গলাচিপায় প্রায় ৪ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প

কাগজে আছে, বাস্তবে নেই একাধিক কাজের অস্তিত্ব

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা পরিষদের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের উন্নয়ন ও রাজস্ব খাতের মোট ৩ কোটি ৮৩ লাখ ২৭ হাজার ৩৭২ টাকা ব্যয়ের একাধিক প্রকল্প নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সরকারি নথিতে প্রকল্পগুলো শতভাগ বাস্তবায়ন ও অর্থ উত্তোলনের তথ্য রয়েছে। সরজমিনে গিয়ে কয়েকটি প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকি নিয়ে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনুমোদিত এসব প্রকল্পের সভাপতি ছিলেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান। ওই কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্বে ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম।

সভার সভাপতি মাহমুদুল হাসান স্বাক্ষরিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন সহায়তা (এডিপি) খাত থেকে ১ কোটি ৭ লাখ ২৪ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়। রাজস্ব খাতের পাঁচটি প্রকল্পের জন্য ধরা হয় ১ কোটি ৮৬ লাখ ৩ হাজার ৩৭২ টাকা। এছাড়া উপজেলা কমপ্লেক্সের বিভিন্ন মেরামত ও উন্নয়ন কাজের জন্য ৫০ লাখ টাকা (অন্য একটি নথিতে ৪০ লাখ টাকা) বরাদ্দ দেখানো হয়। সব মিলিয়ে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ৮৩ লাখ ২৭ হাজার ৩৭২ টাকা। নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৩০ জুনের মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন করে সম্পূর্ণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

অনুমোদিত প্রকল্পের সন্ধানে বিভিন্ন স্থানে সরজমিনে গিয়ে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েকটি কাজের অবস্থান ও বাস্তব চিত্রের মধ্যে মিল নেই। স্থানীয়রা জানান, নথিতে যেসব স্থানে কাজ দেখানো হয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট কাজের অস্তিত্ব নেই।

আবার প্রকল্প অন্য কোথাও স্থানান্তর করা হয়েছে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বা রেজল্যুশনের তথ্যও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি।

সরজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদ পুকুর থেকে পৌরসভার ড্রেন পর্যন্ত পাইপ ড্রেন নির্মাণে ৯৬ হাজার ৫৮২ টাকা ব্যয়ের তথ্য দেয়া রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ওই কাজের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আবার কৃষি অফিস থেকে উপজেলা পরিষদের বাউন্ডারি ওয়াল পর্যন্ত ভি-ড্রেন নির্মাণের নামে প্রায় একই ধরনের দুটি ভিন্ন প্রকল্প দেখানো হয়েছে। এর একটিতে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৭ টাকা এবং অন্যটিতে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৪৮২ টাকা ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। একইভাবে উপজেলা পরিষদ ভবন থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত এপ্রোচ সড়ক নির্মাণের প্রথম ও দ্বিতীয় অংশে যথাক্রমে ১ লাখ ২৬ হাজার ১৫৮ টাকা এবং ২ লাখ ৯৪ হাজার ২১৯ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অথচ সরজমিনে তদন্ত করে এসব প্রকল্পেরও কোনো অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

নথিতে আরো দেখা যায়, পুরনো গেজেটেড কোয়ার্টারের পেছন থেকে মৎস্য অফিস পর্যন্ত বাউন্ডারি ওয়াল মেরামত, কাঁটাতারের বেষ্টনী ও একটি গেট নির্মাণে ৬ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেয়া হয়েছে। তবে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের পুরনো দেয়াল, পুরনো কাঁটাতার ও একটি জরাজীর্ণ গেট ছাড়া নতুন কোনো কাজের স্পষ্ট চিহ্ন নেই।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুকুজ্জামান বলেন, ‘কমপ্লেক্সের ভেতরে যে ইউ-ড্রেনটি আছে, সেটাই এলজিইডি করেছে। অন্য কাজ সম্পর্কে আমার বিস্তারিত জানা নেই। এ বিষয়ে এলজিইডির সঙ্গে কথা বলুন।’

বর্তমান উপজেলা প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান জানান, তিনি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছেন। তার জানামতে গত অর্থবছরের শতভাগ কাজের প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। এডিপি ও রাজস্ব খাতের সিপিসি ও টেন্ডারের কোনো কাজ বা অর্থ উত্তোলন বাকি নেই।

যোগাযোগ করা হলে তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমাদের সব কাজ শতভাগ সঠিকভাবে হয়েছে। কোনো কাজ বাকি নেই।’

বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. এজাজুল হক বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। নথিপত্র যাচাই করে সঠিকভাবে তদন্তের পরই এ বিষয়ে বলা সম্ভব হবে।’

তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শহীদ মিনারের এপ্রোচ সড়ক ঠিকাদারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়েছে। বাউন্ডারি ওয়াল ঠিক জায়গাতেই রয়েছে। কী হয়েছে না হয়েছে সেগুলো আমার ইন্সপেক্টিং অথরিটি আছে; যেখানে অডিট হয়, বিষয়টি তারা দেখবেন। শতভাগ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, আমি থাকাকালীন সেখানে কাজে কোনো গাফিলতি হয়নি। প্রাক্কালন অনুযায়ী মান ঠিক রেখে শতভাগ কাজ নিশ্চিত করা হয়েছে ।’ যদি কোনো প্রকল্প সংশোধনের প্রয়োজন হয়ে থাকে তা পরবর্তী সভাতে আলোচনার মাধ্যমে রেজল্যুশন করে সংশোধন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আরও