আরপিও সংশোধন চায় ইসি

দুই দফা চিঠি দিয়েও আইন মন্ত্রণালয়ের সাড়া মিলছে না

রিপ্রেজেন্টেশন অব পিপলস অর্ডার (আরপিও) বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে কিছু সংশোধনী আনার প্রস্তাবের তিন মাসেও সাড়া দেয়নি আইন মন্ত্রণালয়। অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চেয়ে দ্বিতীয় দফায় চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু প্রায় এক মাস হয়ে গেলেও মন্ত্রণালয় থেকে চিঠির জবাব আসেনি।

রিপ্রেজেন্টেশন অব পিপলস অর্ডার (আরপিও) বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে কিছু সংশোধনী আনার প্রস্তাবের তিন মাসেও সাড়া দেয়নি আইন মন্ত্রণালয়। অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চেয়ে দ্বিতীয় দফায় চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কিন্তু প্রায় এক মাস হয়ে গেলেও মন্ত্রণালয় থেকে চিঠির জবাব আসেনি।

জানা গিয়েছে, সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২-এর কিছু সংশোধন, সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে নতুন কমিশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আরপিও সংশোধন সংক্রান্ত খসড়া বিল প্রস্তুত করা হয়। বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য গত আগস্ট প্রস্তাব পাঠানো হয় আইন, বিচার সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ সংসদবিষয়ক বিভাগে। পরবর্তী সময়ে গত অক্টোবর ইভিএম সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে বাস্তবতার নিরিখে কিছু সংশোধনী আনার জন্য খসড়া প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও বিলের বিষয়ে এখনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি অগ্রগতি সম্পর্কেও ইসিকে কিছু জানানো হয়নি। ফলে গত ২৮ সেপ্টেম্বর লেজিসলেটিভ সংসদবিষয়ক বিভাগকে জরুরি চিঠি দেয় নির্বাচন কমিশন। তাতেও খসড়া বিলের অগ্রগতির বিষয়ে অবহিত করা হয়নি। বিষয়টি জরুরি বিধায় সংশোধন সংক্রান্ত খসড়া বিলের অগ্রগতির সম্পর্কে জানানোর জন্য ১০ অক্টোবর পুনরায় চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পায়নি ইসি।

দ্য রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার-আরপিও শীর্ষক নির্বাচনী আইনটি (১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-১৫৫) ইংরেজিতে প্রণয়ন করা হয় ১৯৭২ সালে। কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এটিকে বাংলায় অনুবাদেরও উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯৪ক অনুচ্ছেদের দেয়া ক্ষমতাবলে ২০২১ সালের জুলাই বাংলাপাঠ গেজেট প্রকাশ করে ইসি সচিবালয়। আরপিওতে পর্যন্ত অন্তত ১২ বার সংশোধন এসেছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে অন্তত ২১০টি বিষয়ে সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে।

ইসি সূত্রে জানা গিয়েছে, আরপিওর , ১২, ১৫, ২৫, ৩১, ৩৬, ৪৪, ৮৪, ৯০, ৯১ অনুচ্ছেদসহ বেশকিছু ধারা-উপধারায় সংযোজন-বিয়োজন করণিক সংশোধনী প্রস্তাব আনা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভোট বাতিলে ইসির ক্ষমতা ভোট বন্ধে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার ক্ষমতা বাড়ানো, প্রার্থীর এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখালে বা কেন্দ্রে যেতে বাধা দিলে শাস্তির বিধান, সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বাধা দিলে শাস্তি, দলের সর্বস্তরের কমিটিতে নারী প্রতিনিধিত্ব রাখতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় দেয়া। এছাড়া রয়েছে দায়িত্বে অবহেলায় কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতা বাড়ানো, প্রার্থীদের আয়কর সনদ জমা দেয়া বাধ্যতামূলক করা, ভোট গণনার বিবরণী প্রার্থী তার এজেন্টদের দেয়া বাধ্যতামূলক করা, মনোনয়নপত্র দাখিলের আগের দিন পর্যন্ত খেলাপি বিল (বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ইত্যাদি) পরিশোধের সুযোগ দেয়া, রাজনৈতিক দলের সংশোধিত গঠনতন্ত্র ৩০ দিনের মধ্যে ইসিতে জমা দেয়ার বিধানের প্রস্তাব ইত্যাদি। ইভিএম সংক্রান্ত সংশোধনী প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ভোটারের আঙুলের ছাপ না মিললে একজন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা মোট ভোটারের সর্বোচ্চ শতাংশ ভোটারকে ভোট দেয়ার অনুমতি (কর্মকর্তার আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে) দিতে পারবেন।

ইসির এসব প্রস্তাব আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে প্রথমে এটি খতিয়ে দেখবে আইন মন্ত্রণালয়। এরপর তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। সেখানে চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে তা সংসদে সংশোধন বিল আকারে উপস্থাপন হবে। তারপর -সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সংসদে বিল আকারে পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সংশোধনীটি যুক্ত হবে আরপিওতে। তবে সংশোধনী পাস হওয়া না-হওয়া পুরোপুরি সংসদের হাতে। যদিও বর্তমান সংসদে ৩০০ আসনের মধ্যে আড়াইশরও বেশি আওয়ামী লীগের দখলে। আবার ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের ৯০ শতাংশেরও বেশি সরকার দলের সদস্য। সে হিসেবে কোনো আইন পাস হওয়া না-হওয়ার ক্ষেত্রে সরকার দলের সিদ্ধান্তই মুখ্য।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর প্রথম সংসদ অধিবেশন বসে ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের মেয়াদ প্রথম অধিবেশন থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর। সে হিসাবে ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত বর্তমান সংসদের মেয়াদ। অন্যদিকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংবিধানে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের কথা বলা হয়েছে। সে হিসাবে ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

আরপিও সংশোধনের প্রস্তাবের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের নীরবতা প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা চিঠি পাঠিয়েছি। উনারা (আইন মন্ত্রণালয়) এটা ভেটিং করে যা ব্যবস্থা নেয়ার নেবেন। সে ক্ষেত্রে দেরি নানা কারণেই হতে পারে। আমরা অপেক্ষা করছি, দেখছি। তারা তো এখনো রিজেক্ট করে দেয়নি, তাই অগ্রিম কিছু বলতে চাচ্ছি না।

এদিকে ইভিএম মেশিন সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার জন্য সরকারের কাছে অর্থ চেয়েছে নির্বাচন কমিশন। এমনকি কমিশন থেকে বলা হচ্ছে, সরকারের অর্থছাড়ের ওপরই নির্ভর করছে আগামী জাতীয় সংসদ ভোটে কত আসনে ইভিএম সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে আরপিও সংশোধন, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা, কর্মকর্তা নিয়োগ এবং নির্বাচন পরিচালনার কাজও সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের দিয়ে করতে হচ্ছে। মূলত একটি পুরো নির্বাচন পরিচালনার জন্য ইসির নিজস্ব কোনো জনবল কাঠামো না থাকা, স্বাধীন অর্থের উৎস না থাকায় সরকারের দ্বারস্থ হতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা সক্ষমতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা বলেন, স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা আমাদের দায়িত্ব না, এটা রাজনৈতিক বিষয়। আইন যা আছে, সক্ষমতা যা আছে, তার মধ্যেই নির্বাচন সুষ্ঠু করা আমাদের কাজ, আমরা সেটাই করার চেষ্টা চালাচ্ছি। এখানে কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন ছিল না, কমিশন তো সেটা করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে রাজনীতিকদের সম্পৃক্ততায় আইন হলো, সে আইনে আমাদের প্রথম নিয়োগ হলো। আইনটা সরকার করবে, সেটা প্রয়োগের দায়িত্ব আমাদের। এখন আরপিও সংশোধনে যে প্রস্তাব দিয়েছি সেগুলো পাস হলে আমরা আরো ভালোভাবে কাজ করতে পারব, না হলে যা আছে তার মধ্যেই কাজ করব।

ইভিএম সিসিটিভি ক্যামেরার জন্য সরকারের অর্থছাড় প্রসঙ্গে কর্মজীবনে জেলা দায়রা জজ হিসেবে কাজ করা কমিশনার বলেন, বিশ্বব্যাপী একটা অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা চলছে। দেশেও এর প্রভাব পড়েছে। এখন যদি এসব কারণে সরকার পর্যাপ্ত অর্থ দিতে না পারে, তাহলে এটা মনে করার কারণ নেই যে, ইচ্ছে করে অর্থছাড় দেয়া হয়নি। আমাদের চাওয়া কর্তব্য, আমরা চেয়েছি।

নির্বাচন কমিশন সচিবসহ যেকোনো পর্যায়ে কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা সরকারের হাতে। প্রসঙ্গে রাশেদা সুলতানা বলেন, এটা কমিশনের হাতে থাকলে তো ভালোই হতো। তবে সব ভালো একদিনে চাইলেই পাওয়া যাবে? যাবে না। রাতারাতি অনেক কিছু হয়ে যাবে না, আমাদের যা আছে তাই নিয়ে কাজ করতে হবে।

আরও