পুঁজি সংকট

ব্যবসা ছাড়ছেন চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তা

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া দীর্ঘ কয়েক মাস বন্ধ ছিল প্রায় সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য। এতে সংকটে পড়েন চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা। নতুন করে কার্যক্রম শুরুর পর পুঁজির ঘাটতিতে পড়েছেন উদ্যোক্তাদের অনেকে। এ শিল্পের সহযোগিতায় সরকার সহজ শর্তে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিলেও কাঙ্ক্ষিত ঋণের অভাবে অনেকেই বিকল্প ব্যবসায় ঝুঁকছেন।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ছাড়া দীর্ঘ কয়েক মাস বন্ধ ছিল প্রায় সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য। এতে সংকটে পড়েন চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা। নতুন করে কার্যক্রম শুরুর পর পুঁজির ঘাটতিতে পড়েছেন উদ্যোক্তাদের অনেকে। শিল্পের সহযোগিতায় সরকার সহজ শর্তে মাত্র শতাংশ সুদে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিলেও কাঙ্ক্ষিত ঋণের অভাবে অনেকেই বিকল্প ব্যবসায় ঝুঁকছেন।

চট্টগ্রামের স্বজন সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী তানভীর রহমান। মার্কেটে তৈরি পোশাক, কসমেটিকস হ্যান্ডিক্রাফটের তিনটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল তার। করোনার কারণে সাধারণ ছুটি চলাকালে কয়েক মাস বন্ধ ছিল তার সব প্রতিষ্ঠান। যদিও শ্রমিকদের বেতন-ভাতাসহ প্রতি মাসেই লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করতে হয়েছে তাকে। আয় না থাকলেও ব্যক্তিগত ব্যয় ব্যবসায়িক ব্যয় মেটাতে গিয়ে পুঁজি হারিয়েছেন তিনি। শপিং মল খুলে দেয়ার পর কার্যক্রম শুরু হলেও কাঙ্ক্ষিত ব্যবসা না হওয়ায় নতুন করে বিনিয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয় ব্যবসায়ীর। তবে প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে এরই মধ্যে হ্যান্ডিক্রাফটের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। অর্থের অভাবে হ্যান্ডিক্রাফটের কারখানাটিও বন্ধের উপক্রম শৈলী ফ্যাশনের উদ্যোক্তার।

একই পরিস্থিতি নগরীর মতি টাওয়ার কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী আরিফ উল্লাহ চৌধুরীর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের। বোরকা, বুটিকস, ব্যাগসহ একাধিক পণ্য তৈরির কারখানা ছিল তার। সব কারখানা বন্ধ করে এখন পাইকারি বাজার থেকে পণ্য এনে বিক্রি করছেন তিনি। কারখানা চালু রাখতে একাধিক ব্যাংকে আবেদন করেও সরকার ঘোষিত প্রণোদনার ঋণ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে ব্যবসা সংকোচন করেন উদ্যোক্তা।

করোনার ক্ষত থেকে অতি ক্ষুদ্র, কুটির মাঝারি শিল্পকে রক্ষায় ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঋণ প্রদানের ঘোষণা দেয় সরকার। তবে পর্যন্ত মাত্র ৯৪৫ জন উদ্যোক্তা ঋণ সুবিধা পেয়েছেন। এর মধ্যে গত জুলাই পর্যন্ত ২৮২ জন উদ্যোক্তা ৭৪ কোটি ২১ লাখ ৭১ হাজার টাকা এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ৬৬৩ জন উদ্যোক্তা ১৬৫ কোটি ৪৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ঋণ পেয়েছেন। এছাড়া চলতি অক্টোবরে আরো ৫৮৩ জন উদ্যোক্তাকে ১৭৭ কোটি ৬৭ লাখ ৭৩ হাজার টাকার ঋণ প্রদানের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর।

চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম বিষয়ে বলেন, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা। সরকার উদ্যোগ নিলেও অনেক উদ্যোক্তা এখনো প্রত্যাশিত ঋণ পাননি। ক্ষুদ্র প্রান্তিক উদ্যোক্তারা যাতে প্রণোদনা ঋণ থেকে বাদ না যায়, সেদিকে ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সজাগ থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রতি মাসে কত ঋণ অনুমোদন হয়েছে কতগুলো ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, সে বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য চেম্বারসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণের অনুরোধ জানান তিনি।

চট্টগ্রামের পাদুকা তৈরির ক্ষুদ্র মাঝারি কারখানার সংখ্যা প্রায় ৫০০টি। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে কয়েক মাস বন্ধ ছিল এসব কারখানা। রমজান কোরবানির ঈদে ব্যবসা করতে না পারলেও মাস খানেক আগে প্রায় ২০০টি কারখানা নতুন করে কার্যক্রম শুরু করে। তবে আর্থিক দেনা নতুন বিনিয়োগের অভাবে এসব কারখানার এক-তৃতীয়াংশই বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর খাতটির অর্ধেকেরও বেশি শ্রমিক-কর্মচারী কারখানা বন্ধের কারণে বিকল্প পেশায় চলে গেছেন। পুঁজির অভাবে খাতের অনেক উদ্যোক্তাও বিকল্প ব্যবসায় সরে যাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্প মালিক গ্রুপ সূত্রে জানা গেছে, সমিতির অধীনে ৫০০ উদ্যোক্তার কেউই সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী শতাংশ সুদে ঋণ পাননি। অনেকেই পুঁজির সংকটে ব্যবসায় ফিরতে পারছেন না। যেসব কারখানা নতুন করে ব্যবসা করছে, তারাও সংকটে রয়েছে। অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ সংকটে পাদুকা তৈরির শিল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে শতাংশ সুদের ঋণ না পেলেও আগের বেশকিছু এসএমই ঋণকে করোনাকালীন প্রণোদনা ঋণের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যাংকে আবেদন করেছে সমিতি। সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া সাতটি প্রতিষ্ঠান দিপালী সুজ, রাকিব স্যান্ডেল ফ্যাক্টরি, পিএফ বাজার, মেঘনা সুজ, স্টার গোল্ড, নিউ ব্র্যান্ড, আরএম সুজের এমএসই ঋণের কিস্তি সুবিধা বৃদ্ধি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সুদের হার শতাংশে নামিয়ে আনতে চিঠি দেয় পাদুকা শিল্প মালিক গ্রুপ।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্প মালিক গ্রুপের আহ্বায়ক কবির আহম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প খাত পাদুকা শিল্প। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে পুঁজি হারানোর ফলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু কারখানা মালিক প্রতিষ্ঠান খুললেও পুঁজির কারণে কাজ চালাতে পারছেন না। প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় স্বল্প সুদের ঋণের জন্য আবেদন করলেও সেটি পায়নি কোনো প্রতিষ্ঠানই। বাধ্য হয়ে নতুন করে কার্যক্রম শুরু করা কারখানা মালিকদের অনেকেই আবারো কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন। পাদুকা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত উদ্যোক্তারা ব্যবসার ধরন পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে ২০ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা রয়েছেন। কিন্তু পর্যন্ত প্রণোদনা ঋণ পেয়েছেন এক হাজারেরও কম। ব্যাংকগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ আবেদন হলেও ঋণ ছাড়ের পরিমাণ খুবই কম। ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদানে অনীহা দেখাচ্ছে। মূলত ব্যক্তিগত সম্পর্ক শতভাগ ঝুঁকিমুক্তভাবে ঋণ প্রদানের জন্য বলা হলেও সরকারের করোনাকালীন প্রণোদনা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা।

জানতে চাইলে বিসিক চট্টগ্রামের উপমহাব্যবস্থাপকও ঋণ বিতরণ মনিটরিং কমিটির সাধারণ সম্পাদক আহমেদ জামাল নাসের চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা ঋণ বিতরণের ঘোষণা আসার পর বিসিকের পক্ষ থেকে উদ্যোক্তাদের জন্য হেল্প ডেস্ক খোলা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে হেল্প ডেস্ক চালু করেছে। ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাও রয়েছে। শুরুতে বিলম্ব হলেও ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ছে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

আরও