খালেদা জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত দিনাজপুরের মাতৃছায়া ও তৈয়বা ভিলা

রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা সময়, সংগ্রাম ও রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিচ্ছবিতে রূপ নেয়।

রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা সময়, সংগ্রাম ও রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিচ্ছবিতে রূপ নেয়। খালেদা জিয়া তেমনই একটি নাম। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

তার মৃত্যুতে পৈতৃক নিবাস দিনাজপুরেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নেতাকর্মীরা ছুটে আসেন শহরের জেল মোড় এলাকার দলীয় কার্যালয়ে। সকাল থেকে শহরের প্রায় সব জায়গায় খালেদা জিয়াকে ঘিরেই চলছে স্মৃতিচারণ ও আলোচনা।

খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের বাড়ি ফেনীর পরশুরাম উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে। মা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার চন্দনবাড়িতে। তাদের তিন কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে খালেদা জিয়া তৃতীয়। তার শৈশব কেটেছে দিনাজপুর শহরের মাতৃছায়া ও তৈয়বা ভিলায়।

ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে ইস্কান্দার মজুমদার ভারতের জলপাইগুড়ি চা বাগানে চাকরি করতেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরিবার নিয়ে দিনাজপুর শহরে চলে আসেন। শহরের ঈদগাহ আবাসিক এলাকায় আগে থেকেই খালেদা জিয়ার বড় খালা তোরাতুন নাহার বাস করতেন। সেই সূত্র ধরেই ইস্কান্দার মজুমদার বসবাসের জন্য দিনাজপুর শহরকে বেছে নেন। শহরের ঘাসিপাড়া এলাকায় মাতৃছায়া নামে একটি দ্বিতল বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি।

গতকাল দুপুরে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকের উত্তর দিকের পিলারে মার্বেল পাথরে ইংরেজিতে বাড়ির নাম লেখা রয়েছে। দোতলায় মাতৃছায়া ছাত্রাবাস নামে একটি সাইনবোর্ড ঝোলানো। আর বাসাটির নিচতলায় এক নারীকে বাসাটি পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।

জানতে চাইলে ওই নারী জানান, ওপরে ছাত্রাবাসের সাইনবোর্ড থাকলেও সেখানে কেউ থাকে না। তারা মাত্র দুদিন হলো বাসাটিতে ভাড়াটিয়া হিসেবে এসেছেন।

খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট। জন্মের পর তার নাম রাখা হয়েছিল খালেদা খানম। দেখতে অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন বলে বাড়ির লোকেরা তাকে ‘পুতুল’ বলে ডাকতেন। সেটিই তার ডাকনাম হয়ে যায়। তিনি ও তার বড় বোন প্রয়াত মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী খুরশিদ জাহান হক শহরের গণেশতলা এলাকায় দিনাজপুর সরকারি গার্লস স্কুলে পড়ালেখা করতেন। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে। পরে দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চ মাধ্যমিক) উত্তীর্ণ হন।

খালেদা খানমের বিভিন্ন জীবনী গ্রন্থে বলা হয়েছে, শৈশব থেকেই তিনি পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন। ফুলের প্রতি নিবিড় অনুরাগ ছিল। নিজের ঘর পরিচ্ছন্ন করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখতেন। পরবর্তী জীবনে তিনি ফুলের প্রতি এ অনুরাগ, পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটি থাকার অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন।

সেনাবাহিনীর তরুণ ও চৌকস কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট ঘাসিপাড়া এলাকার মাতৃছায়া নামের বাড়িতে খালেদা খানমের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর থেকে খালেদা খানম ‘খালেদা জিয়া’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।

খালেদা জিয়ার বাবা দিনাজপুরে এসে ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসায় উন্নতির ধারাবাহিকতায় ইস্কান্দার মজুমদারের নেতৃত্বে দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ সাংগঠনিক রূপ লাভ করে। প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ বছর তিনি দিনাজপুর চেম্বারের সভাপতি ছিলেন। আশির দশকে তিনি শহরের বালুবাড়ী এলাকায় জায়গা কিনে বাড়ি করেন। ঘাসিপাড়া এলাকার মাতৃছায়া ভাড়া বাসা ছেড়ে খালেদা জিয়ার মা-বাবা, ভাই-বোন ও পরিবারের সদস্যরা বালুবাড়ী এলাকায় নিজেদের বাড়িতে ওঠেন। নতুন দ্বিতল এ বাড়ির নাম তৈয়বা ভিলা। খালেদা জিয়ার মা তৈয়বা মজুমদারের নাম অনুসারেই বাড়িটির নামকরণ করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা এ বাড়িতেই বাস করতেন।

প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়া দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ীর বাসায় একাধিকবার এসেছেন। মায়ের সঙ্গে দেখা করেছেন। ১৯৯৭-২০০০ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। সে সময় দেশব্যাপী রোড মার্চ কর্মসূচির মধ্যে খালেদা জিয়া তার মায়ের সঙ্গে ওই বাসায় রাতযাপন করেছিলেন। এর আগে ১৯৯১ সালে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে এসে তিনি মায়ের সঙ্গে দেখা করতে ওই বাসায় আসেন। এছাড়া ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ২০০৫ সালে জেলা প্রশাসক কার্যালয়, মেডিকেল কলেজ, তৈয়বা মজুমদার ব্লাড ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রকল্প উদ্বোধন করতে বালুবাড়ীর বাসায় মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। ২০০৮ সালে মা মারা যাওয়ার সময়ও তিনি ওই বাসায় এসেছিলেন। ২০০৭ সালে কম্বল বিতরণ করতে এসে নানি তৈয়বা মজুমদারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সর্বশেষ ২০১২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ ময়দানে এক জনসভায় এসেছিলেন খালেদা জিয়া।

আরও