ভবনে ফাটল, নষ্ট হয়ে গেছে সোলার ও গভীর নলকূপ

নির্মাণের চার বছরের মাথায় ব্যবহারের অনুপযোগী বেশির ভাগ উপকূলীয় ‘বহুমুখী আশ্রয় কেন্দ্র’

সাম্প্রতিক বন্যায় দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হলেও সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি।

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চার বছর আগে নির্মিত অনেক বহুমুখী আশ্রয় কেন্দ্রের সোলার ব্যবস্থা, গভীর নলকূপ ও স্যানিটেশন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অনেক ভবনে দেখা দিয়েছে ফাটল, প্লাস্টার খসে পড়েছে, দেয়াল স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে, ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। কোথাও নিরাপত্তা, কোথাও বিশুদ্ধ পানির সংকটও রয়েছে। ফলে ভয়াবহ বন্যার সময়ও অনেক মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে না গিয়ে উঁচু সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাবও আশ্রয় কেন্দ্র বিমুখতার অন্যতম কারণ।

পেকুয়ার রাজাখালী বেশারাতুল উলুম মাদরাসার বহুমুখী আশ্রয় কেন্দ্র। ‘উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের অধীনে ২০১৮ সালের দিকে আশ্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। স্বাভাবিক সময়ে এটি মাদরাসার শ্রেণীকক্ষ হিসেবে ব্যবহার হলেও দুর্যোগের সময় আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। সাম্প্রতিক চার থেকে পাঁচদিনের ভয়াবহ বন্যায় রাজাখালীর প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেন্দ্রটিতে আশ্রয় নিয়েছেন মাত্র ৫০ জন। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হাশেম বলেন, ‘বন্যায় অনেকের ঘরবাড়ি ভেসে গেলেও আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষ যায়নি। সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। দুর্যোগের সময় মানুষ টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে আসে। নিরাপত্তা ও ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনেকে উঁচু এলাকায় তাঁবু টানিয়ে কিংবা আত্মীয়স্বজনের পাকা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তবে এসব সুবিধা নিশ্চিত করা হলে মানুষ অবশ্যই আশ্রয় কেন্দ্রমুখী হবে।’

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার রায়ছটা প্রেমাশিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় বহুমুখী আশ্রয় কেন্দ্রটি ২০২০ সালে নির্মিত হয়। চার হাজার মানুষের ধারণক্ষমতার এ কেন্দ্রটিতে সাম্প্রতিক বন্যায় আশ্রয় নিয়েছেন মাত্র ৯০-১০০ জন। আশ্রয় কেন্দ্রটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সরকারের নির্দেশনায় আশ্রয় কেন্দ্রটি খুলে দেয়া হয়েছিল। তবে মাত্র ১০০ জনের মতো মানুষ এখানে আশ্রয় নেয়।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গবাদিপশু ও মূল্যবান মালামাল ফেলে যাওয়ার শঙ্কা, পর্যাপ্ত গোপনীয়তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার অসুবিধা এবং ঝুঁকিকে কম করে দেখার প্রবণতার কারণে অনেকেই আশ্রয় কেন্দ্রমুখী হন না। অনেক আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সেগুলোতে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানি, পর্যাপ্ত স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও ঘাটতি রয়েছে। ফলে সরকারি প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও অনেক দুর্গত মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রের পরিবর্তে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা তুলনামূলক উঁচু স্থান ও সড়কে আশ্রয় নেয়।

তবে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিনের দাবি, আশ্রয় কেন্দ্র খোলা থাকলেও অনেক মানুষ সেখানে যেতে চায়নি। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা সব আশ্রয় কেন্দ্র খোলা রেখেছিলাম। তবে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা আত্মীয়স্বজনের উঁচু দালানে আশ্রয় নিয়েছেন। সে কারণে অনেকে আশ্রয় কেন্দ্রে যাননি।’ তবে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘কিছু আশ্রয় কেন্দ্রে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই, এটা সত্য। আমরা সেগুলোর উন্নয়নে কাজ করব।’

উপকূলীয় এলাকার মানুষ ও তাদের গবাদিপশুকে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দিতে ২০১৬ সালে ‘উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্প নেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। প্রায় ৫৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬টি উপকূলীয় জেলায় নির্মাণ করা হয় ২২০টি বহুমুখী আশ্রয় কেন্দ্র। প্রকল্পের আওতায় সোলার সিস্টেম, গভীর নলকূপ, অ্যাপ্রোচ সড়ক ও গবাদিপশুর শেল্টার নির্মাণের কথা থাকলেও অনেক কেন্দ্রেই এসব সুবিধা অসম্পূর্ণ বা অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। নির্মাণের দুই বছরের মধ্যেই সব আশ্রয় কেন্দ্রের সোলার সিস্টেম অচল হয়ে পড়ে। ১৮৬টি গভীর নলকূপের বেশির ভাগই এখন অকেজো। ১২০টি গবাদিপশুর শেল্টারের অধিকাংশ ভেঙে গেছে। অনেক আশ্রয় কেন্দ্রে এখনো অ্যাপ্রোচ সড়ক নেই, আবার অনেক কেন্দ্র জনপথ থেকে দূরে নির্মাণ করায় দুর্যোগের সময় সেখানে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ কেন্দ্রে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এছাড়া নির্মাণের মাত্র তিন থেকে চার বছরের মধ্যে অনেক ভবনে ফাটল, প্লাস্টার খসে পড়া, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল এবং ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে, যা ব্যবহারকারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর বিভিন্ন সেবা ও অবকাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন এবং কার্যকর তদারকির অভাবে সব আশ্রয় কেন্দ্রের সোলার সিস্টেম অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্যোগের সময় বিকল্প বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উপকারভোগীরা। এছাড়া অনেক কেন্দ্রে সেপটিক ট্যাংক ও শৌচাগার ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। যথাযথ পরিচর্যার অভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় আলাদা গবাদিপশুর শেল্টার নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

এ বিষয়ে আইএমইডির এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দিতেই এসব আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক কেন্দ্রই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পরিদর্শনে এমন আশ্রয় কেন্দ্রও পেয়েছি, যেখানে যাওয়ার রাস্তায় পানি জমে আছে। কোথাও সোলার ব্যবস্থা নেই, কোথাও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। অনেক ভবনের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে। এসব কেন্দ্রে দুর্যোগের সময় মানুষের নিরাপদে থাকার মতো পরিবেশ নেই। আবার চাঁদপুরের এমন উপজেলাতেও আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি নেই। এমনকি উপকূলের বাইরের এলাকাতেও আশ্রয় কেন্দ্র করা হয়েছে। পরিদর্শনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমাদের কাছে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের সন্দেহ হয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২২০টি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও এসব কেন্দ্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যার কারণে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তাদের। এদিকে আরো ৯০টি নতুন আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণে নতুন প্রকল্পের কথাও জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান। সার্বিক বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা যখন একটি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করি, তখন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমাদের পারফরম্যান্স সিকিউরিটি থাকে। ওই সময়ের মধ্যে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে আমরা তা মেরামত করে দিই। কিন্তু এরপর সেটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তখন সেটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাদের। আমরা মাঝেমধ্যে এসব আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শনও করি। পরিদর্শনে গিয়ে যদি দেখি কোনো সমস্যা আছে, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মেরামতের অনুরোধ করি। তবে আশ্রয় কেন্দ্র ব্যবহার হচ্ছে না—এ কথা ঠিক নয়। আমাদের অনেক আশ্রয় কেন্দ্রই নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।’ তিনি আরো জানান, উপকূলীয় আশ্রয় কেন্দ্রের তৃতীয় পর্যায়ে ৯০টি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। সবই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা হবে, যাতে স্বাভাবিক সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলে এবং দুর্যোগের সময় মানুষ আশ্রয় নিতে পারে।

আরও