ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাঁচ মাসে ৩০০ সংঘর্ষ, অধিকাংশই তুচ্ছ ঘটনায়

স্থানীয় সূত্র জানায়, মূলত গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের জেরেই এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ৯টি উপজেলার পাঁচটি পৌরসভা ও ১০০ ইউনিয়নের প্রায় এক হাজার ৪০০ গ্রামের বেশির ভাগ স্থানে রয়েছে গোষ্ঠীগত ঐক্য। আবার কখনো কখনো এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অন্য গোষ্ঠীর জোট বাঁধে। এলাকাভিত্তিক ঐক্যও রয়েছে বিভিন্ন স্থানে। এদের কেউ কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি না।

অনুমতি না নিয়ে বাড়ির পাশের জমি থেকে শসা খাওয়ায় ক্ষেপে যান মালিক। অপরাধ হয়েছে বলে তার কাছে ক্ষমা চান অভিযুক্ত ব্যক্তি। কিন্তু তার গোষ্ঠীর লোকজন এ ঘটনাকে ভালোভাবে নিতে পারেননি। তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় প্রস্তুতি নিয়ে পরদিন ভোরে রীতিমতো সংঘর্ষে জড়ায় দুই পক্ষ। গত ১০ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার বুড়িশ্বর ইউনিয়নের শ্রীঘর গ্রামে ঘটে যাওয়া এ সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়।

একই দিন রাতে আরেকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এবার ঝগড়ার বিষয় টিস্যু। স্থান জেলার সরাইল উপজেলা। পাঠানপাড়ার একটি হোটেলে কুট্টপাড়া ও পাঠানপাড়ার দুই যুবকের মধ্যে টিস্যু নিয়ে বিবাদ থেকে সংঘর্ষে জড়ান দুই এলাকার বাসিন্দারা। আহত হন অন্তত ১৫ জন।

এভাবে গত মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন ও জুলাই এই পাঁচ মাসে অন্তত ৩০০ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, যার অধিকাংশই তুচ্ছ ঘটনায়। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন হাজারো মানুষ। ঝরেছে তাজা ছয়টি প্রাণ। দুজনের কবজি কেটে ফেলা হয়েছে। হামলার শিকার হয়েছেন ইউএনও, ওসিসহ পুলিশ সদস্যরাও। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ হয়েছে জেলা সদরসহ সরাইল ও নাসিরনগর উপজেলায়। এছাড়া আশুগঞ্জ, বাঞ্ছারামপুর, নবীনগর, বিজয়নগর ও কসবা উপজেলায়ও মাঝে মধ্যেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, মূলত গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের জেরেই এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ৯টি উপজেলার পাঁচটি পৌরসভা ও ১০০ ইউনিয়নের প্রায় এক হাজার ৪০০ গ্রামের বেশির ভাগ স্থানে রয়েছে গোষ্ঠীগত ঐক্য। আবার কখনো কখনো এক গোষ্ঠীর সঙ্গে অন্য গোষ্ঠীর জোট বাঁধে। এলাকাভিত্তিক ঐক্যও রয়েছে বিভিন্ন স্থানে। এদের কেউ কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি না। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব ঠিক রাখতে ঝগড়া উসকে দেয়ার অভিযোগ উঠে রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে। আবার অনেক সময় প্রবাসীরাও এটাকে নিজেদের ইজ্জত রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখে টাকা ছড়িয়ে দেন।

এসব সংঘর্ষে অংশ নেয়াদের অধিকাংশই দেশীয় অস্ত্র যেমন—দা, লাঠি, বল্লম ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। সংঘর্ষপ্রবণ এলাকার বেশির ভাগ বাড়িতেই এসব অস্ত্র থাকে। নিজেদের রক্ষায় মাথায় হেলমেটও পড়েন তারা। এসব সংঘর্ষের অধিকাংশের ক্ষেত্রে মামলা হয় না।

গত ২২ জুন বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের চানপুরে রেলওয়ের জায়গা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধে মো. ইদ্রিস মোল্লা (৬৫) নামের এক বৃদ্ধের বাঁ হাতের কবজি কেটে ফেলা হয়। এ ঘটনার পর গত ২৬ জুন নবীনগর উপজেলার নাটঘর ইউনিয়নের চড়িলাম গ্রামে রফিকুল ইসলাম (৫০) নামে আরেক ব্যক্তির কবজি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। স্বজনদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে তার ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটে।

আশুগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে বিদ্যালয় আঙিনা ও কবরস্থান থেকে ফুল ছেঁড়াকে কেন্দ্র করে ২২ জুন ঘটে যাওয়া সংঘর্ষে সাতজন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। মহাজনের বাড়ি ও জাকেরবাড়ির লোকজনের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গত ১৬ জুন সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের উড়শিউড়ায় পারিবারিক সংঘর্ষে মনির হোসেন নামের এক ব্যক্তি খুন হন। রান্নার চুলার ধোঁয়া ঘরে যাওয়াকে কেন্দ্র করে স্বজনদের হামলায় মনির হোসেন মারা যান বলে অভিযোগ করা হয়। দু-একদিনের বিরতি দিয়ে তুচ্ছ ইস্যুতে এমন সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটছে নিয়মিতভাবেই।

সরাইল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জব্বার বলেন, এক গোষ্ঠীর লোকজনকে আরেক গোষ্ঠীর লোক মারলে এটা সহ্য হয় না। এ বিষয়ে কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। সে কারণে আমাদের এলাকায় ঝগড়া-ফ্যাসাদ লেগেই থাকে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. বাহারুল ইসলাম মোল্লা বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, জেলার অনেক সাফল্য ঢাকা পড়ে যায় ঝগড়ার খবরে। কারণে-অকারণে ঝগড়ার এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ব।

সচেতন নাগরিক কমিটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুন নূর বলেন, এত বেশি ঝগড়ার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দায়ী। যার যতটুকু শাস্তি প্রাপ্য, তা নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কিছু করতে চাইলে অন্তত একবার ভাববে।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ সুপার (এসপি) এহতেশামুল হকের কাছে জানতে বার বার যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য দেবেন বললেও এ নিউজ লেখা পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

আরও