১৬ গুণেরও বেশি। আলোচ্য প্রান্তিকে কোম্পানিটির ৩৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা নিট লোকসান হয়েছে, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ২ কোটি ১২ লাখ টাকা।
আরএকে সিরামিকস বাংলাদেশের গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে আয় হয়েছে ১৪৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ১৭৭ কোটি ৭ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আয় কমেছে ১৭ শতাংশ। আলোচ্য প্রান্তিকে কোম্পানিটির ২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে ৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা নিট মুনাফা হয়েছিল।
জানতে চাইলে আরএকে সিরামিকস বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে এক বছর ধরে আমরা বেশ চাপে আছি। এ সময়ে আমাদের উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। এখন পর্যন্ত কোনো রকমে উৎপাদন খরচ ওঠানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে মুনাফা করার কথা চিন্তা করা যাচ্ছে না। গাজীপুর এলাকায় গ্যাস সরবরাহ করে তিতাস গ্যাস। প্রতিষ্ঠানটির মজুদ কম হওয়ার কারণে গ্যাসের সরবরাহও কম হচ্ছে। তাছাড়া সিরামিকস কারখানায় উচ্চচাপের গ্যাসের প্রয়োজন হয়। ফলে নিম্নচাপের গ্যাস দিয়ে অন্যান্য কারখানা চললেও সিরামিক কারখানা চালানো সম্ভব না।’
আয় ও মুনাফার দিক দিয়ে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ইতিবাচক অবস্থানে ছিল বাটা সু ও রেকিট বেনকিজার। এর মধ্যে গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বাটা সুর আয় ২৭ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়ে ৩৫৮ কোটি ১৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দ্বিগুণ বেড়ে হয়েছে ৩৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। রেকিট বেনকিজারের আয় আলোচ্য প্রান্তিকে ১১ শতাংশ বেড়ে ১৪৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১ শতাংশ বেড়ে ১৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা হয়েছে।