এলপিজিতে চলে ৮০ শতাংশের ব্যবসা

দাম সহনীয় না হলে রেস্তোরাঁ বন্ধের পরিকল্পনা, বিপাকে পড়ার শঙ্কায় ৩০ লাখ কর্মী

দেশে হোটেল ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৪ লাখ ৩৬ হাজারের মতো। এর মধ্যে রেস্তোরাঁ রয়েছে ৬০ হাজারের অধিক, যার ৮০ শতাংশই এলপিজির ওপর নির্ভর করে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

দেশে হোটেল ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৪ লাখ ৩৬ হাজারের মতো। এর মধ্যে রেস্তোরাঁ রয়েছে ৬০ হাজারের অধিক, যার ৮০ শতাংশই এলপিজির ওপর নির্ভর করে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তাই সাম্প্রতিক দেশব্যাপী এলপি গ্যাসের সংকটে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে এ খাতটি। গ্যাসের দাম সহনীয় পর্যায়ে না এলে রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন মালিকরা। আর সেটি হলে বিপাকে পড়বেন এ খাতে কর্মরত ৩০ লাখ কর্মী।

দেশে এলপিজি সংকটে রেস্তোরাঁ খাতে প্রভাব নিয়ে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলন করে এ খাতের মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি’। সেখানে মালিকদের হয়রানি, মূল্যস্ফীতি, নিয়মবহির্ভূত স্ট্রিট ফুডের দৌরাত্ম্যসহ নানা সংকট তুলে ধরা হয়। সেই সঙ্গে এ খাতের সংকট কাটাতে এলপিজির বাইরে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ দিতে বিতরণ কোম্পানি তিতাসসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি জানানো হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে হোটেল-রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৪ লাখ ৩৬ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন ৩০ লাখ কর্মী। রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি অবশ্য বলছে, এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই কোটি মানুষ নির্ভরশীল। খাতটি পরিচালনায় প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলপিজির ব্যবহার হয়। তবে চাহিদা অনুযায়ী পাইপলাইনের গ্যাস না পাওয়ায় ৮০ শতাংশ রেস্তোরাঁ এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বাজারে যে দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে এবং সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রেস্তোরাঁ খাতে। ডিসেম্বর থেকে দেশে এলপিজির তীব্র সংকট চলছে। এ সমস্যার সমাধান ওই অর্থে হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে লোকসান গুনতে শুরু করেছে। কর্মীদের কথা চিন্তা করে এখনো তারা রেস্তোরাঁ বন্ধ করেনি। আবার দামও বাড়ানো যাচ্ছে না। কারণ দাম বাড়ালে গ্রাহক থাকবে না। তারাও চাপে পড়বে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে এ ব্যবসায় কেউ আর টিকে থাকতে পারবেন না।’

হোটেল ব্যবসায়ীদের নেতা ইমরান হাসান আরো বলেন, ‘রেস্তোরাঁ খাতে বর্তমানে যে অস্থিরতা চলছে তা কমিয়ে আনতে হলে প্রথমে জ্বালানি সংকট নিরসন করতে হবে। সেই সঙ্গে ভোক্তা পর্যায়ে খাবারের দাম সহনীয় রাখতে হলে অন্তর্বর্তী সরকার এবং আগামীতে যে সরকার আসবে তাদেরও উদ্যোগ নিতে হবে। তাছাড়া রেস্তোরাঁয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ ১২টি সংস্থা তদারকি করে। এতে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। সে জন্য আমরা ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর দাবি জানাচ্ছি।’

দেশে গত দুই সপ্তাহ এলপিজির তীব্র সংকট চলছে। ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা দিয়েও গ্যাস সিলিন্ডার পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। যদিও বর্তমানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা। গ্যাস সংকটের ফলে এলপিজির অটোগ্যাস স্টেশন, শিল্পসহ অন্যান্য খাতেও এর প্রভাব পড়ছে।

এরই মধ্যে জ্বালানি বিভাগ ও বিইআরসি এলপিজি খাতের স্টেকহোল্ডার ও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছে। একই সঙ্গে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করছে। যদিও বাজার এখনো স্থিতিশীল হয়নি।

রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি জানায়, দেশে প্রতি মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি সরবরাহ হয়। এসব গ্যাস শিল্প, আবাসিক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় ব্যবহার হয়ে থাকে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশই ব্যবহার হয় হোটেল-রেস্তোরাঁয়। কিন্তু বর্তমানে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির কারণে জ্বালানি খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে ২৫-৩০ শতাংশ।

রেস্তোরাঁ খাতের সংকট নিয়ে গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক সংবাদ সম্মেলনে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা নানা দাবি তুলে ধরেন। তারা দাবি করেন, বিগত সরকারের সময়ে কৃত্রিমভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট দেখিয়ে রেস্তোরাঁ খাতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও আমলার যোগসাজশে এলপিজি ব্যবসা বেসরকারি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেয়া হয়। ফলে পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা একচেটিয়া ব্যবসা করছে বলেও অভিযোগ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।

সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিকরা আরো জানান, গণ-অভ্যুত্থানের পরও গ্যাস সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন অজুহাতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকলেও তিতাসের সংযোগ থাকা রেস্তোরাঁগুলোয়ও পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। ফলে অতিরিক্ত দামে এলপিজি কিনে রান্না করতে গিয়ে রেস্তোরাঁগুলোর ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে খাবারের দাম বাড়াতে বাধ্য হওয়ায় গ্রাহক হারাচ্ছেন মালিকরা। অথচ লোকসান বেড়েই চলেছে বলে তাদের দাবি।

আরও